পরিচয়ের শুরুতেই কেউ যদি জিজ্ঞেস করে- আপনি কি হিন্দু? খুব বিরক্ত বোধ করি! আমি জলজ্যান্ত একজন মানুষ- এই পরিচয় কি যথেষ্ট নয়? কারও ধর্মীয় পরিচয় জেনে কে কী রহস্য উদ্ঘাটন করবে? এক শ্রেণির বিকৃতমনার কাছে মনুষ্যত্বের নিয়ম ছাপিয়ে ধর্মীয় পরিচয়টাই মুখ্য হয়ে ওঠে অনেক সময়! ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে তারা ব্যক্তির যোগ্যতার পরিমাপ করে। নিজের অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করে হিংসা-ঈর্ষা-ক্ষোভ সঞ্চিত করে মনের মধ্যে সুযোগ পেলে যার সদ্ব্যবহার করতে এক মুহূর্তও দ্বিধার অবকাশ থাকে না। সব ধর্মের গণ্ডিতেই এমন মানুষ রয়েছে। কখনও সামাজিক, কখনও রাজনৈতিক আবার কখনও শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতায় তারা ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে ওঠে!

গত কিছুদিনের ঘটনা বিশ্নেষণে এসব মানুষের প্রবল অস্তিত্ব অনুমান করে শঙ্কিত! ঘটনা ঘটেছে এক মণ্ডপে, কিন্তু শিকার হয় অন্যান্য মণ্ডপও। কোথাও কোথাও নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সে আগুনকে আবার উস্কেও দেওয়া হচ্ছে! এক দল বলছে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার কারণে তাদের আবেগ বিস্টেম্ফারিত হয়েছে। অন্য দলের ভাষ্য, সাজানো চক্রান্তের শিকার হয়ে ক্ষোভে-দুঃখে তাদের পুঞ্জীভূত আবেগ ভাষার আশ্রয়ে সান্ত্বনা খুঁজছে। কিন্তু এই আবেগের বাড়াবাড়িতে মানুষ যে যুক্তিহীন, বিচারবুদ্ধিহীন এক নৈরাজ্যের মধ্যে গোটা দেশকেই নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে- তার হদিস রাখার কেউ নেই! গুজব, চটকদার রমরমা মিথ্যে কাহিনি, উস্কানি- এসবেই নেশা ধরে গেছে কিছু মানুষের! তাদের হিসাব খুব সোজা। মিথ্যা দিয়ে যদি একটা রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা যায়; মিথ্যা ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে যদি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া যায়; মিথ্য দিয়ে যদি সত্যকে চ্যালেঞ্জ করা যায় প্রতি পদে; বিশিষ্ট সব নেতা স্মিতহাস্যে মিথ্যা বয়ান করতে থাকেন অনর্গল, তাহলে মিথ্যার চেয়ে শক্তিশালী বিনোদন আর কী হতে পারে! মিথ্যা ভালোবাসার দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে! ধর্ম তো ধর্মের মাহাত্ম্য নিয়ে যথারীতি আপন জায়গাতেই অবিচল; মাঝখান থেকে মিথ্যার বেসাতি করে কিছু মানুষের পকেট ভারি হয়!

