মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের কাছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে বেশ সুপরিচিত নাম। রোহিঙ্গারা তাকে 'মাস্টার মুহিবুল্লাহ' নামেও ডাকতেন। এই সুপরিচিত হয়ে ওঠার পেছনের গল্পে রয়েছে নানা জানা এবং অজানা অধ্যায়। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো গণহত্যা ও বর্বরতার শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের কপবাজার সীমান্তে আশ্রয় নেন। সে সময় থেকেই রোহিঙ্গাদের অধিকার এবং নিজেদের দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য কাজ করতে শুরু করেন মুহিবুল্লাহ। তার কাজের মাধ্যমে তিনি নেতৃত্বহীন রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতায় পরিণত হন। তিনি তার ভাষাগত দক্ষতা এবং মানবাধিকার কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। ২০০০ সালের পর থেকে তারই নেতৃত্বে গঠিত 'আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ)' নামের সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের অধিকারের বিষয়ে ছিল বরাবরই সরব।

রোহিঙ্গা নেতা হিসেবে তিনি আলোচনায় উঠে আসেন ২০১৯ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সময়, যেখানে তিনি রোহিঙ্গাদের নেতৃত্ব দেন। তিনি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে রোহিঙ্গাদের নেতা হয়ে একাধিকবার সফর করেন। সব রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে নিজের শক্তিশালী অবস্থানের বিষয়ে জানান দেন ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা আগমনের বর্ষপূর্তিতে মহাসমাবেশের মাধ্যমে। ধারণা করা হয়, খুব অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে সেদিনের সমাবেশে প্রায় তিন থেকে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা জমায়েত হয়েছিলেন। মুহিবুল্লাহ বরাবরই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশে ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং অধিকারের বিষয়ে বিবৃতি দিলে তার সংগঠন 'আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস' এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায় এবং রোহিঙ্গারা নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণভাবে উপস্থাপন করেন।

সেই মুহিবুল্লার জীবনাবসান ঘটল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে দুর্বৃত্তের গুলিতে। গত ২৯ সেপ্টেম্বরের লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প ইস্ট-ওয়েস্ট ১ নম্বর ব্লকে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন। তার হত্যার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা এবং সার্বিক বিষয় সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবনার উদ্রেক করেছে।

প্রথমেই আসা যাক রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তার বিষয়ে। নানা সময়ে গণমাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে গোলাগুলি, বিভিন্ন মাঝিকে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদক- চোরাচালানের বিষয়টি উঠে এসেছে। আল ইয়াকিন (কপবাজারে রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রিত সশস্ত্র বাহিনীর নাম হারাকা 'আল-ইয়াকিন'), সালমান শাহ গ্রুপের মতো উগ্রবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনের তৎপরতার বিষয়টিও অজানা নয়। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি-আরসার কার্যক্রমের বিষয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে রোহিঙ্গারা যেমন আতঙ্কিত, তেমনি নানাভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে স্থানীয়দের ওপর। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় এলো মুহিবুল্লার হত্যার বিষয়ের মধ্য দিয়ে। কথিত আছে, মুহিবুল্লার নানা কর্মকাণ্ডে ছিল গোয়েন্দা নজরদারি। মুহিবুল্লাহর অবস্থানের বিষয়ে সবসময়ে ছিল একটা রহস্য। তিনি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংগঠন, ব্যক্তি এবং মিডিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ও খুবই সতর্ক অবস্থানে থাকতেন। নানা সময়ে তার ওপর দেশ-বিদেশ থেকে প্রাণনাশের হুমকি ছিল। তিনি বলেন, 'এমনকি রোহিঙ্গা শিবিরে যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো আছে, তাদের তরফ থেকেও তাকে হুমকি দেওয়া হতো। কিন্তু সে হুমকি তিনি উড়িয়ে দিতেন।' (বিবিসি বাংলা, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১)। যেহেতু তার ওপর আগে থেকেই ছিল প্রাণনাশের হুমকি এবং সেটা বিভিন্ন সংস্থার অজানা ছিল না, সেই পরিস্থিতিতে এ ধরনের গুলির ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক।

দ্বিতীয় বিষয় হিসেবে দেখা যাক আধিপত্য বিষয়কে। মুহিবুল্লাহ তার এবং তার সংগঠনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে পেয়েছিলেন রোহিঙ্গাদের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি। কিন্তু বিভিন্ন গোষ্ঠী তার এই ক্যাম্পে আধিপত্যকে মেনে নিতে পারত না। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে তৎপর থাকা বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং আধিপত্যের বিষয়টি ভবিষ্যতের ক্যাম্পের এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তৃতীয় বিষয় হিসেবে দেখা যেতে পারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিকে। এটির মধ্যেই নানা কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি আলোর মুখ দেখেনি। প্রায় চার বছর অতিবাহিত হলেও একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি মিয়ানমার। প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে জাতিসংঘের দুর্বল অবস্থান, চীন, ভারত, জাপান ও রাশিয়ার মতো পরাক্রমশীল রাষ্ট্রের নীরবতা, আন্তর্জাতিক আদালতের শুনানির প্রাথমিক নির্দেশনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ের অনুপস্থিতি, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যকার চুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়া এবং সর্বশেষ জান্তা সরকারের ক্ষমতা দখলের বিষয়টি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করেছে। কবে নাগাদ এই সমস্যার সমাধান হতে পারে, সেটা জানা নেই কারও। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে রোহিঙ্গাদের মাঝ থেকে সরব ভূমিকায় দেখা গেছে মুহিবুল্লাহ এবং তার সংগঠনকে। মুহিবুল্লার স্থলে কে ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মাঝ থেকে উঠে আসবেন, যিনি সদা তৎপর থাকবেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে, সেটা এখন আলোচনার বিষয়। মুহিবুল্লাকে হত্যার মাধ্যমে স্তব্ধ হলো রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের একটি সরব কণ্ঠস্বর। তার হত্যা রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি নিয়ে বিরাজমান ধোঁয়াশাকে আরও বেগবান করতে পারে।

মুহিবুল্লাহকে হত্যা শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিকে হত্যা নয়, এই ঘটনাকে ঘিরে আবর্তন করছে নানা সমীকরণ। এই সমীকরণের নেতিবাচক দিকগুলোকে খুঁজে বের করে মোকাবিলা করার জন্য সজাগ থাকতে হবে।