আমাদের সমাজে অনেকেই আছে, যারা চোখে দেখে না। তাদের নেই দৃষ্টিশক্তি। দৃষ্টিহীন ব্যক্তির পক্ষে এ বর্ণিল পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব নয়। এ অক্ষমতা জীবন চলার পথে নির্মম এক প্রতিবন্ধকতা। দৃষ্টিহীনতা অনেকের জন্মগত। আবার অনেকে জন্ম-পরবর্তী সময়ে হারিয়েছে দৃষ্টিশক্তি। কিন্তু দৃষ্টিহীনের পথচলা থেমে আছে! না, থেমে নেই। মনের আলোই তাদের শক্তি। মননশক্তির মাধ্যমে তারা জগতের মানচিত্র আঁকে হৃদয়ে। কল্পনাশক্তির মাধ্যমে পৃথিবীর সবকিছুর সঙ্গে তারা পরিচিত হয়। হৃদয়ের কল্পনায় জগতের ছবি এবং মননের শক্তি তাদের পথ চলার উপায়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতার শিকার অক্ষম মানুষ পথচলায় সমাজের সক্ষম মানুষের সহায়তা চায়। মানুষের দাবি নিয়ে দৃষ্টিহীনরাও চায় স্বাধীনভাবে পথ চলতে। বেঁচে থাকতে চায় মানুষের মর্যাদা নিয়ে।
আজ বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস। দৃষ্টিহীন মানুষের অধিকার আদায়ের দিন। দৃষ্টিহীন মানুষের একান্ত মানবিক আবেদন- সমাজের সক্ষম মানুষ জীবন চলাতে তাদের পাশে থাকুক।
দৃষ্টিহীন মানুষের অধিকার আদায়ের যাত্রা শুরু ১৯২১ সালে; যা ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। ১৯৯৬ সাল থেকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রতি বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য : 'ডিজিটাল সাদাছড়ি, নিরাপদে পথ চলি'।
সাদাছড়ি নিরাপত্তার শাব্দিক বিশ্নেষণ হলো 'সাদাছড়ি' ও 'নিরাপত্তা'। 'সাদাছড়ি' অর্থ হলো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতীক বা স্বাধীন পথচলার মাধ্যম। 'সাদাছড়ি' সমাজের সবার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তাদের সহায়তার। দৃষ্টিহীন ব্যক্তিরা এ সাদাছড়িকে নিজের 'চোখ' বলে মনে করে থাকে, যা এক পরোক্ষ দৃষ্টিশক্তি। 'সাদাছড়ি' দৃষ্টিহীনকে নিয়ে এগিয়ে যায় আপন গন্তব্যে। 'নিরাপত্তা' বলতে বোঝায় দৃষ্টিহীন ব্যক্তির সব ধরনের অধিকারের নিরাপত্তা। অর্থাৎ দৃষ্টিহীনের শিক্ষা, চিকিৎসা, চিত্তবিনোদন, কর্মসংস্থান, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, মতপ্রকাশসহ সব ধরনের মৌল-মানবিক অধিকারের নিশ্চয়তা। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীসহ সব প্রতিবন্ধী রাষ্ট্রের নাগরিক এবং সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদেরও আছে মানবিক ও নাগরিক অধিকার।
সামাজিক উন্নয়ন সূচকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এ দেশ। সরকার প্রতিবন্ধীসহ সব অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কল্যাণে প্রণয়ন করছে উপযোগী আইন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কল্যাণে বর্তমান সমাজকল্যাণবান্ধব সরকারের অন্যতম বিশেষ উদ্যোগ 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩' প্রবর্তন। এ আইনের ১৬ নম্বর ধারায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বেঁচে থাকা, সমান আইনি স্বীকৃতি, স্বাধীন মতপ্রকাশ, শিক্ষাসহ ১৬ প্রকার অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে বহুমুখী সংকট বিরাজমান। লোপ পাচ্ছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মান। সমাজে দৃষ্টিহীনের সমস্যা শারীরিক অক্ষমতাজনিত। কিন্তু দৃষ্টিমান মানুষের সমস্যার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষায় :'তারা দেখেও, দেখে না ...। তারা বুঝেও বুঝে না ...।' দৃষ্টিক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি স্রষ্টার মহাশক্তির এক অনন্য নিদর্শন। দৃষ্টিমান সৌভাগ্যবানরা তা মোটেও উপলব্ধি করেন না। বরং নির্লজ্জ অপব্যবহার চলছে এই দৃষ্টিশক্তির। এ দৃষ্টিমান ব্যক্তিরাই খুন করছে, নির্যাতন করছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করছে, মানুষের প্রতি জুলুম করছে; ধর্ষণ করছে নারী-শিশুদের, এমনকি তারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও। দৃষ্টিহীন অসহায় মানুষের অসহায়ত্ব বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। তারা খুঁজে পাচ্ছে না আস্থার জায়গা। ধিক্কার দিচ্ছে এ সভ্য সমাজকে। ধিক্কার দিচ্ছে আমাদের মতো দৃষ্টিসম্পন্ন সুস্থ মানুষকে।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা দেশের অন্যতম সামাজিক সমস্যা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের বিচ্ছিন্ন কোনো অংশ নয়। তারা আমাদেরই অতি আপনজন। সমাজের দৃষ্টিহীন অসহায় মানুষের কল্যাণের মাঝেই মানবের শ্রেষ্ঠত্ব। স্রষ্টার কোনো সৃষ্টিই উদ্দেশ্যহীন নয়। বরং স্রষ্টাকে উপলব্ধির অনন্য মাধ্যম। দৃষ্টিহীনের মতো সমাজের অসহায় মানুষ সমাজের সুষ্ঠু ও সক্ষম মানুষের কাছে উদাহরণ। দৃষ্টিহীন বা মানবিক সাহায্যার্থী যারা, তাদের স্বাধীন জীবন চলায় বাড়াতে হবে সহায়তার হাত। এতেই মানবের উৎকর্ষ। স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের পরম সুযোগ। বৈষম্য নয়; জয় হোক দৃষ্টিহীনের অধিকার।
সহকারী পরিচালক, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বিভাগীয় কার্যালয়, চট্টগ্রাম
newaz.usso@gmail.com