পাবনার ইছামতী অঢেল সম্পদের, সীমাহীন ঐতিহ্যের এবং বিশাল গৌরবের ঐতিহ্য। নদীটির উৎপত্তির ইতিহাস সঠিকভাবে জানা না গেলেও যতটুকু জানতে পেরেছি তাহলো, নদীটি প্রকৃতিগতভাবে উৎপন্ন হয়নি। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার তৎকালীন রাজধানী জাহাঙ্গীরনগরে যাতায়াতের সুবিধার কথা চিন্তা করে বাংলার শাসনকর্তা ঈশা খাঁর নির্দেশে তখনকার প্রাদেশিক শাসন কর্মকর্তা ইছামতী নদীটি খনন করেন। তারই নামানুসারে এ নদীর নামকরণ করা হয় (সূত্র বিবৃতি, ২৯ এপ্রিল, ২০১৯, সাংবাদিক আবদুল হামিদের নিবন্ধ)। যদিও কোনো ইতিহাস গ্রন্থে বা গুগলস সার্চ করে এর প্রমাণ পাইনি। তবে ইছামতী পদ্মার শাখা নদী এ নিয়ে বিতর্ক নেই।

বিগত শতাব্দীর প্রথম দিকে পাবনার শীতলাই জমিদারের লালরঙা বহু কক্ষবিশিষ্ট বাড়ি, যা শীতলাই জমিদারের বাড়ি বললে সবাই চিনত। পদ্মার তীব্র ভাঙনে ওই বিশাল ভবন নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কার কথা তৎকালীন প্রকৌশলীরা জানালে জমিদার পরিবার বিপুল টাকা খরচ করে শক্ত গাঁথুনি দিয়ে পদ্মার ইছামতীর সংযোগস্থল বন্ধ করে দেন। তার পর পদ্মা-ইছামতী তাদের সংযোগ আজ পর্যন্ত ফেরত পায়নি। ফলে বর্ষায় পদ্মা যখন ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তখন ইছামতী পদ্মার এক চামচ জলও পায় না। এই সংযোগ মুখটি পাবনা পৌর এলাকার পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত। তখন পদ্মার ভাঙন এতই তীব্র হয়ে উঠেছিল, তখন পাবনা শহরের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়েছিল। যমুনার সংযোগকারী হুড়াসাগর দিয়ে বর্ষাকালে যমুনার কালো জল ইছামতী দিয়ে পদ্মায় গিয়ে মিলিত হতো। এভাবে বছরের প্রায় ছয় মাস ইছামতী বিশাল প্রশান্ত এক নদীতে পরিণত হতো। ছোট ছোট লঞ্চ, গয়না, পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌকা পাবনা-বেড়া নৌরুটে ওই ছয় সাত মাস চলাচল করত।

আমার গ্রামের বাড়ি পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার ভুলবাড়িয়া গ্রামে। প্রায় ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত ওই গ্রামে বাস করেছি। রোজ বন্ধুবান্ধব মিলে নদীতে স্নান করেছি। হাঁটাপথে মাত্র তিন মিনিটের দূরত্বে। তাই ইছামতীর সঙ্গে আমার প্রাণের সম্পর্ক। ১৯৪৭ সালে ১৪ বছর বয়সে চলে এলাম পাবনা শহরে স্থায়ীভাবে। ভর্তি হলাম পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। তখনও যাতায়াতের সময় নতুন ব্রিজ দিয়ে ইছামতী দর্শন হতো রোজ দু'বার। মনে পড়ে, আজ থেকে ৫০ বছর আগেও এ নদীতে পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌকা চলাচল করেছে। দেখেছি আশ্বিন মাসে দুর্গাপূজা উপলক্ষে যখন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নারিকেল কিনে নাড়ূ বানাতেন। প্রতিমা বিসর্জনের পরে দিনকয়েকের মধ্যে লক্ষ্মী পূজা উপলক্ষে তারা নারিকেল কিনতেন নতুন ব্রিজের উত্তর পাশে ইছামতী দিয়ে নৌকায় আনা স্তূপীকৃত ডিপো থেকে পাইকারি দামে। আজ সে সবই অতীতের বিস্মৃত বিষয় মাত্র।

