আফগানিস্তান যে তালেবানের দখলে চলে যাবে- এমন লক্ষণ তো দেখা যাচ্ছিলই। তাদের একটা শক্তি বলে মনে নিয়ে 'নির্বাচিত' আফগান সরকার সমঝোতার জন্য দরকষাকষি করছিল; দেশের বাইরে, আমেরিকানদের তত্ত্বাবধানে। কিন্তু এত দ্রুত যে তারা আলোচনা ফেলে অস্ত্র হাতে খোদ রাজধানী দখল করে নেবে- এটা কেউ ভাবেনি। হয়তো তারা নিজেরাও আশা করেনি। আমেরিকান বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, ৯০ দিন লাগবে। কিন্তু দখলে চলে গেল ১১ দিনের মধ্যে। তাতে বিপদ ঘটল অনেকের। সবচেয়ে বড় বিপদ প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির। তিনি শেষ পর্যন্ত লড়বেন- এমন একটা ভাব দেখিয়েছেন; সাহস জোগাতে চেয়েছেন রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে। কিন্তু দেখা গেল, তালেবানরা আসছে শুনে তিনি দৌড় দিলেন সবার আগে। অনেকটা বাংলার সেই লক্ষ্মণ সেনের কাহিনি যেন, তুর্কি সেনারা এসেছে শুনে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে যিনি পেছনের দরজা দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গিয়েছিলেন, অভুক্ত অবস্থাতেই। তবে গনি সাহেব কাঁচা কাজ করেননি। যাওয়ার সময় বস্তা বস্তা টাকা নিয়ে গেছেন সঙ্গে করে। হেলিকপ্টার ছিল, গাড়িও ছিল ছয় ছয়টা। তবু জায়গা হচ্ছিল না। ঠাসাঠাসিতে কিছু টাকা নাকি মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খেয়েছে।
টাকাটা অবশ্য আশরাফ গনির নিজের নয়, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের। সেখান থেকে নিয়ে গুছিয়ে রেখেছিলেন; সময়মতো সঙ্গে নিয়ে পালিয়েছেন। চোখ বোঁচকার দিকেই ছিল। সেদিকে থাকলে যুদ্ধ করবেন কী করে! পারলেন না। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে তিনি অনেক অনুরোধ করেছিলেন আরও কিছুদিন থাকতে। কিন্তু বাইডেন সে অনুরোধে সাড়া দেননি। বাইডেন বলেছেন, ২০ বছর তো হয়ে গেল; আর কত! এখন আপনারা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করুন। ঘটনার পর তিনি বলেছেন, আরও পাঁচ বছর থাকলেও পরিণতি একই হতো। কারণ আফগানরা নিজেদের রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত হয়নি। মাঝখান থেকে আরও টাকা খরচ হতো, আরও প্রাণহানি ঘটত। তা টাকা বেশ ঢালতে হয়েছে বৈকি। সবটা যে আফগানিস্তানেই খরচ হয়েছে, এমন নয়। কিছুটা আমেরিকানদের কাছেও ফেরত এসেছে; আমেরিকান বড় ঠিকাদাররা টাকা নিয়ে চলে এসেছেন; আমেরিকান সৈন্যদের পেছনেও খরচ হয়েছে। আমেরিকান অস্ত্র প্রস্তুতকারকরাও ভাগ পেয়েছেন। তবে বিপুল পরিমাণ অর্থ যে ব্যয় হয়েছে, তা মিথ্যা নয়। আমেরিকান সৈন্যরা মারাও পড়েছেন, যদিও আফগানদের মৃত্যুর তুলনায় তা অল্পই।
যে যুদ্ধে জেতার কোনো সম্ভাবনা নেই, তাতে লেগে থেকে লাভ কী- বাইডেন প্রশাসন এমনটাই ভেবেছে। তারা ঠিক করেছিল, ১১ সেপ্টেম্বর (সেই নাইন-ইলেভেনের তারিখ) পর্যন্ত থাকবে। হঠাৎ তার আগেই ফিরবে বলে ঠিক করে ফেলেছে। ৩১ আগস্টের পর আর থাকবে না- সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এই তড়িঘড়ি প্রস্থানের ফলে তাদের ওপর নির্ভরশীল আফগানদের ঘাড়ে মহাবিপদ চলে এসেছে। পুরুষরা গালে হাত দিয়ে দেখেছে- তাদের দাড়ি নেই; পাগড়িও প্রস্তুত নেই গৃহে। আতঙ্কিত মেয়েরা দেখেছে, হিজাবের কাপড় থাকলেও বোরকা প্রস্তুত নেই। তা ছাড়া বোরকা-হিজাবে সুসজ্জিত হলেই যে নিরাপদে থাকা যাবে, তা তো নয়। কাজে যাওয়া যাবে না; পথে-ঘাটে চলাফেরায় বাধা আসবে; স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়তো নিষিদ্ধ হয়েই যাবে; আগেরবার যেমনটা ঘটেছিল। হাজারো নর-নারী তাই সবকিছু ফেলে কাবুল বিমানবন্দরের দিকে ছুটেছে- দেশ ছেড়ে পালাবে। প্রাণে বাঁচা চাই। