শিউলি ফুটেছিল। গন্ধ ভেসে আসছিল কি! মনে নেই। উনুনের ধোঁয়া গন্ধ দিয়ে মনে রাখত শরতের ভোরগুলোকে। আমার মা উনুনে আঁচ দিতেন। উনুনের ধোঁয়া শিবের জটার মতো ভেসে যেত কৈলাশের দিকে। আমি ঘুম ঘুম চোখে পৌঁছে যেতাম কুমোরটুলিতে। দুর্গার কাছে, ওনার পুত্রকন্যাদের কাছে, অসুরের কাছে, সিংহ, মহিষ, প্যাঁচা, হাঁস, ইঁদুর ও ময়ূরের কাছে। তখন তারা অনেকেই খড়ের। আর তখনও খড়ের যে কোনো কাঠামোকে দেখলে মনে পড়ত ঘোলা রোডের খাটালের কথা, খড়ের বাছুরের কথা, দুগ্ধপ্রতারণা! আমাদের কলোনির দুর্গা তখন দু'জন। সেন্ট্রালের দুর্গা ও পূর্বাশার দুর্গা। সেন্ট্রালের দুর্গা প্রতিমার মুখ খুব চেনা। যেন এখনই বলে উঠবেন, সন্ধ্যা হয়ে এলো, এবার আয়, দুধমুড়ি খেয়ে পড়তে বোস। সাবেকি। আর পূর্বাশার দুর্গা, রণরঙ্গিনী তার রূপ। আমাদের শৈশবের রণপ্ররোচনা।
পূর্বাশার দুর্গাপুজো আমাদের যতীন দাস কলোনির প্রথম থিমের পুজো। থিমশিল্পীর নাম বিলকুল মনে আছে, তেমন মনে আছে কলোনির রূপান্তর টেইলার্সের নাম। রূপান্তরের মালিক শান্তি। শান্তি কলোনির কালী নাচের দলে কালী সাজতেন। আমার প্রায় মধ্যরাতে চোখ কচলাতে কচলাতে দেখতাম, নাচের আগে ও পরে শান্তি, মাকালী পাঁচিলে পা দোলাতে দোলাতে বিড়ি টানছেন! তার এক হাতে বিড়ি, আর এক হাতে টকটকে লাল জিহ্বা! সেই থিমশিল্পীর নাম দীপক ভট্টাচার্য। তিনি আমার জীবনের প্রথম জাদুকর। যেন ম্যাজিক। পুজোর ক'দিনের জন্য পূর্বাশার প্যান্ডেল হয়ে উঠত জাদুবাস্তবের রণাঙ্গন। দীপক ভট্টাচার্য আমার লতাপাতার আত্মীয়। তারসঙ্গে কিছুদিন পর রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখব, চিনব পুজোর শহর। পুজোর কলকাতা। তিনি জানাবেন যে, কালীমূর্তি রচনাই সবচেয়ে পরিশ্রমের। কালী নগ্নিকা। কালী সুন্দরীতমা। বলবেন, কালীর দেহ নগ্ন, তাই সম্পূর্ণ পলিশ করতে হয়।
পুজোর প্রায় দিন পনেরো আগে থেকেই পূর্বাশার মণ্ডপ হয়ে উঠত আমার জাদুশিক্ষার কারখানা। কাপড়ের পটে আর পেজা তুলোয় তৈরি হতো আকাশ, ওড়ানো হতো পাখি, তৈরি হতো পাহাড়, চটের পাহাড়, তার ওপর সবুজ উপত্যকা। উপত্যকায় দুর্গা আসবেন। তৈরি হচ্ছে আবহ।
ততদিনে কুমোরটুলিতে খড়ের ওপর মাটির প্রলেপ। রং করা হতো প্রতিমার মুখে, গলায়, হাতে। ছাঁচের চোখে তুলি বোলানো হতো। দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতীর এবড়োখেবড়ো প্রায় সর্বাঙ্গ। আর অসুর, গণেশ ও কার্তিকের নিম্নাঙ্গ ঢেকে যেত বস্ত্রে। শুধু চোখের মণি, সেই গোলাকার মরকত আঁকা হতো না তখনও। মহালয়ার ভোরে চক্ষুদান। তারপর প্রতিমা মণ্ডপে মণ্ডপে।
পূর্বাশার মণ্ডপেও এসে গেছে প্রতিমা। খানিক অন্যরকম। ঈষৎ বাঁকা, উড়ন্ত। একটি বাঁশ প্রতিমার পিঠসর্বস্ব পশ্চাৎদেশে গেঁথে দেওয়া। এই বংশদণ্ডটিই দুর্গার একমাত্র অবলম্বন। পা শূন্যে, বাঁশ মাটিতে। বাঁশটি পাহাড়ে ঢাকা। একইরূপে উড়ন্ত কার্তিক, গণেশ, সরস্বতী ও সিংহ, ময়ূর, পেঁচা, হাঁস, এমনকি ইঁদুরটিও। কেবল লক্ষ্মী উড়তেন না, তিনি অচঞ্চলা। যাবতীয় উড়ানের সাক্ষী। আর অসুর, মরিয়া অসুর, তীরবিদ্ধ অর্ধেক অসুর, অর্ধেক মহিষ? তার দিকে ধেয়ে আসছে আরও তীর, ত্রিশূল, চক্র, বল। দীপক ভট্টাচার্য বললেন, এই ধর কালো সুতো, ত্রিশূলের লেজে আর মুড়ায় ভালো করে বাঁধ, বাঁধলাম। দীপক ভট্টাচার্য ত্রিশূলটিকে মণ্ডপের ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দিলেন। বললেন, বাইরে গিয়ে দূর থেকে দ্যাখ, কমসে কম আট ফুট দূর। দূরে গেলাম। তিনি চিৎকার করে জানতে চাইলেন, সুতোটা দেখা যাচ্ছে কিনা, মাথা নাড়লাম, না। তিনি আমার দিকে এগিয়ে এলেন, মাথা নিচু করে গুপ্ত মন্ত্রের মতো বললেন, শোন্‌, মনে রাখবি, আর্টে দূরত্বই একমাত্র সত্য। আমি দূরত্ব জানলাম, সত্য জানলাম।
তারপর পুজো আসে। পুজো চলেও যায়। যে বছর মোহিনী মিল বন্ধ থাকে, সে বছর পুজো ম্লান। যে বছর খোলা থাকে, সে বছর রামধনু। চার দিন, পাঁচ দিন, অতঃপর ঢাকের বোলে বিসর্জন। মণ্ডপ খা খা। শূন্য মণ্ডপে প্রদীপ জ্বলছে। প্রদীপের আলো আমাদের আকাঙ্ক্ষা। আসছে বছর আবার হবে। আবার দেখা হবে যতীন দাসের দুগ্‌গা।
লেখক :পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট কবি