ইছামতী হত্যাকারী কারা? ইছামতী কি আপন মনেই শীর্ণকায় হয়ে পড়েছে? নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা হয়তো তাই ভাবে। এই ভাবনা সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। বস্তুত যখন শীতলাই জমিদার বাড়ি এবং পাবনা শহর নদীতে বিলীন হওয়ার উপক্রম, তখন তা থেকে বাঁচতে মজবুত বাঁধ দেওয়া হলো। তখন থেকেই পদ্মার শাখা নদী ইছামতীতে পদ্মার জল আসা বন্ধ হয়ে গেল। তাছাড়া পলি পড়ে বা বাঁধ দিয়েই হোক, যমুনার জল বর্ষাকালেও ইছামতীতে আসা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে স্রোতস্বিনী ইছামতী স্রোতহীন এক বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হলো। সুযোগ গ্রহণ করতে থাকল ভূমিদস্যুরা। সুকৌশলে তারা প্রথমে নদীতীরে মাটি ফেলে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরতে থাকল ইছামতীর উভয় পাড়। নদীর প্রস্থ কমে আসতে লাগল। এরপর বলবান দখলদাররা অট্টালিকা গড়ে তুলল নদীর উভয় তীরে। এর আগে তারা সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের অন্যায়ভাবে প্রভাবিত করে নদীতীরবর্তী ওই জমি নিজেদের নামে রেকর্ড করিয়ে নিয়ে মালিক বনে গেল। অথচ নদী-বিল-জলাশয়ের মালিক আইনত সরকার- কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়। যারা খতিয়ান করে মালিক হয়ে গেল, তারা ছাড়াও অনেকে ভুয়া আমলানামা তৈরি করে দু'ভাবে অর্জিত মালিকানার স্থায়িত্ব সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে তা হয় নিজের আত্মীয়স্বজন বা ভিন্নজনের কাছে বিক্রি করে দেয়। ক্রেতারা দলিলমূলে নাম খারিজ করে প্রশ্নাতীতভাবে ওই জমির 'বৈধ' মালিক বনে যায়। এমন ঘটনা জেলা ও উপজেলায় বেশি ঘটেছে। যেমন পাবনা, বেড়া ও সাঁথিয়া। ডিএস খতিয়ানে বর্ণিত এলাকাই হচ্ছে ইছামতীর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত এলাকা। ডিএস খতিয়ানভুক্ত সম্পূর্ণ এলাকা যতদিন ইছামতী নদীর এলাকা ছিল, ততদিন ইছামতী দৈর্ঘ্য-প্রস্থে এবং গভীরতায় ছিল বিশাল। কিন্তু ওই খতিয়ান আড়াল করে যারা পরবর্তীকালে জরিপকালে জরিপ কর্মকর্তাদের অনেককে অবৈধভাবে প্রভাবিত করে নিজ নিজ নামে এসএ রেকর্ড এবং পরবর্তী সময়ে আরএস খতিয়ান নিজেদের নামে অবৈধভাবে লিপিবদ্ধ করে ভোগ-দখল করছে তারা যেই হোক না কেন, তারা আইনত অবৈধ দখলদার। সময়মতো এর বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে না পারলেও এখন এই অবৈধ দখলদারদের হটাতে যূথবদ্ধ না হলে উচ্ছেদ, অবৈধ স্থাপনা ভাঙা, দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে ইছামতীর আগের এলাকা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার, নদী খনন এবং ইছামতীর সাবেক রূপ ফিরিয়ে আনা যাবে না। উচ্চ আদালতের রায়ে স্পষ্ট বলা আছে, ডিএস খতিয়ান অপরিবর্তন যোগ্য সুতরাং ওই খতিয়ানে বর্ণিত এলাকার কোনো অংশ কেউ দখল বা সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করে থাকলে তা সম্পূর্ণ অবৈধ। উচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছিলেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে অবৈধ দখলদার ও অবৈধ স্থাপনা থেকে উদ্ধার করে ডিএস খতিয়ান অনুযায়ী নদীগুলোর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা উদ্ধার করা হোক।