মাগুরা সদরের জগদল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সদস্য প্রার্থী হওয়া নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে সহিংসতায় চারজন নিহত হওয়া যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি আতঙ্কে স্থানীয়দের গ্রাম ছেড়ে যাওয়াও নজিরবিহীন। রোববার সমকালের সচিত্র প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, চার খুনের ঘটনার পর বাড়ির আসবাব, ধান-চাল, গবাদি পশু নিয়ে নিরাপদ স্থানে ছুটছে গ্রামের নারী-পুরুষ। এমনকি ওই এলাকার অধিকাংশ বাড়ি এখন পুরুষশূন্য!

আমরা জানি, স্থানীয় নির্বাচনে তৃণমূলের সবচেয়ে কাছাকাছি ধাপ সদস্যপদ। নির্দিষ্ট ওয়ার্ডভিত্তিক এ সদস্য নির্বাচিত হন বলে তার ক্ষমতা কিংবা প্রভাব বলা চলে সীমিত। এর পরও ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ সদস্য পদপ্রার্থী হওয়া নিয়ে চারজনের প্রাণহানি সমাজের সর্বস্তরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার বার্তা দেয়। বলাবাহুল্য, এ ঘটনায় স্থানীয়দের গ্রাম ছাড়ার দৃশ্য এটাই প্রমাণ করছে- সেখানকার মানুষ স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি আস্থাশীল নয়। মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার যদিও বলেছেন- 'সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। শুধু হত্যাকাণ্ডে জড়িতদেরই গ্রেপ্তার করা হবে।'

প্রশ্ন হলো, তার পরও মানুষ এভাবে গ্রাম ছাড়ছে কেন? আমরা মনে করি, মানুষকে অভয় দিতে স্থানীয় প্রশাসন যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। বস্তুত বিগত প্রায় সব স্থানীয় নির্বাচনেই সহিংসতার যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তার দায় নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এর আগেও আমরা এ সম্পাদকীয় স্তম্ভে নির্বাচনী সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। তার পরও নির্বাচন কমিশন সহিংসতা বন্ধে যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেনি। স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

সহিংসতামুক্ত ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, এমনকি প্রয়োজনে সেনাবাহিনীও কাজে লাগাতে পারে। বড় সব দল অংশ না নেওয়া সত্ত্বেও গত মাসে অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের স্থগিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও প্রাণহানি ঘটেছে। ১৬০ ইউপির ভোট গ্রহণের সময় তিনজন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ রাখা হলেও বর্তমান কমিশনের বিরুদ্ধে আগে যেমন অভিযোগ ছিল, তেমনি মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসেও তারা এ দায়িত্ব পালনে একই ধারা বজায় রেখেছে! নির্বাচনের আগে সহিংসতা রোধে যে ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, দৃশ্যতই মাগুরায় তা নেওয়া হয়নি।

সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, এর আগেও সেখানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তার পরও প্রশাসন কেন আগাম ব্যবস্থা নেয়নি? এমনকি সহিংসতার পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যেসব পদক্ষেপ দ্রুতই গ্রহণ করা উচিত সেখানেও ঘাটতি স্পষ্ট। মাগুরার ঘটনার পর স্থানীয়দের গ্রামছাড়া হওয়ার ঘটনা তারই প্রমাণ। আমরা চাই, অপরাধীদের যেমন শাস্তি নিশ্চিত হোক, তেমনি নিরপরাধ মানুষেরও নিরাপত্তা প্রদান করা হোক। নিরপরাধ মানুষ বিশেষ করে নারী-শিশুদের এভাবে গ্রাম থেকে আতঙ্কে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সভ্য সমাজে কল্পনা করা কঠিন।

আমরা মনে করি, মাগুরায় সংশ্নিষ্ট এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে স্থানীয়দের অভয় দেওয়া উচিত। ওই ঘটনার জেরে নতুন করে যেন কোনো ধরনের সহিংসতার ঘটনা না ঘটে, তাও নিশ্চিত করা জরুরি। সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, নিহত চারজনের মধ্যে দু'জনই একই পরিবারের এবং পরস্পর ভাই। আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। দেশে নির্বাচনী সহিংসতার যে ধারা চলে আসছে, তা বন্ধ করতেই হবে। সে জন্য আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।