ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

মৃত্তিকা সংরক্ষণে সামাজিক আন্দোলন

মৃত্তিকা সংরক্ষণে সামাজিক আন্দোলন

.

মো. রওশন জামাল

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:২০

মাটির যত্নই জীবনের যত্ন, সভ্যতার যত্ন। মাটি বাঁচলে জীবন বাঁচে, সভ্যতা বাঁচে। যেখানে মাটি নেই, সেখানে জীবন নেই, সভ্যতা নেই। জীবনের কোলাহল নেই। মৃত্তিকা স্রষ্টার এক অমূল্য নেয়ামত। বাংলাদেশের উর্বর মাটি আমাদের জন্য এক স্বর্গীয় উপহার। গাঙ্গেয় উপত্যকায় হাজার বছরে গড়ে ওঠা বাংলার পলল জমিন এক অমূল্য সম্পদ, যা বহন করে চলেছে বিজয়, গৌরব ও বিপ্লবের হাজার বছরের ইতিহাস। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, প্রিয় মৃত্তিকার প্রতি আমরা খুব নিষ্ঠুর, অকৃতজ্ঞ, অবিবেচক। 

আজ বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস ২০২৩। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ঘোষিত ‘বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস ২০২৩’-এর প্রধান প্রতিপাদ্য ‘মাটি এবং পানি: যেখানে শুরু জীবনের’। সূর্যের অসীম শক্তি আবদ্ধ করে প্রাণিকুলের খাদ্যশৃঙ্খলের শুরুটা এই মাটি থেকেই। মাটিই আবার তার শিরায় ধরে রাখে মিষ্টি পানি। মাটি-পানির মিথস্ক্রিয়ায় রচিত হয় জীবন ও সভ্যতার মহাকাব্য। অন্যান্য দেশের মতো  বাংলাদেশেও ২০১৫ সাল থেকে এই দিনে আগামীর খাদ্য নিরাপত্তায় দক্ষ মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার কথা আলোচিত হচ্ছে। অধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত স্বল্প আয়তনের বাংলাদেশের জন্য এ দিবসটি অনেক গুরুত্ব বহন করে।

কেউ খোঁজ রাখে না প্রযুক্তি আর উন্নয়নের বাংলাদেশে কেমন আছে প্রিয় মৃত্তিকা। বহুজাতিক কোম্পানির বর্ণিল মোড়কের আড়ালে বাণিজ্যিক পরিকল্পনার ‘স্লো পয়জনিং’-এ প্রতিনিয়ত নীল হয়ে যায় প্রিয় ধরিত্রী। মৃত্তিকার ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট দেখেছেন কখনও? প্রিয় ধরিত্রীর হার্ট, কিডনি কেমন আছে; সুগার লেভেল কেমন, জানতে চেয়েছেন? ধমনিতে কি কোথাও বিপজ্জনক ব্লক আছে? মৃত্তিকার অম্লতা, অণুজীব, লবণাক্ততার কী অবস্থা? মৃত্তিকাতে ভারী ধাতু, কীটনাশক, নিউক্লিয়ার বর্জ্যের মাত্রা কি সহনীয়? মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটের সম্মানিত বিজ্ঞানীরা বাংলার আনাচে-কানাচে ঘুরে মৃত্তিকার নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পরীক্ষা করছেন। মানচিত্রে উপস্থাপিত মৃত্তিকাস্থ জৈব পদার্থ, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ভারী ধাতু, লবণাক্ততা, অম্লতা, ক্ষয় ও অন্যান্য অণুপুষ্টি উপাদানের ক্রমক্ষয়িষ্ণু ও নৈরাশ্যকর চিত্র দেখে আঁতকে ওঠে মন। 

বাংলাদেশে বর্তমানে ফসলি জমি প্রায় ৭ দশমিক ২৯ মিলিয়ন হেক্টর। পৃথিবীর মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১০ শতাংশ জায়গায় ফসল আবাদ হলেও বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ৬০ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার দক্ষতা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। নিবিড় চাষাবাদের হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বে একেবারে প্রথম সারিতে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও নগরায়ণের জন্য মাটির ওপর চাপ বেড়েই চলেছে। আমাদের আবাদি জমি কমে যাচ্ছে অব্যাহতভাবে। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ধুয়া তুলে, সমৃদ্ধ আগামীর কথা বলে তিন ফসলি কৃষিজমি চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছে শিল্পপতির উদরে। ক্রমবর্ধমান বঙ্গসন্তানের অন্ন জোগাতে মাটি আজ ক্লান্ত। 

মাটির ডাক্তার, মাটির সেবিকা, মাটির বান্ধব হলো কৃষক। সবাই যেখানে পীড়ন করে, ধ্বংস করে; কলুষিত করে প্রিয় মৃত্তিকাকে, সেখানে বাংলার কৃষক তার আদর-সোহাগে বাঁচিয়ে তোলে ক্ষয়িষ্ণু মাটিকে। এই মাটিই ওদের মা-জননী। মাটিই ওদের স্বপ্ন-সাধ। ছোট্ট এক টুকরো জমি থেকে অধিক ফসল ফলাতে ওরা ঢেলে দেয় জীবনের নির্যাস, শরীরের নোনাজল, ভক্তি আর ভালোবাসা। অথচ মৃত্তিকার মতো ওরাও অবহেলিত। আগামীর দক্ষ মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হলে ফসলের মাঠে রাখতেই হবে অভিজ্ঞ মৃত্তিকা ব্যবস্থাপক বাংলার কৃষককে। 

ড. মো. রওশন জামাল: কৃষিবিদ ও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী
roushonjamal@yahoo.com 

আরও পড়ুন

×