সংখ্যালঘু বলে যারা নিজেদের সবসময় খুব অসহায় জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসে, তাদেরও বলিহারি! যে জলে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করতে হবে বলে তাদের জানাই আছে- সে জলে কী করে তারা হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকে? শহরের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ পূজামণ্ডপে সরকারের নির্দেশ সত্ত্বেও কেন একটা সিসিটিভি ক্যামেরাও রাখা হয় না? বিদ্যুৎ সংযোগ সূর্য-চন্দ্রের আলোর মতো স্থির নিশ্চিত কোনো ব্যাপার না। তবু কেন বিকল্প আলোর ব্যবস্থা থাকে না মণ্ডপে? এই দেশে 'হ্যাজাক' বাতির আলোতেও বিশাল সব অনুষ্ঠান হয়েছে এক সময়। এতটি হ্যাজাক জ্বলেছে অনুষ্ঠানস্থলে যে, দিনের আলোর মতো ফকফকা হয়ে গেছে চারপাশ! এখন তো বিকল্প আলোর নানা আধুনিক ব্যবস্থা প্রচলিত। সে রকম ব্যবস্থা কেন রাখা হলো না তবে? নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সব সদাশয় সরকারের ওপর ছেড়ে দিলেই কি নিজের আর কোনো বিশেষ দায়িত্ব থাকে না? রাতভর না হয় এলাকার শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হোক। আরতি প্রতিযোগিতা হোক আগের মতো! দেশের সার্বিক অবস্থা ভেবে, যা কখনও ঘটেনি কিন্তু অসাবধানতায় ঘটে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে, সেসব নিয়ে তো একটু চোখ-কান খোলা জরুরি নয় কি? যে যা-ই বলুক; যত অপদস্থই করুক; নির্যাতন-নিপীড়ন যতই নেমে আসুক; হিন্দুরা বংশানুক্রমিক জন্মসূত্রে এ দেশের নাগরিক- এটাই চূড়ান্ত সত্যি। সুনাগরিক হিসেবে দেশের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে তাকে পা ফেলতে হবে। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নিয়ে ভাবতে হবে। যার যার অবস্থান থেকে শান্তি বজায় রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে! বিজয়া দশমীতে শান্তির জল ছিটানোর বিধান তখনই অর্থবহ মনে হবে যে কোনো ধর্মের আদর্শিক ধর্মীয় ব্যক্তিদের কাছে! নিজেদের প্রমাণ করার মাধ্যমে তাই হবে ধর্মকে মহিমান্ব্বিত করার সঠিক উদ্যোগ।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার- কথাটা সর্বাংশে সত্য। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যে রক্তস্রোত বয়ে গেছে; সেখানে সব ধর্মের মানুষের রক্তধারা মিশে আছে। ধর্মের ভিত্তিতে রক্তকে আলাদাভাবে শনাক্ত করার কোনো পদ্ধতি আজ পর্যন্ত আবিস্কৃত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এমনকি ধর্মভেদে রক্তের বৈশিষ্ট্যে বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো পার্থক্যও নেই। সব ধর্মের মানুষের রক্তের উপাদান একই। কভিডে আক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী জটিলতায় আমাকে রক্ত নিতে হয়েছে দু'বার। প্রতিবারই অন্য ধর্মের রক্ত শরীরে ধারণ করেছি। কই, সমস্যা তো কিছু হয়নি! কথাগুলো বলছি বর্তমান অস্থির সময়ের প্রেক্ষাপটে।

ধর্ম একান্তই ব্যক্তিগত অনুভবের বিষয়। সামগ্রিক আয়োজনে তাকে আনন্দময় করে তুলতে হলেও লক্ষ্য রাখতে হয়- নিজের ধর্মীয় উদযাপন দ্বারা অন্য কারও ধর্মানুভূতিতে যেন আঘাত না লাগে। বিশেষ করে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এই উন্মত্ত সময়ে। একজন সুনাগরিক হিসেবে এটা নিশ্চয় কারও কাছে কাম্য নয়। এ দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সামাজিক ঝুঁঁকির ব্যাপারটা নিশ্চয় নতুন করে ব্যাখ্যা করার কোনো প্রয়োজন নেই! আমরা আর মিথ্যা প্রচারের গড্ডলিকায় গা ভাসিয়ে দেশের সর্বনাশ ডেকে আনতে চাই না। এমন কিছু ক্রমাগত ঘটতেই থাকবে এবং বাইরের পৃথিবীর কাছে আমার দেশের চিরকালীন সাম্প্র্রদায়িক সম্প্র্রীতির ঐতিহ্য ভুল বলে প্রমাণিত হবে- এমন দুর্দিন যেন কখনও দেখতে না হয়। সবাইকে সচেতন হয়ে এই দুর্বৃত্তায়ন প্রতিরোধে সচেষ্ট থাকতে হবে।

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