কৃষি বাংলাদেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। হাজার বছরের অবহেলিত ও শোষিত এ বাংলার গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এখনও কৃষির কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় খাতও এই কৃষি। ২০১৮ সালের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, এটি মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬ ভাগ জোগান দিয়ে থাকে এবং দেশের জিডিপিতে এর অবদান ১৪.১০ শতাংশ। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তায় এই খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে সর্বদা ভঙ্গুর অর্থনীতি বলে ভৎর্সনা করেছে পশ্চিমা বিশ্ব। কিন্তু আজ বাংলাদেশ কৃষিনির্ভরতার কারণেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং মহামারি করোনায় দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে না পারার অন্যতম কারণ খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন। ১৯৭১ সালের তুলনায় খাদ্য উৎপাদন প্রায় পাঁচগুণ (৪.৭৫) বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে চার কোটি ২১ লাখ টন (অর্থবছর ২০১৮-১৯)। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ খুব সামান্যই চাল আমদানি করেছে। ফেব্রুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত বেসরকারি খাতে মাত্র ০.০৪ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানি করা হয়েছে। জুলাই-ফেব্রুয়ারি ২০২০-২১ সময়ে বাংলাদেশ ধান-চাল রপ্তানি করে ৮৩.৭ লাখ মার্কিন ডলার আয় করে।
বাংলাদেশের জনগণের একটা বিশাল অংশ তাদের জীবনধারণের জন্য কৃষির ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশে ৩-৪ বছর ধরে আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান থাকা এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগের তৎপরতায় কৃষক ভালো বীজ, জমিতে সুষম সারের ব্যবহার বৃদ্ধি ও পরিমিত সেচের কারণে বর্তমানে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদন হচ্ছে। তবে কৃষি গবেষকদের মতে, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এ মুহূর্তে ধানের আবাদ কমানো যাবে না। প্রধান ফসল ধানের আবাদ ঠিক রেখে অন্যান্য ফসলের (গম, ভুট্টা, ডাল, তৈল, সবজি) আবাদ বৃদ্ধি করতে হবে।
করোনা মহামারি সংকটে আমাদের শিল্প খাত, সেবা খাত, তৈরি পোশাক শিল্প খাত, নির্মাণ খাত এবং প্রবাসী আয় হতে আয়ের পরিমাণ হ্রাসের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। কৃষি খাতের বর্ধিত আয়ের মাধ্যমে সেই ঘাটতি কিছুটা হলেও পূরণ হওয়ার একটি সম্ভাবনা জাগ্রত আছে। যেখানে অর্থনীতির অন্যান্য খাত, উপ-খাত জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর ঋণাত্মক প্রভাব ফেলছে, সেখানে কৃষি খাত জিডিপির সহনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনীতি যে শক্তিশালী বুনিয়াদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সেই শক্তিশালী বুনিয়াদের অর্থনীতিকে কৃষি খাতই বরাবরের মতো সচল রাখার গুরুদায়িত্ব পালন করছে। সেই বিবেচনাতে কৃষি খাতই হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা।
অথচ একদিকে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে ফসলি জমিতে বেআইনিভাবে ইট-ভাটা স্থাপন করায় তার কালো ধোঁয়া আশপাশের ফসলি জমি ও গাছপালার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। প্রতি বছর কোথাও না কোথাও ধানে চিটা, ফসলহানিসহ ফলগাছে ফলশূন্য হওয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটছে।
শত প্রতিকূলতা সত্যেও বাংলাদেশের কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মূল দায়িত্ব পালন করছেন আমাদের কৃষকরা। কৃষিবিদরা যথাসম্ভব তাদের সহায়তা করছেন। আর এই কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি কীভাবে নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। যদিও ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণে উপরে বর্ণিত বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এসব পদক্ষেপে শতকরা প্রায় ৮৪ ভাগ ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক কীভাবে লাভবান হবে সেটিই দেখবার বিষয়। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতায় সরকারের নানা পদক্ষেপ দরিদ্র কৃষকের পক্ষে খুব বেশি কাজে আসেনি। সেই বিবেচনায় বাজেট প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণ হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা জানি কৃষিতে নানা সমস্যা আছে, যার সমাধানও রয়েছে। আমরা এখনও কৃষিতে অনেক দেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছি। আমাদের চাল উৎপাদন যথেষ্ট, যা ধরে রাখতে হবে। এখন চাল রপ্তানি হচ্ছে। তাপমাত্রা সহিষুষ্ণ গমের জাত উদ্ভাবনের ফলে গমের আবাদ বৃদ্ধি হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ লাখ টন গমের চাহিদা রয়েছে, উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১১-১২ লাখ টন। যার জন্য খাদ্যশস্য হিসেবে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ টন গম আমদানি করতে হচেছ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ লাখ টন আলু উৎপাদন হচ্ছে। দেশের চাহিদা পূরণ করে স্বল্প পরিসরে বিদেশে আলু রপ্তানি হচ্ছে। এ মুহূর্তে সবজি ও ফলের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে এবং উৎপাদন বাড়াতে হবে। ডাল ও তেল জাতীয় ফসলে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। ভোজ্যতেলের প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি করতে হচ্ছে। অবশ্য বর্তমানে ধানের কুঁড়া থেকে রাইস বার্ন অয়েল উৎপাদনের ফলে সয়াবিন তৈরি আমদানি দিন দিন কমে যাচ্ছে। সরিষার আবাদ বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। নতুন নতুন সরিষার জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ডালের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে ডাল জাতীয় ফসলের উৎপাদন এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ডালের মূল্য ও আমদানির পরিমাণ কমেছে। এ সময়ে চাহিদার ৫০ শতাংশ ডাল দেশে উৎপাদন হচ্ছে। চাষিরা মূল্য পাওয়ায় পেঁয়াজ-রসুনের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে এবং আমদানিও কমেছে। সারা বছরব্যাপী ফল উৎপাদন বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কলা, পেঁপে, থাই পেয়ারা, আপেল কুল চাষ বেড়েছে। আংশিক বৃষ্টি নির্ভর আউশ ও পুরো বৃষ্টি নির্ভর রোপা আমন চাষে সরকার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ব্যবসায়িক ভিত্তিতে কৃষি খামার স্থাপন, খামার যান্ত্রিকীকরণ ও সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিরলস প্রচেষ্টা বর্তমান কৃষিকে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ অবস্থানে নিয়ে যাবে। যেখানে কৃষি, কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষিত হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে আরও গতিশীল করে সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।