সম্প্রতি হাত ধোয়া দিবসে সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সার্বিকভাবে আমাদের হাত ধোয়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার বিষয়টি এসেছে। করোনা সংক্রমণের হার যখন নিচের দিকে, স্বাভাবিকভাবেই হাত ধোয়ার ওপর তার প্রভাব পড়েছে। কিন্তু বলার বিষয় হলো, ব্যক্তিগতভাবে এ প্রবণতা যতটা না কমেছে, তার চেয়েও কমেছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। করোনার হার যখন ঊর্ধ্বমুখী ছিল তখন এসব প্রতিষ্ঠানে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা যেমন ছিল, তেমনি ছিল কড়াকড়িও। হঠাৎ যেন সব ব্যবস্থা উধাও। অফিস, মার্কেট, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এ ব্যবস্থা শিথিল হয়ে গেছে। হাত ধোয়ার ব্যবস্থা যেমন কমছে; হ্যান্ড স্যানিটাইজের বিষয়টিও তথৈবচ। মাস্কের কথা বলাই বাহুল্য। তবে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা যা-ই হোক, ব্যক্তিগতভাবে এসব ভালো অভ্যাস কমে যাওয়ার বিষয়টি বেশি উদ্বেগজনক। স্বাভাবিক সময়েও মাস্ক ব্যবহার করলে নাক-মুখ দিয়ে ধুলাবালি ও জীবাণু প্রবেশ করতে পারে না। হাত ধোয়া শুধু করোনা থেকেই সুরক্ষা দেয় না, প্রাত্যহিক জীবনাচরণেও এটি অত্যাবশ্যকীয় অভ্যাস।

খালি চোখে অনেক কিছুই আমরা দেখি না; তার পরও সেসবের অস্তিত্ব রয়েছে। মানুষের সীমাবদ্ধতার কারণে নিকটে-দূরের অনেক বস্তুই আমাদের দেখা সম্ভব হয় না। শরীরে মশা-মাছি বসতে গেলে আমরা টের পাই বলে তাড়িয়ে দিই। কিন্তু হাতসহ আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে যে কত ব্যাক্টেরিয়া বা জীবাণু বাস করে, তা জীববিজ্ঞানীরাই ভালো বলতে পারবেন। ড. মার্কুস এগার্ট নামে এক জীববিজ্ঞানী বলেছেন, প্রত্যেক মানুষের শরীরে প্রায় দেড় কেজি জীবাণু বাস করে। আরেক হিসাব বলছে, হাতের প্রতি বর্গসেন্টিমিটার জায়গায় প্রায় ১৫০০ জীবাণুর বাস। তার মানে, প্রত্যেকের হাতে মোটামুটি ২০-৩০ হাজার জীবাণু রয়েছে। আমরা যখন হাত ধোয়া ছাড়া খাবার খাই তখন এসব জীবাণু পেটে গিয়ে গণ্ডগোল পাকায়, যা নানা ধরনের রোগের কারণ হতে পারে।

করোনা সুরক্ষায় প্রায় অব্যর্থ দাওয়াই হিসেবে আমরা হাত ধোয়া বিষয়ে সবাই যেভাবে সচেতন ছিলাম, এখনও সুস্থতার জন্য সে চর্চা ধরে রাখা প্রয়োজন। সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড না হোক; জীবাণু ধ্বংস করতে কয়েক সেকেন্ড হলেও ধোয়া প্রয়োজন। আমাদের হাত প্রায় সার্বক্ষণিক খোলা থাকে। হাত দিয়ে আমরা নানা কাজ করি। এই হাত দিয়েই যখন চোখ, কান, নাকসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল অঙ্গ স্পর্শ করা হয়, তখন সেসব অঙ্গও সংক্রমিত হতে পারে।

করোনার কারণে ঘন ঘন হাত ধোয়ার যে বাধ্যবাধকতা ছিল, এখন সেভাবে মানতে হবে- এমনটি নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময়ে হাত ধোয়া জরুরি। খাবারের বিষয়টি আগেই বলেছি। তবে খাবার শুধু গ্রহণের সময়েই নয়, বরং তা তৈরির আগে-পরেও হাত ধোয়া প্রয়োজন। বাইরে থেকে বাড়িতে ঢুকেই প্রথম কাজ যেন হয় সাবান দিয়ে ভালো করে হাত দুটি ধোয়া। শৌচকার্যের পরও হাত ধুতে হবে। ময়লা-আবর্জনা কিংবা প্রাণী স্পর্শের পরও এটি করতে হবে। ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজই হওয়া উচিত হাত ধোয়া। তা ছাড়া শিশু পালনকারী মা এবং অসুস্থ ব্যক্তি ও তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিরও এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হয়।

আমরা জানি, সচেতন ব্যক্তি কিংবা পরিবার স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ হিসেবেই হাত ধোয়ার চর্চা করেন। করোনার কারণে সে চর্চা মাঝে আরও বেড়েছে এবং প্রায় সবাই তাতে অভ্যস্ত হয়েছেন। এখন আবার হাত ধোয়ার প্রবণতা কমছে। ভালো ও জরুরি অভ্যাস হিসেবে এটি বজায় রাখাই কাম্য। শুধু করোনার বিস্তৃতি রোধই নয়; জ্বর ও ডায়রিয়ার মতো রোগের প্রাদুর্ভাব রোধেও এ প্রবণতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ছোট থেকেই শিশুদের মাঝে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে অভিভাবকের প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সমকালের প্রতিবেদনেই আমরা দেখছি, এখনও উল্লেখযোগ্য পরিবারে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা নেই। তাদের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ এগিয়ে আসুক। আমরা প্রত্যাশা করি, করোনা চলে যাক। কিন্তু করোনা যেসব ভালো অভ্যাস গড়ে দিয়ে গেছে, তা চালু থাকুক। কোনো রোগের চিকিৎসার চেয়ে সব সময়ই সাবধানতা উত্তম।

সাংবাদিক ও গবেষক
mahfuz.manik@gmail.com