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষে যেটা সহজ; নাগরিকদের জন্য তো তা দুঃসাধ্য। সেটাই প্রমাণিত হয়েছে কাবুল বিমানবন্দরে। হুড়াহুড়ি পড়ে গেছে। পদদলিত হয়ে মারা গেছে মানুষ। গুলিও ছোড়া হয়েছে নাকি 'শৃঙ্খলা' আনার জন্য। তাতেও প্রাণহানি ঘটেছে আফগানদের। আশঙ্কা ছিল, আমেরিকানদের পশ্চাদপসরণের সুযোগে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা হয়তো হামলা করবে। সেটা তারা ঠিকই ঘটিয়েছে। আত্মঘাতী বোমার বিস্ম্ফোরণ ঘটিয়ে প্রথম হামলাতেই ১৭০ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। তার পরও রকেট হামলা করেছে।
আফগানিস্তানের মানুষ নিজেদের দেশ ছেড়ে পালাতে চাচ্ছে নিজের দেশের মানুষের ভয়ে। ৫০ বছর আগে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সাইগনে এমন দৃশ্যই দেখা গিয়েছিল। সেখানেও মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, বিশেষভাবে নৌকায় করে; নিজেদের দেশের মানুষের ভয়েই। তবে পার্থক্য আছে। সেটা বিরাট। তালেবানরা কমিউনিস্ট নয়; তারা সম্পূর্ণ ভিন্নপথের যাত্রী। এক সময় মুজাহেদিন হিসেবে তালেবান যখন লড়ছিল রুশ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে; মার্কিনিরা তখন তাদের মিত্র ছিল। অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছে। তালেবানের আদর্শগত মিল ছিল মার্কিনিদের সঙ্গে। উভয়েই কট্টর কমিউনিস্টবিরোধী। তালেবান পাঁচ বছর পরে আফগানিস্তান শাসনও করেছে। তার পর বিরোধটা বাধে। আমেরিকানরা ছুটে আসে আল কায়দার ঘাঁটি ভাঙবে বলে। আমেরিকানরা তখন আর কমিউনিস্টবিরোধী বলে পরিচিত নয়, তারা তখন বিধর্মী ও বিদেশি। তালেবান শেষ পর্যন্ত বিধর্মী ও বিদেশিদের তাড়াল, কিন্তু নিজেদের আদর্শ থেকে যে বিচ্যুত হয়েছে, তা অবশ্যই নয়। আদর্শে আস্থা আরও মজবুতই হওয়ার কথা। আদর্শটা হলো একটি ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করা, যে রাষ্ট্র এখন পৃথিবীর কোথাও নেই। ওই রাষ্ট্রের প্রধান শত্রু হবে সমাজতন্ত্রীরা। সম্পত্তির সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা অবশ্যই নয়, ব্যক্তিগত মালিকানা অক্ষুণ্ণ রাখাই তালেবানের অঙ্গীকার এবং পিতৃতান্ত্রিকতার বেলায় তারা তো আমেরিকানদের চেয়েও এক কাঠি ওপরে।

 

তবে আমেরিকা ও তার মিত্ররা যে হেরে গেছে, এটা ঠিক। ২০ বছর যুদ্ধ করল, তার পর আর পারল না। কিন্তু পারল না কেন? পারল না এই জন্য যে, তাদের যে লক্ষ্য- পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বিস্তার এবং কায়েম রাখা, সেটা জবরদখলের দ্বারা এ যুগে আর সম্ভব নয়। তারা টাকা ঢেলেছে। কিন্তু ঢালার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতিও বাড়িয়েছে। স্বয়ং প্রেসিডেন্টই যখন টাকা গোছানোয় ব্যস্ত ছিলেন, তখন অন্যরা কী করেছে সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। সবাই নিজেরটা দেখছিল। আফগান সেনাবাহিনী গড়ে উঠেছে; তালেবানের বিরুদ্ধে তারা লড়াইও করেছে। কিন্তু তারা ছিল বেতনভুক। তারা ভরসা করছিল আমেরিকার ওপর; আমেরিকা যখন পিছটান দিল তাদের জন্য তখন আর ভরসার জায়গা রইল না। দলত্যাগ করেছে অনেকে- মূলত ভয়ে। কিন্তু প্রাপ্তির যোগ ছিল না, এমনও নয়। আফগান সৈন্যরা ঘুষও খেয়েছে। সবাই দেখছিল নিজের স্বার্থ।
