অসহায়। বিচলিত। অস্থিরতা লাঘবে জার্মান বন্ধুদের সঙ্গে, ওদেরই অনুরোধে, বার্লিনের বড় পুজো মণ্ডপে হাজির। বন্ধুরা নারী। সন্তানের জননী। সন্তানকুল শুনেছে, দেখেছে (টিভি চ্যানেলে) 'পুজোয় চমৎকার সাজানো স্ট্যাচু (দুর্গা)। পরনে ঝলমলে পোশাক। সজ্জা। মণ্ডপে নাচ, গানবাজনা। বিনে পয়সায় ভোজ।'

কোনো ধর্মীয় পরবে যোগ দিই না। হোক তা ঈদ, পুজো, খ্রিষ্টীয় লগ্নে (যিশুলগ্নে)।

ভুল বললুম। কৈশোরে পাবনা শহরের কালাচাঁদপাড়া, রাধানগরের পুজোয় গিয়েছি। মন্ডামিঠাই পাওয়ার লোভে। পুজোয় বাহারি মেলা। মা-বোন যেতেন কেনাকাটায়। সঙ্গী হতুম।

সিদ্ধেশ্বরী হাই স্কুলে পড়াকালীন কালীমন্দিরে গিয়েছি পুজোয়। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে। থাকতুম মালিবাগে। সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির এক কিলোমিটার দূরত্বঢ নয়। বিনে পয়সায় পুজোর খাওয়া এবং ওই বয়সে যৌবনের শুরুতে, যা হয়, ঘুরে ঘুরে সুন্দরী মেয়ে দেখা। দর্শক হিন্দুর চেয়ে বেশি মুসলিম। দু'জন হাজির মেয়েকেও দেখেছি। বোরকা বা হিজাব পরা নয়।

কলকাতায়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন, ছাত্রাবাসে (হোস্টেল) আস্তানা। বিখ্যাত হোস্টেল। নকশালদের ঘাঁটি। রুমমেট অলোক চট্টোপাধ্যায় খাঁটি ব্রাহ্মণ। গলায় পৈতে। সাতসকালে গীতাপাঠ। বলতেন, 'কোরআন পড়ো না কেন?' বিরোধ ছিল না দু'জনের। বরং দোস্তি। সৌহার্দ্য।

বিশ্বভারতীর সংগীত শিক্ষার্থী আমিনুর রহমান (নিঝু)। প্রতি মাসেই শান্তিনিকেতনে যেতুম। পাঁচ-সাত দিন থাকা। অন্নদাশঙ্কর রায়ের 'ইতি' নামক বাড়িতে। নিঝুসহ বিশ্বভারতীর বহু ছাত্রছাত্রী, বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রী আসতেন। আড্ডা দিতুম। বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীর অনেকেই (গায়ক-গায়িকা) এখন বহুমানিত শিল্পী। লিলি ইসলাম (পূর্ব নাম লিলি গঙ্গোপাধ্যায়), সাদী মহম্মদ, আরও অনেকে। মাহবুব তালুকদারের স্ত্রী শহীদা আখতারও (তিনি গবেষক তখন)। প্রত্যেকে স্নেহভাজন/ভাজনীয়া।

থাকি যাদবপুর ছাত্রাবাসে। নিঝুর চিঠি পেলুম একদিন, বয়ান; 'আমার বড়ো ভাই গোলাম রহমান মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় লেখাপড়া শেষ করেছেন। কলকাতায় যাবেন। আপনি একটু দেখাশোনা করবেন।' চিঠির সপ্তাহ দুয়েক পরেই গোলাম রহমানের চিঠি :'এই তারিখে কলকাতায় আসছি।'

ভাবলুম, কোনো হোটেলে উঠবেন। না। স্যুটকেস নিয়ে হোস্টেলে হাজির। থাকবেন। নিরুপায়, রুমমেট অলোক চট্টোপাধ্যায়কে বলি। সানন্দে রাজি। একই বিছানায় দু'জন। হোস্টেলের রাত্রির খাবারও ভাগ করি।

গোলাম রহমান এক মাসের জন্যে যুগান্তর-এ (দৈনিক) শিক্ষানবিশী। বার্তা সম্পাদক অমিতাভ চৌধুরী (আগে ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার নিউজ এডিটর) জিজ্ঞেস করলেন :'শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়েছে?'

বলি, 'মেয়েরা ওর দিকে নজর দিচ্ছে, অমৃতবাজার পত্রিকার রিপোর্টার কৃষ্ণাও।' গোলাম রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যাপক, পরে কী কী সব পোস্টে, দায়িত্বে অজানা। এখন 'আজকের পত্রিকা'র সম্পাদক।

স্মৃতিচারণের শানেনজুল, হিন্দু-মুসলিমের একাত্মতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে। দিন পাল্টেছে। বাংলাদেশে যত দিন যাচ্ছে, মুসলিমরা (সবাই নয়, কিছু) হিন্দুদের বিরুদ্ধে। হিন্দুরা অসহ্য। নানা উছিলায়, মিথ্যায় সাম্প্রদায়িকতায় মরিয়া। রাজনীতি। ধর্মের নামে দাঙ্গা। সাম্প্রতিক উদাহরণ। মূলে গভীরতর ষড়যন্ত্র। নানা অভিধায়।

সরকারও দোষী। তৈরি করেছে 'ডিজিটাল আইন'। বাংলাদেশের এক জেলায় একজন হিন্দু থানায় গিয়ে অভিযোগ করেছেন :'ফেসবুকে আমার নামে মিথ্যে পোস্ট দিয়ে বলা হচ্ছে- ইসলামকে অবমাননা করেছি। মিথ্যে।' থানার পুলিশ তাকেই গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠিয়েছে। পাঁচ মাসেও মুক্তি নেই। ইউরোপ হলে পুলিশকেই জেলে পাঠাত।

অসহায়, বিচলন, অস্থিরতার কথা বলছিলুম।

জার্মান টিভির তিনটি চ্যানেলেই খবরের শিরোনাম :বৈরুতে দাঙ্গা, হত্যা। বাংলাদেশে পুজো মণ্ডপে আক্রমণ, চারজন হত্যা।'

জার্মান বন্ধুরা জেনেও প্রশ্ন করেননি, পুজোমণ্ডপে কলকাতার বাঙালি (বাংলাদেশের বাঙালি বিস্তর) : 'বাংলাদেশে হিন্দু মারছে পুজোয়, এই কি আপনার সেক্যুলার দেশ?

বলি, 'গভীরতর ষড়যন্ত্র। পাকিস্তানসহ ইসলামিক দেশ গভীর-গোপনে। হাসিনা ট্যাকেল করবেন কঠোরতায়, বিশ্বাস রাখুন।'

-ওরা অবিশ্বাসী। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, 'হিন্দুর জমিজমা দখলের পাঁয়তারা, আ'লী (আওয়ামী লীগ) নেতাকর্মী নয় কি? আছেন। হিন্দু উচ্ছেদে আওয়ামী লীগও। তলিয়ে দেখুন। সাফাই গাইবেন না। গোপনে-গভীরে সরকারও।'

- কী বলব? চুপ। বিচলিত। অস্থিরতায় জার্মান বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতার, বাংলাদেশেরও দুর্গার নবরূপ দেখি। লাঘব অস্থিরতায়।

কবি