নতুন করে পেঁয়াজের বাজার যেভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আমরা দেখেছি, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এই মসলা পণ্যের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সোমবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে পেঁয়াজের দামের মূল কারণ ভারতের পরিস্থিতি। কার্যত কয়েক বছর ধরেই এ ধারা চলে আসছে। সেখানে পেঁয়াজের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা দাম বাড়লে আমাদের দেশেও দাম বেড়ে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি বলেই ভারতের ভারি বৃষ্টির কারণে কিছু দাম বাড়ায় বাংলাদেশেও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। আমাদের মনে আছে, গত বছর ও তার আগের বছর ভারত তার অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। তাতে সৃষ্ট সংকটে পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পেঁয়াজের অভ্যন্তরীণ চাহিদার অধিকাংশ দেশে উৎপাদিত হলেও উল্লেখযোগ্য অংশ ভারত থেকে আমদানি করতে হয় বিধায় পেঁয়াজের বাজারে দেশটির তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব আমরা দেখে আসছি। অনেক ব্যবসায়ী এ 'সুযোগ' কাজে লাগিয়েছে। দৃশ্যত কোনো লেনদেন না হলেও ওপারের ঘোষণাই এপারে ওইসব ব্যবসায়ীর জন্য যথেষ্ট! গত বছর সেপ্টেম্বরের শেষদিকে ভারত যেদিন বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেয়, সেদিনই কেজিপ্রতি কোথাও ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। একইভাবে এ বছরের শুরুতে দেশটি যখন পেঁয়াজ রপ্তানি করার ঘোষণা দেয়, তখন থেকেই দাম কমতে শুরু করে এবং অক্টোবরের আগ পর্যন্ত বলা চলে দাম ছিল স্থিতিশীল। তবে দেশে প্রধানত শীতকালে পেঁয়াজের চাষ হয় বলে ফেব্রুয়ারিতে বাজারে আসা দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ সেপ্টেম্বর থেকে অনেক কমে যায়। ফলে এ সময়ে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির এটাও অন্যতম কারণ। তা ছাড়া সম্প্রতি জাহাজ ও ট্রাকের ভাড়া এবং ডলারের দর বৃদ্ধিও পেঁয়াজের দামে প্রভাব ফেলেছে। তারপরও আমরা মনে করি, হঠাৎ এভাবে দাম বেড়ে দ্বিগুণ হওয়া এবং অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে যেভাবে চলছে, তার দায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না। যদিও মন্ত্রণালয় বলছে, এ সময়ে দাম বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে পাঁচ লাখ টন স্থানীয় পেঁয়াজ যেমন মজুদ রয়েছে, তেমনি আমদানিও বন্ধ নেই। একই সঙ্গে টিসিবি যখন ৩০ টাকা দরে দৈনিক প্রায় দেড়শ টন পেঁয়াজ বিক্রি করছে এবং এক মাসের মধ্যে গ্রীষ্ফ্মকালীন নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসছে, তার পরও দাম বৃদ্ধি কেন? তার মানে ওই ভারতের প্রভাব। অনেকের আশঙ্কা, বৃষ্টির কারণে উৎপাদন কম হওয়ায় ভারত রপ্তনি বন্ধ করে দেয় কিনা; এ জন্যই ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, এসব ব্যবসায়ী কারা? অযৌক্তিক কারণে চড়া দাম বাড়িয়ে যারা মানুষের জীবনযাত্রা চাপে ফেলছে, প্রশাসন তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনছে না কেন? 'অযৌক্তিকভাবে কোনো পক্ষ দাম বাড়ালে বা কৃত্রিম উপায়ে সংকট সৃষ্টি করলে সরকার আইন মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা নেবে'- বাণিজ্যমন্ত্রী যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বাস্তবে আমরা সেটি দেখতে চাইব। বলা বাহুল্য, বর্তমানে বাজারে শুধু পেঁয়াজই নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য দ্রব্যের মূল্যও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। চাল, ডাল, ডিম, মুরগি থেকে শুরু করে সবজির দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি সম্প্রতি বেড়েছে এলপি গ্যাসের দামও। এ অবস্থায় বাজার নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে পড়েছে। অস্বীকার করা যাবে না, করোনার সংক্রমণ কমে আসায় সারাবিশ্বেই এখন পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এখন পর্যাপ্ত পরিমাণে আমদানি করে বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে। এ ছাড়া কারও কাছে অস্বাভাবিক মজুদ রয়েছে কিনা, তাও দেখা দরকার। প্রতি বছর পেঁয়াজের নিয়মিত যে সংকট হচ্ছে, তা কাটাতে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকেই নজর দিতে হবে। কিছু পদক্ষেপ নিলে তা অর্জন করা কঠিন হবে না। কারও ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের উৎপাদিত পেঁয়াজে যেন অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ হয়, সেদিকে নজর দেওয়া চাই।