আফগানিস্তানে আমেরিকানরা উন্নতি ঘটিয়েছে। কিন্তু সে উন্নতি সমাজের গভীরে যায়নি। যাওয়ার কথাও নয়। যেতে হলে সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে হতো, যেটা ছিল তাদের উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা একটি শ্রেণি চাচ্ছিল, যারা লেখাপড়া শিখবে, আধুনিক হবে এবং আমেরিকানদের অনুগত থাকবে। ওই শ্রেণির গঠন ও বিকাশে সহায়তা দানের কাজে তারা যে একেবারে ব্যর্থ হয়েছে, তা নয়। কিন্তু ওই শ্রেণিটি শহরের। গ্রামের মানুষ আগের মতোই রয়ে গেছে। তারা দরিদ্র, বঞ্চিত। তালেবান ছিল এই মানুষদের পাশে। বেকার ও হতাশ যুবকদের দলে টানতে তাদের বিশেষ অসুবিধা হয়নি। তারা তো গ্রামেরই লোক; বিদেশি নয়, বিধর্মীও নয়। তালেবান বিপন্ন মানুষের পাশে থেকেছে, সাহায্য করেছে; বিবাদ-বিসম্বাদ মিটিয়ে দিয়েছে। তারা বোঝাতে পেরেছে, তাদের অবস্থানটা বিদেশিদের এবং বিদেশিদের দালালদের বিরুদ্ধে। তারা লড়ছে দেশকে মুক্ত করার জন্য। ২০ বছরের ওই যুদ্ধের ভেতর শ্রেণি-বিভাজন ও শ্রেণি-সংগ্রামের উপাদান যে ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এদিকে যুদ্ধকালে যত সরকারই এসেছে, সবাই তো ছিল পুতুল সরকার।
আমেরিকানদের অবধারিত পরাজয়কে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন আত্মসমর্পণ। বাইডেনের জায়গায় থাকলে তিনি যে জয়ী হতেন, তা মোটেই নয়। আরও অর্থ ব্যয় ও রক্তপাত ঘটাতেন হয়তো। কিন্তু হার না মেনে উপায় থাকত না। লজ্জা আরও বাড়ত। ট্রাম্পের বক্তব্য অবশ্য তার একার নয়; তার দেশের অনেকেই ওই রকমটা বলছেন ও বলতে থাকবেন। ট্রাম্পের সমর্থক এখনও কিন্তু কম নেই। এরা বিশ্বাস করে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যে এবং ট্রাম্পকে মনে করে তাদের যথাযোগ্য মুখপাত্র ও উপযুক্ত সেনাপতি। এই বোধের পেছনে কাজ করছে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য হারানোর ভয়। বিশ্বে আধিপত্য পরে দেখা যাবে, শঙ্কা তো দেখা দিয়েছে নিজের দেশকে নিয়েই। সর্বসাম্প্রতিক আদমশুমারিতে জানা গেছে, আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ জনসংখ্যা এখন নেমে দাঁড়িয়েছে ৬১ দশমিক ৬ শতাংশে, এক দশক আগেও যা ছিল ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ। এদিকে সংখ্যা বাড়ছে আফ্রিকান-আমেরিকান ও এশিয়ান-আমেরিকানদের। আফ্রিকান-আমেরিকানদের চেয়েও এশিয়া থেকে আগত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হার অধিক। আফ্রিকান-আমেরিকানদের তবুও সহ্য করা যায়; তারা খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত, দীর্ঘ সময় ধরে বসবাসকারী; ভাষাও শিখে নিয়েছে ভালোভাবে। কিন্তু এশিয়ান-আমেরিকানদের বৃদ্ধিটা উদ্বেগজনক। কারণ তারা শুধু বাড়ছেই না; তাদের একজন তো ভাইস প্রেসিডেন্টই হয়ে বসেছেন। অন্য অনেক ক্ষেত্রেই তাদের প্রতিষ্ঠা ঘটেছে এবং সাংস্কৃতিকভাবে তারা যে আমেরিকার সঙ্গে মিলে গেছে, এমন নয়। 'স্বদেশে' একক আধিপত্যের আকাশে ঘন মেঘের আনাগোনায় শ্বেতাঙ্গরা অশুভ সংকেত দেখতে পাচ্ছে, শঙ্কিত হচ্ছে এবং তাদের একাংশ কট্টর-রক্ষণশীলতার দিকে ঝুঁকছে।
শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্নেষক