দেশে গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ডলফিনের প্রাণহানি প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য অশনিসংকেত। বিপন্ন এ প্রাণীটির প্রাণহানির ঘটনায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্বেগ যথার্থ। বৃহস্পতিবার সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, গত চার বছরে চট্টগ্রামের এক হালদা নদীতেই ত্রিশটির অধিক ডলফিন মারা গেছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা সর্বাধিক ডলফিন থাকা চট্টগ্রামের এই নদীকেই এত দিন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আবাসস্থল বলে ধারণা দিয়ে আসছিলেন।

আমরা দেখেছি, মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে জেলের জালে আটকা পড়ে হালদায় সর্বশেষ দুটি ডলফিন প্রাণ হারিয়েছে। এমনকি অবশিষ্ট ডলফিনও রয়েছে হুমকিতে। বলাবাহুল্য, সারাবিশ্বেই লাল তালিকায় আছে ডলফিন। বাংলাদেশের সুন্দরবন ও হালদা নদীতে সবচেয়ে বেশি ডলফিনের বিচরণ। কিন্তু প্রতিকূল নানা পরিবেশ হুমকিতে ফেলছে ডলফিনের জীবন। প্রায় দু'মাস আগেও এ সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করে ডলফিন রক্ষায় ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেছিলাম। ওই সময়ও কুয়াকাটায় জেলেদের জালে আটকে ডলফিনসহ অন্যান্য জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীর মৃত্যুর খবর প্রকাশ হয়। চট্টগ্রামের হালদা নদীর মতো কুয়াকাটা সৈকতের আন্ধারমানিক মোহনা ও রামনাবাদ জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণী তথা তিমি, ডলফিন, শুশুক ও পরপয়েসের অভয়াশ্রম হিসেবে ধরা হলেও সেখানেই এসব জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীর মৃত্যু বেশি হচ্ছে।

একই সঙ্গে উভয় স্থানে মৃত্যুর কারণও প্রায় অভিন্ন; চলতি বছর কুয়াকাটা সৈকতে বিভিন্ন প্রজাতির যে আটটি ডলফিনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, এগুলোর প্রতিটির মুখে জাল প্যাঁচানো ছিল। তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন এবং ঠোঁট রক্তাক্ত থাকার মাধ্যমে এটা প্রমাণ হয়, সেগুলো জালে পড়ে কিংবা বড়শিতেই মারা যায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাতটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ডলফিনের ময়নাতদন্তেও গবেষকরা নিশ্চিত হন, ওই নদীতে বেশিরভাগ ডলফিন মারা যাচ্ছে আঘাতজনিত কারণে। ডলফিনের শরীরে মাংসপেশি নেই বলে এটির প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল এবং একটু আঘাত পেলে এটি কাবু হয়ে যায়। এভাবে ডলফিন হত্যা বন্ধ করতেই হবে। এক্ষেত্রে জেলেদেরও করণীয় রয়েছে। তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে স্থানীয় প্রশাসনসহ বন ও মৎস্য বিভাগের দায়িত্বও কম নয়। ডলফিন সুরক্ষায় তাদের তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।

বন বিভাগের নৌযান ও জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয়দেরও ডলফিন সুরক্ষায় সচেতন করা দরকার। আইনে ডলফিন শিকার ও বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও এসব প্রাণী হত্যা বন্ধ হচ্ছে না কেন? আমরা জানি, চট্টগ্রামের হালদা নদীতে গত বছর ডলফিন হত্যার ঘটনায় প্রথমবারের মতো মামলা করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে সেখানকার স্থানীয় প্রশাসন আদালতকে ৯টি পদক্ষেপের কথা লিখিতভাবে জানায়। গবেষকদের মতে, সারাবিশ্বে গাঙ্গেয় ডলফিন খুব বেশি না থাকলেও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে এ প্রজাতির উল্লেখযোগ্য ডলফিন রয়েছে। এদের জন্মহার কম হওয়ায় পরিবেশবাদীরা বেশি সোচ্চার।

আমরা মনে করি, নদী ঘিরে নেওয়া নানা উন্নয়ন প্রকল্পও বিপন্ন প্রজাতির এ ডলফিনের আবাসস্থল ধ্বংস করছে। নদীর নিম্নাংশে বালুতট, বিভিন্ন উপনদী, খাল এবং অন্য নদীর সঙ্গে সংযোগস্থলে এরা বেশি বিচরণ করে বলে নদীতে মাত্রাতিরিক্ত ইঞ্জিনচালিত নৌযান, মাছ ধরার জাল ও ড্রেজার থাকলে ডলফিনের প্রাণ বিপন্ন হয়। আমরা মনে করি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় ডলফিনের ব্যাপারে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ডলফিনের জন্য হুমকি তৈরি হয় এমন যে কোনো কর্মকাণ্ড নদীতে যেমন বন্ধ করতে হবে, তেমনি সাগরেও অভয়াশ্রম রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া চাই। নদী ঘিরে উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশের সম্ভাব্য সব রকম প্রভাব বিবেচনায় রাখা জরুরি। খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম জেলার ওপর দিয়ে বয়ে চলা হালদা নদী দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র। এ নদীটিকে সরকার সম্প্রতি 'বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ' হিসেবেও ঘোষণা করেছে। হালদা রক্ষায় মনোযোগী হলে ডলফিন সুরক্ষায়ও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।