আমাদের পরিবারে দুর্গাপূজা 'নিষিদ্ধ'। আমার মেজো জেঠু তৎকালীন গণকণ্ঠ পত্রিকার সাংবাদিক রমেন দত্ত মৃত্যুর আগে এ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যান। তিনি মারা গিয়েছিলেন দুর্গাপূজারই পঞ্চমী তিথিতে। দুর্গা বড় তেজোময়ী দেবী; সবাই তার আরাধনা করতে পারেন না- এমনটাই বিশ্বাস ছিল আমার জেঠুর। ১৯৭৭ সালে দুর্গাপূজার আগে আগে নেত্রকোনার গ্রামের বাড়িতে মুসলিমরা হামলা করেছিল। পূজার পরপরই পূর্বপুরুষের ভিটা ছাড়তে বাধ্য হন আমার বাবা-জেঠারা। বড় জেঠা দেশান্তরিত হন। আমার বাবা আর মেজো জেঠা বাস্তুচ্যুত হয়েও স্বদেশের মাটি কামড়ে পড়ে থাকার পণ করেন। মাতৃভূমির প্রতি তাদের ভালোবাসা আর অধিকারবোধের কাছে হার মানে আপাত নিরাপদ জীবনের হাতছানি। আমরা তাদেরই উত্তরসূরি।

দুর্গাপূজা দত্ত পরিবারে নিষিদ্ধ হলেও মন্দিরের মালিকানাধীন বাসায় ভাড়া থাকার ফলে দুর্গাপূজা আমাদের জীবনের অন্যতম উৎসব। বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে সুদীর্ঘ সময় ভাড়া থাকা তেরোটি হিন্দু পরিবার মিলে আমাদের এক যৌথ পরিবার। এই যৌথ পরিবারের যে যেখানেই থাকি না কেন, আমরা সবাই একত্র হই দুর্গাপূজা ঘিরে। আমাদের পাশেই আছে একটি শিখ মন্দির, যেটির দেখাশোনা করেন আমাদের নিকটতম মুসলিম প্রতিবেশী। এর বাইরে আমাদের আর সব প্রতিবেশীর মধ্যে কম-বেশি সব ধর্মের পরিবারই আছে।

আমাদের পাড়ার পূজার উৎসব শুধু হিন্দু পরিবারের নয়, এ উৎসব পাড়ার সব ধর্মের মানুষের। দুর্গাপূজা মানেই ছোটবেলার খেলার সাথী কিংবা স্কুলের কাছে-দূরের সহপাঠী বন্ধু কিংবা দীর্ঘদিন দেখা না হওয়া প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ। মণ্ডপে প্রতিমা দেখার ফাঁকে একবার বন্ধু-পরিজনের বাসায় ঢুঁ মারা আর গল্প-আড্ডায় মেতে ওঠা। প্রতি বছর মহাষ্টমী বা নবমীর রাতে পাড়ার ছেলেমেয়ে মিলে বড় বাস নিয়ে ঘুরতে বের হয় অন্যান্য মণ্ডপের প্রতিমা দেখতে। এবারও সবাই ঠিক করেছিল অষ্টমীর রাতে ঘুরতে বের হবে। কোনো কোনো পরিবার থেকে ছেলেমেয়েদের ঘুরতে যেতে দিল না আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে। শেষ পর্যন্ত যে কয়জন ঘুরতে গিয়েছিল, তাদের অভিভাবকরা ছিলেন আতঙ্কিত। কেননা, একের পর এক মন্দির ভাঙার কথা ছড়িয়ে পড়ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

নবমীর বিকেলে আড্ডায় বসেছিলাম এক প্রতিবেশী মামার ঘরে। এর মাঝে মামি এসে অভিযোগ করলেন, 'কালকে সারারাত ঘুমাইতে পারি নাই টেনশানে। চারিদিকে এই অবস্থা, আর এরা গেছে ঘুরতে!' সদ্য কলেজে ভর্তি হওয়া একজন জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা, আসলে কী হইছে রে কুমিল্লাতে?' এই এক কথা আড্ডার পুরো পরিবেশ বদলে দিল। সবাই বলতে শুরু করল, কে কোথায় তার ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য অপমানিত হয়েছে। এক প্রতিবেশী বোনের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ূয়া মেয়ে জানাল, সে যখন দশম শ্রেণিতে, তখন ইসলাম ধর্মের শিক্ষক ক্লাসে বলেছিলেন, হিন্দু ধর্ম খুব খারাপ ধর্ম। এরা মূর্তি পূজা করে। আমার এই বোনের মেয়ে শহরের খুব নামকরা স্কুলের ছাত্রী ছিল। তার ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে স্বনামধন্য এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। ও বলল, 'মাসি, তুমি বিশ্বাস করবে না, এরা দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র, কিন্তু হিন্দুদের ডাকে ডাণ্ডির পোলা বলে।' সবাই একে একে বলতে থাকে বিরূপ অভিজ্ঞতার কথা। এক ভীষণ অপ্রকাশ্য বিষাদে ছেয়ে যায় পুরো উৎসবের পরিবেশ।

