দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বেড়ে চললেও এসব মামলায় বিচার না হওয়ার বিষয়টা রোববার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে যেভাবে এসেছে, তা বিস্ময়কর। এমনকি কক্সবাজারের রামু ট্র্যাজেডি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সহিংসতা ও যশোরের মালোপাড়ায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলার মতো গুরুতর অঘটনের মামলারও সন্তোষজনক অগ্রগতি নেই। সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে; সাক্ষীদের অনাগ্রহ, তদন্ত প্রক্রিয়ায় দুর্বলতাসহ নানা কারণে বছরের পর বছর এসব মামলার বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে।

আমরা দেখেছি, প্রতিটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর দেশের নাগরিক সমাজ সোচ্চার। এমনকি সম্প্রতি পূজামণ্ডপে হামলা, হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভেও অভিযোগ করা হয়, অতীতের হামলা-লুটপাটের বিচার না হওয়ায় বারবার এমন ঘটনা ঘটছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিচারের আশ্বাস দেওয়া হলেও এসব মামলার 'কচ্ছপ গতি' দুঃখজনক। আমরা মনে করি, অপরাধীদের বিচার না হওয়ার দায় প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। সম্প্রতি বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার সময় থেকে দেশব্যাপী যেভাবে সাম্প্রতিক সহিংসতা ঘটেছে, তাতেও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আমরা এ সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বলেছি, এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনের পদক্ষেপ অনেকটা রোগী মারা যাওয়ার পর ডাক্তার আসার মতো।

তবে স্বস্তির বিষয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণেই কুমিল্লার পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনায় অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন ধরা পড়ে। আমরা জানি, কুমিল্লার এ অঘটনের জেরেই পরবর্তী সময়ে দেশের উল্লেখযোগ্য স্থানে হিন্দু সম্প্রদায় আক্রান্ত হয়। প্রশ্ন আসছে- ইকবাল স্বেচ্ছায় এ অঘটন ঘটিয়েছে, নাকি নেপথ্যে কেউ ছিল। এ উত্তর খোঁজা যেমন জরুরি, তেমনি নেপথ্য অপরাধীদের প্রকাশ্যে এনে বিচার করাও জরুরি।

সমকালের প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র-আসকসূত্রে প্রকাশ, ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাড়ে তিন হাজারের অধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এরপরও কোনো হামলায় অপরাধীর বিচার হয়নি কেন? সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে এ নজির নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আবহমানকাল থেকে এ ভূখণ্ডে সব জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষ পারস্পরিক সম্পর্ক ও সদ্ভাব বজায় রেখে মিলেমিশে বাস করছে। এখানে মাঝেমধ্যে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বটে, কিন্তু সরকারসহ সংখ্যাগরিষ্ঠের অসাম্প্রদায়িক মনোভাব অপশক্তিকে সব সময় দমন করেছে।

আমরা জানি, সব ধর্মের মানুষের মিলিত রক্তস্রোতের বিনিময়েই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এমনকি আমাদের সংবিধানেও সবার নাগরিক অধিকার এবং সব ধর্মে ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিতের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এর পরও এখানে একজন নাগরিক যদি ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আক্রান্ত হন, তা হতাশাজনক। সব নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব সবার আগে। তাদের কাজ কেবল অঘটন ঘটে যাওয়ার পরে পদক্ষেপ গ্রহণই নয়, বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে আগেই বিপদ আঁচ করা এবং সে অনুযায়ী আগাম ব্যবস্থা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রদায়িক হামলার প্রায় প্রতিটি ঘটনায় দেখা গেছে, গুজব ছড়িয়ে এবং ধর্মীয়ভাবে স্পর্শকাতর বিষয়ে অবমাননার গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরি করা হয়। অস্ত্র হিসেবে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা যে কোনো বিচারে গুরুতর। এসব ঘটনায় দেশের ভেতরে তো বটেই, বাইরেও দেশের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। সে জন্য প্রতিটি ঘটনার বিচার এবং এসব অঘটন ষড়যন্ত্র কিনা কিংবা কারা গোপনে থেকে কলকাঠি নাড়ছে, তাদের শনাক্ত ও আটক করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। না হলে বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।

আমরা চাই- রামু, নাসিরনগর, মালোপাড়া কিংবা সাঁওতালপল্লির ঘটনার মামলাগুলো নতুন গতি পাক। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় অন্য সব মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করে অপরাধীর সাজা নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে তো বটেই, অঘটনের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচনেও তা জরুরি। 'জাস্টিস ডিলেইড জাস্টিস ডিনাইড'- আপ্তবাক্যে যথার্থ বলা হয়েছে, বিলম্বিত বিচারে বিচারপ্রার্থীর বঞ্চনা ঘটে।