যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোতে আজ শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের ২৬তম আসর বা কপ-২৬। এবারের আসর নিয়ে অনেক প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবতা বলা কঠিন। তবে এটা সত্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী খারাপের দিকে যাচ্ছে। ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেইঞ্জ বা আইপিসিসির সর্বশেষ রিপোর্টে এ চিত্র ফুটে উঠেছে। আইপিসিসি অনেক রিপোর্ট প্রকাশ করে, তবে তিনটি মূল রিপোর্ট তথা বিজ্ঞান, ভঙ্গুরতা ও অভিযোজন এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর হার। আইপিসিসির বিজ্ঞান রিপোর্টই অবস্থা খারাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে দুই মিলিয়ন বছরের মধ্যে এখন সর্বোচ্চ গ্রিনহাউস গ্যাস জমা হয়ে আছে। আমরা প্যারিস চুক্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি ২১০০ সাল নাগাদ পৃথিবী ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উষ্ণ হতে দেব না। তুলনা হচ্ছে ১৭৬০ সালে শুরু শিল্পবিপ্লবের পূর্বের অবস্থার সঙ্গে। কিন্তু আইপিসিসির রিপোর্টে বলা হয়েছে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ২০৩০ থেকে ২০৪০-এর মধ্যেই পৌঁছে যাবে। ইতোমধ্যে ১৮৫০ থেকে ১৯০০ সালের যে গড় ছিল, বর্তমানে তা থেকে ১ দশমিক ১ ডিগ্রি বেড়ে গেছে। এর ফলে চারদিকে আমরা ধ্বংসলীলা দেখছি- বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হওয়ার ফলে নদনদী ও উপকূল দিয়ে লবণাক্ততা ঢুকছে। আরেকটি বিষয় হলো- ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি কিংবা বৃষ্টি না হওয়া ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বেড়ে গেছে, তেমনি এদের বিধ্বংসী রূপ আমরা দেখছি।

এখন করণীয় কী। গ্রিনহাউস গ্যাস কমিয়ে এনে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ একটা জরুরি বিষয়। সেটা প্রধানত উন্নত বিশ্বের দায়িত্ব। কিছু বড় উন্নয়নশীল দেশ দ্রুত শিল্পায়িত হচ্ছে বলে তারাও অধিক হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করছে। এদেরও দায়িত্ব রয়েছে। আরেকটি হলো- অভিঘাত মোকাবিলা করা। যেমন নদীভাঙন কিংবা উদ্বাস্তু হওয়া, লবণাক্ততা বাড়ার ফলে ওই এলাকাগুলোর ভূমি উর্বরতা হারাচ্ছে। অনেক জায়গায় বাঁধ অকেজো হয়ে গেছে। এখন বন্যা হচ্ছে ঘন ঘন। যখন বৃষ্টির হওয়া কথা তখন বৃষ্টি হচ্ছে না। আবার অন্য সময়ে বৃষ্টি হচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশে বর্ষাকালেও কোনো কোনো অঞ্চলে খরা হচ্ছে। এতে মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে। এগুলো মোকাবিলা করতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নানা সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের অর্থ, প্রযুক্তি ও দক্ষতার সীমাবদ্ধতা আছে কিন্তু পরিকল্পনার অভাব নেই। আমাদের কর্মসূচি ও কৌশলও আছে। এমনকি বাংলাদেশ সরকার বেশ অর্থ খরচও করছে। যেমন গত বছর জাতীয় আয়ের ১ দশমিক ৫ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় খরচ করেছে। তবে আমাদের অনেক বেশি অর্থের প্রয়োজন, সেই সামর্থ্য আমাদের নেই।

গ্রিনহাউস গ্যাস কমানো আমাদের মূল দায়িত্ব না। কারণ, আমরা খুব কম কার্বন নিঃসরণ করি। তারপরও আমরা বলেছি বিশ্বের অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা নিঃসরণ কমাব। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বছরে গড় মাথাপিছু যে নিঃসরণ, তার ছয় ভাগের এক ভাগ নিঃসরণ করে বাংলাদেশ। মাথাপিছু হিসেবে এক টনের তিন ভাগের এক ভাগ। উন্নত বিশ্ব মাথাপিছু ১০ থেকে ১৭ বা তারও বেশি টন নিঃসরণ করে। চীন নিঃসরণ করে ৭-৮ টন। ভারত নিঃসরণ করে ২ টনের বেশি।

 

আমরা যে অভিযোজন করব বা খাপ খাওয়াবো সেখানেই অর্থায়নের প্রসঙ্গ। উন্নত বিশ্ব তাদের দায় স্বীকার করে নিয়ে বলেছে, তারা ২০২০ সাল থেকে বছরে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ দেবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জলবায়ু অর্থায়নের জন্য কয়েকটি তহবিল আছে- যেমন জিসিএফ বা গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, এডাপটেশন ফান্ড, লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রি ফান্ড, দ্বিপক্ষীয় অর্থায়ন ইত্যাদি। তবে জিসিএফের মাধ্যমে সর্বাধিক অর্থ উন্নত বিশ্ব থেকে উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে বিতরণ করার কথা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করতে ২০১০ সালে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হয়। এর মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ টাকা বাজেট থেকে এই ফান্ডে দেওয়া হয়েছে এবং এই অর্থ দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিগত বছরগুলোতে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে বা হচ্ছে।