আমার জন্য এসব নতুন কিছু নয়। ১৯৯২ সালে যখন বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে হাজার হাজার মন্দির, বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়, সেই সময়ে গভীর রাতে জীবন বাঁচানোর জন্য অন্য সবার মতো আমাদেরও পালাতে হয়েছিল ঘর ছেড়ে। মা বলেন, ১০ বছর বয়সী আমি নাকি সবাইকে পেছনে রেখে পাগলের মতো ছুটতে শুরু করেছিলাম। দূর থেকে অন্য মন্দির আগুনে পুড়ে যাওয়ার ঠুসঠাস শব্দ এখনও আমার কানে বাজে। এখনও আমি সেই সহিংসতা নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখি নিয়মিত। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এটি হলো পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি)। এরপর এমন দু-একবার আমাদের নিজের বাসা ছেড়ে সরে যেতে হয়েছিল আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে। একবার রহস্যজনকভাবে আগুন লেগে পুড়ে যায় আমাদের কালীবাড়ির প্রায় অর্ধেক ঘর। এরপর আরও দু-একবার আমাদের অন্যত্র সরে যেতে হয়েছিল নিজ ঘর ছেড়ে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর আমাদের পাড়ায় আশ্রয় নিতে এসেছিল অনেক আত্মীয়স্বজন। এই তো গত বছরই বাবরি মসজিদ নিয়ে রায় ঘোষণার সময় সবাই খুব আতঙ্কে ছিলাম- যদি কিছু হয়! এখন মাকে সব সময় বলি জরুরি কাগজপত্র এক জায়গায় রাখতে, যেন ঘর ছাড়তে হলে সেগুলো নিয়ে যেতে অসুবিধা না হয়। আমরা সচেতন আর অবচেতন মনে যেন সব সময় প্রস্তুত হয়েই থাকি যে কোনো সময় গৃহত্যাগের। এ ছাড়া আর কোনো উপায় জানা নেই। এ দেশে তো আর দাঙ্গা হয় না। হয় শুধু সংখ্যালঘুর ওপর সংখ্যাগুরুর আক্রমণ; সে হতে পারে ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিংবা জাতিগত সংখ্যালঘু কিংবা ভাবনাগত সংখ্যালঘু।

আমার দুর্গাপূজার আনন্দ নষ্ট হয়েছে এমন অনেকবার। প্রতি বছর ভাবি, এবার ঠিকঠাক উৎসবটা উদযাপন হবে তো? আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? মাদল ব্যান্ডের গানের একটা কথা মনে পড়ছে খুব- 'ওরে ও প্রিয় জন্মভূমি, আর কতকাল রক্ত দেব তোমার বুকেতে?/ ওরে ও প্রিয় মাতৃভূমি, আর কতকাল রক্ত দেব তোমার বুকেতে?' এ রক্ত আমাদের অন্তর্গত ক্ষরণের রক্ত।

১৯৯২ সালে আমরা গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম বাবার মুসলিম বন্ধু ফরিদ কাকু এবং বকুল কাকুর বাসায়। আমাদের পাড়ার সবাই আশ্রয় নিয়েছিল কোনো না কোনো মুসলিম প্রতিবেশীর বাসায়। আমাদের পাড়ার মন্দিরে কখনও কোনো আক্রমণ হতে দেননি আমাদের পাড়ার মুসলিম প্রতিবেশীরা। তারা সবাই তাদের প্রতিবেশীকে রক্ষার জন্য এসেছেন। ক'দিন আগে এক মেয়ের টি-শার্টের পেছনে লেখা দেখেছিলাম, 'ঘরে ঘরে দুর্গা নয়, দুর্গ গড়ে তোলো।' শুধু হিন্দু ধর্মের নয়, সব ধর্ম, জাতি, বিশ্বাসের মানুষের ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। এই দুর্গ শুধু হিন্দুদের ওপর আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য নয়; এ দুর্গ প্রতিরোধ করবে অশুভ সব শক্তির বিকাশে। এ দুর্গ বাংলার ভ্রাতৃত্ববোধ ধরে রাখার দুর্গ।

মানবাধিকার কর্মী