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে ইছামতী নদী পুনরুদ্ধার ও খননের দাবিতে সৃষ্ট আন্দোলন ও পত্রপত্রিকায় লেখালেখির ফলে কাজ শুরু হয় একটি অবৈধ স্থাপনা ভাঙা ও সামান্য খনন শুরুর মধ্য দিয়ে। এ ব্যাপারে তদানীন্তন সরকার কিছু অর্থও বরাদ্দ করেছিল। কিন্তু দু-এক দিন কাজ করার পরেই অদৃশ্য কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। কাজ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনও থেমে যায় মূলত হতাশা ও জনৈক প্রভাবশালীর ভয়ে। এরপর চলতে থাকে বহু বছর ধরে জাতীয় পত্রিকায় ইছামতী নিয়ে লেখালেখি। পরে তাও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সম্প্রতি পরিবেশ ও কোনো কোনো এনজিওকর্মী ফের আন্দোলন শুরু করেন। স্থানীয় একজন পত্রিকা সম্পাদকের নেতৃত্বে 'ইছামতী উদ্ধার কমিটি' বা এই জাতীয় সংগঠন গঠিত হয়। ১৯২২ সালে প্রকাশিত ডিএস মৌজা ম্যাপ অনুযায়ী জরিপ ও চিহ্নিত করা হয় নদীর মূল প্রশস্ততা ও পরিসর। জরিপকালে বেরিয়ে আসে অনেক অবৈধ দখলদার বিভিন্ন অসৎ উপায় অবলম্বন করে ১৯৬২ সালের এসএ রেকর্ড ও সর্বশেষ আরএস রেকর্ডে তাদের নামে জাল কাগজপত্র তৈরি করে ওই সব খতিয়ানে নিজেদের নাম তুলে নিয়ে 'বৈধ' মালিক সেজে বসে আছে। সে সময় জরিপ দল ২৮৫ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা, মৌজার ট্রেসিং ম্যাপ তৈরি ও স্পষ্টভাবে অবৈধ দখলদারদের বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তখন একটি মাস্টারপ্ল্যানও হয়। ওই প্ল্যানের মধ্যে ছিল- অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, নদী খনন, গাইড ওয়াল নির্মাণ, নদী প্রশস্তকরণের পর তার দুই ধারে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে শহরবাসীর বৈকালিক ও সকালের ভ্রমণের জন্য। উভয় পাশে বৃক্ষ রোপণ ও মানুষের ওই সৌন্দর্য উপভোগ বা বিশ্রামের জন্য ইট-সিমেন্টের বড় বেঞ্চ নির্মাণ। কিন্তু ওই পর্যন্তই।

অনেক জনপ্রতিনিধিই বলেন, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। কিন্তু ইছামতী কী বলছে? এটি একটি মাত্র দৃষ্টান্ত। তবে এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মানুষ থেমে নেই, থেমে থাকবেও না। তারা আন্দোলন অব্যাহত রাখবে। আন্দোলন তীব্রতর করে তুলবে। এ আন্দোলন সরকারবিরোধী নয়। কাউকে ক্ষমতায় বসানো বা ক্ষমতা থেকে নামানোরও নয়। আন্দোলন একান্তই দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের। ডিএস খতিয়ান অনুযায়ী দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ, গভীরতা সব ঠিক হতে হবে। গণআন্দোলনেই ইছামতীর ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য জরুরি।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনীতিক
raneshmaitra@gmail.com