কথা ছিল উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ অর্থই আসবে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড বা সবুজ জলবায়ু তহবিলের মাধ্যমে। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে প্রথম ১০ বিলিয়ন ডলার তহবিল গঠন করা হয়। সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১ বিলিয়ন ডলার দিয়েছিল। আরও দুই বিলিয়ন দেওয়ার কথা থাকলে ডোনাল্ড ট্রাম্প দেননি। জো বাইডেন আসার পর তারা ২ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। এখন উন্নত বিশ্বের সবাই মিলে ১০-১২ বিলিয়ন ডলার দেবে বা তাদের থেকে অঙ্গীকার পাওয়া গেছে।

সবুজ জলবায়ু তহবিলের একটা সমস্যা হচ্ছে, এখান থেকে অর্থ পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ভঙ্গুর দেশগুলোতে একটি প্রকল্প হওয়ার পর অর্থ পেতে অনেক সময় লাগে। একটা প্রকল্প জমা দিলে, যত ভালো প্রকল্পই হোক না কেন তাদের কিছু পরামর্শক আছে- তারা নানা প্রশ্ন উত্থাপন করে। সেগুলোর জবাব দিলে আবার নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে। এমনকি অনেক সময় দেখা যায়, একই প্রশ্ন বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে করে। এভাবে দু'তিন বছরও লেগে যায়। এরই মধ্যে আমাদের সমস্যা আরও বেড়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই তিন বছর পর সেখানে অর্থ আরও বেশি প্রয়োজন হয়। এটা নিয়ে দেনদরবার হচ্ছে। আমরা এ প্রক্রিয়া দ্রুততর করার কথা বলেছি। কিন্তু তারা সেভাবেই চলছে। অনেকে তো বলেছেনও আসলে অর্থ না দেওয়ার জন্য তারা এমনটি করছে।

এক সময় কথা ছিল জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল সব অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। কত টাকা তারা দিচ্ছে আগেই তা জানা যাবে। কিন্তু পরে জিসিএফ হওয়ার পরে নিয়ম অনেকটা বদলে গেছে। এখন নিয়ম হয়েছে কো-ফাইন্যান্সিং বা সহ-অর্থায়ন। অর্থাৎ তারা যদি কিছু টাকা দেয়, আমাদেরও কিছু অর্থ খরচ করতে হবে। যেমন ধরা যাক ১০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। ওরা সেখানে ৭ কোটি টাকা দিয়ে বলবে বাকি টাকা তোমরা দাও। বা বলতে পারে উভয়ই অর্ধেক অর্ধেক দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে। আর কিছু টাকা তারা ঋণ দিচ্ছে। স্বল্প সুদে ঋণ, যেটা পরে ফেরত দিতে হবে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত জিসিএফ থেকে কমবেশি ১০০ মিলিয়ন ডলার অর্থ পেয়েছে। সেটাও বিভিন্নভাবে পেয়েছে। একটা পথ হলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যেমন ইউএনডিপি বা জার্মান প্রতিষ্ঠান কেএফডব্লিউর মাধ্যমে পেয়েছে। আরেকটা মাধ্যম হলো ওদের স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাওয়া। বাংলাদেশে দুটি প্রতিষ্ঠান ওদের স্বীকৃত- পল্লী-কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন বা পিকেএসএফ এবং ইডকল। পিকেএসএফের মাধ্যমে যে অর্থ আসে সেটা মূলত অনুদান। এ পর্যন্ত পিকেএসএফের মাধ্যমে ১০-১১ মিলিয়ন ডলার মতো এসেছে। আরও কিছু অর্থ শিগগিরই আসার কথা রয়েছে। এই অর্থ এবং ইউএনডিপিসহ অন্যান্য মাধ্যমে প্রাপ্ত অনুদান এসেছে ১০০ মিলিয়নের মতো। ইডকলের মাধ্যমে ঋণ এসেছে আড়াইশ মিলিয়ন ডলার। ৬ মিলিয়ন তারা অনুদানও পেয়েছে। আগেই বলেছি, জলবায়ু পরিবর্তনে অভিযোজনে আমরা বাজেট থেকেও খরচ করি। ২০০৯ সালে করা একটি পরিকল্পনা ও কৌশলপত্রের মাধ্যমে আমরা কাজ করছি। অবস্থার আলোকে নতুন করে সেটা আবার সাজানো হচ্ছে। কিছু প্রকল্প আমরা নিজেরাই করছি।

সার্বিকভাবে আমরা বলতে পারি, সবুজ জলবায়ু তহবিল বাস্তবায়নে উন্নত বিশ্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেভাবে এগিয়ে আসেনি। ২০২০ সালের পর এখন ২০২১ এই দুই বছরে ২০০ বিলিয়ন ডলার অর্থ দেওয়ার কথা থাকলেও তারা দিয়েছে ২০ বিলিয়ন ডলারের মতো। ওরা যদিও বলছে আরও ৬০ বিলিয়ন ডলার অর্থ তারা এ খাতে দিয়েছে, সেটা ধরলেও এখনও ১২০ বিলিয়ন ডলারের মতো অর্থ পাওয়া যায়নি। কাজেই তারা আসলে কথা রাখেনি।

এবারের জলবায়ু সম্মেলনে সবুজ জলবায়ু তহবিল নিয়েও আলোচনা হবে। কিছু অগ্রগতিও নিশ্চয়ই হবে। তবে বাস্তবতা জানার জন্য সম্মেলনের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ও পিকেএসএফের চেয়ারম্যান