ঘটনাটি ছোট। মফস্বলের হওয়াতে প্রচারেও পিছিয়ে। কিন্তু গুরুত্বের বিশালতায় পাহাড় সমান। উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলায় ঘটেছে আলোচ্য এ ঘটনাটি। জানা যায়, সম্প্রতি নিজেদের দলকে 'রাজাকারমুক্ত' করতে গণশপথ গ্রহণ করেছেন সৈয়দপুর উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির সভাপতিত্বে পরিচালিত এ সভায় শপথবাক্য পাঠ করান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মহসিনুল হক। (খবর : প্রথম আলো অনলাইন, ২১ সেপ্টেম্বর)।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের অন্যতম প্রাচীন একটি রাজনৈতিক দলই শুধু নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশও বটে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া এই দলটির নেতৃত্বেই একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিলাম। আর এ বছরই মাত্র দু'মাস পর আমরা সেই বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছি। ঠিক এই সময়েই ক্ষমতাসীন দলের ভেতর থেকে উঠে আসা এমন একটি দাবি যে গভীর তাৎপর্যবহ, তা বলাই বাহুল্য।

প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের মতো একটা দলে রাজাকার ঢোকে কেমন করে? কারাইবা এদের ঢোকার সুযোগ করে দেয়? উত্তরটা খুব কঠিন না হলেও রাজনৈতিক বিশ্নেষণে বেশ জটিল। যেদিন থেকে ভোটতন্ত্র গণতন্ত্রকে গিলে খেতে শুরু করেছে, সেদিন থেকেই রাজাকার অনুপ্রবেশ ঘটে চলেছে দেশের প্রায় সবগুলো বড় দলে। অবশ্য আমি মনে করি, রাজাকার শব্দটিকে কারও ব্যক্তিগত পরিচয়ের অভিধা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আসলে রাজাকার একটি চেতনার নাম- যা ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে শত্রু হয়ে লড়াই করেছিল। আমরা সেই লড়াইয়ে জয়লাভ করলেও বিরুদ্ধ চেতনাটিকে যথাযথভাবে পরাস্ত করতে পারিনি। বলা চলে সঠিকভাবে শনাক্তই করতে পারিনি। তাই আজও আমাদের শপথ নিতে হয় সেই রাজাকারকে পর্যুদস্ত করার।

প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন আসে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চেতনাকে নির্মূল করার প্রাথমিক দায়িত্ব কার ছিল? নিঃসন্দেহে ক্ষমতায় থাকা দলের। এর পরই আসে অন্যান্য গণতান্ত্রিক দলের কথা। কিন্তু ভোটতন্ত্রের লোভনীয় জালে আটকা পড়ে আমরা একদিকে যেমন নিজের দরজা খুলে দিয়েছি বিরুদ্ধ চেতনার জন্য, অন্যদিকে অবস্থা বুঝে আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাবকে ধরে রাখার জন্য তাকে বুকেও জড়িয়েছি। এভাবেই আমরা '৭১-এর পরাজিত রাজাকার চেতনাকে পুনর্বাসিত করেছি ভোটতন্ত্রের নামে।

তবে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে রাজাকার শব্দটি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার একটা অস্ত্র হিসেবেই ব্যবহার করা হচ্ছে। দুর্নীতি থেকে শুরু করে সন্ত্রাস, মারামারি-কাটাকাটি যাই ঘটুক না কেন, সবকিছুর পেছনেই আমরা অদৃশ্য রাজাকারের হাতের সন্ধান করছি। আর তা করতে গিয়ে কখনও সঠিক লক্ষ্যে তীর ছোড়া হলেও কখনও আবার বেঠিক কিংবা স্বগোত্রীয়দের দিকে যাচ্ছে সেই তীর। এই তীর অতি ব্যবহারের ফলে রাজাকার অস্ত্রটি তার ধার হারিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে সরকারবিরোধী হলেই রাজাকার- এই প্রবণতা এটিকে একটা হাস্যকর বিষয়ে পরিণত করেছে।

গত দেড় দশক ধরেই আমরা সরকারি দলের নেতাদের মুখে দলে বিভিন্ন রকমের অনুপ্রবেশের কথা শুনে আসছি। এদিক থেকে দলটির সাধারণ সম্পাদক একটু বেশিই এগিয়ে। তিনি দলের ভেতর বাইরের লোকের অনুপ্রবেশকে কখনও কাউয়া, কখনও হাইব্রিড- এসব অভিধায় অভিহিত করেছেন। অবস্থাটা এমনই, রাজনীতির মাঠে কাউয়া, হাইব্রিড এসব শব্দ বহুল ব্যবহূত গালি হিসেবে ঠাঁই করে নিয়েছে। অবশ্য রাজাকারের অনুপ্রবেশ নিয়ে তিনি কিছু বলেছেন কিনা তা এই মুহূর্তে মনে আসছে না। তবে সৈয়দপুরের ঘটনার পর নিশ্চয়ই অনেকে তার মন্তব্য আশা করতেই পারেন।

১৯৭১ সালের রাজাকারদের অনেকেই আজ আর জীবিত নেই। আর জীবিত থাকলেও তাদের সংখ্যা যে খুব বেশি হবে, এমনও নয়। সেই সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে, '৭১ সালের রাজাকারদের একটা বড় অংশই ছিল প্রায় অশিক্ষিত দরিদ্র এবং রাজনৈতিকভাবে ছিল একেবারেই অজ্ঞ। কিন্তু যারা তাদের ব্যবহার করেছিল তারা ছিল অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রশিক্ষিত। এই দ্বিতীয় দলটিই সাধারণ রাজাকারদের ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এরাই বিভিন্ন দলের সঙ্গে মিশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী সেজে বসেছে। এদের আমরা শনাক্ত করতে পারছি না। এই সুযোগে এরা দেশের সর্বত্র স্বাধীনতা কিংবা মুক্তিযুদ্ধ শব্দটি ব্যবহার করে এমনসব ভুঁইফোঁড় সংগঠন কিংবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, যার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে ভোটতন্ত্রের খেলা তো আছেই। এমন অনেক ঘটনা ঘটছে যেখানে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান গিয়ে হাত মেলাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তির সঙ্গে। গ্রামগঞ্জে এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ছেলেমেয়েরা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির হয়ে কাজ করছে।

এই বাস্তবতায় সৈয়দপুরের ঘটনাটি খুবই তাৎপর্যবহ বলেই মনে করি। কিন্তু দু-একজন রাজাকারকে দল থেকে বের করে দিলেই দল শুদ্ধ হবে না। দলকে শুদ্ধ করতে হলে সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দলীয় কর্মীদের শানিত করে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, সুস্থ চেতনার প্রসার ঘটিয়েই প্রতিক্রিয়াশীল চেতনাকে পরাস্ত করতে হবে। একদিকে ভোটে জেতার জন্য মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ-চেতনাধারীদের সঙ্গে হাত মেলানো, অন্যদিকে সময় হলে তাদেরই গালিগালাজ করা- এটা স্পষ্টতই স্ববিরোধিতা। এই স্ববিরোধিতা থেকে মুক্ত হতে না পারলে কোনোদিনই দল শুদ্ধ হবে না এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নও থেকে যাবে সুদূরপরাহত।

জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা