ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই মিসরীয়রা ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়াবে

গাজা যুদ্ধ

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই মিসরীয়রা ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়াবে

.

আহদাফ সুয়াইফ

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:২২

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কায়রোতে সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিবাদে একজন নারী ছিলেন, যার হাতে ছিল আটটি শিশুর ছবি-সংবলিত একটি পোস্টার। চারটি শিশু ছোট্ট সবুজ প্যাকেটে মোড়ানো; বাকি চারটি শুধু তাদের ন্যাপি তথা ডায়াপার পরিহিত। তারা মৃত; সব শিশুই মৃত। পাশে থাকা নারী তাঁর নিজের প্রিয় শিশুকে শক্ত করে ধরে ছিলেন এবং আমরা দাবি করছিলাম– ‘রাফাহ সীমান্ত খুলে দিন’। আমরা সেখানে ১০০ জনের মতো ছিলাম। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষের মিছিলের তুলনায় ১০০ তো কিছুই নয়। কিন্তু মিসর বলে কথা। সেখানে ২০১৩ সালের নভেম্বরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি ৭ অক্টোবরের পর বিক্ষোভ করা ৫৭ জনকে জেলে ভরা হয়। প্রত্যেকেই গাজার পক্ষে বিক্ষোভ করছিল এবং একই সঙ্গে প্রতিবাদ করার অধিকার দাবি করছিল। তাদের স্লোগান যেন আরও বাড়ছে এবং আপনি বাড়িতে বা রাস্তায় থেকেও তা শুনতে পাচ্ছেন।

ফিলিস্তিন বিষয়ে মিসরের মানুষের আবেগ শক্তিশালী। গাজা থেকে টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামের ভিডিও সেখানে ভাইরাল হয়। এমনকি স্ক্রিনে হয়তো আপনার চোখ ঘোরাফেরা করবে ইসরায়েলি মেরকাভা ট্যাঙ্কের দিকে, যা বিস্ফোরিত হতে চলেছে। অথচ হাস্যোজ্জ্বল শিশুরা ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়েই ‘ভি’ সাইন বা বিজয়ের চিহ্ন দেখাচ্ছে। মিসরে উবার চালকরা ফিলিস্তিনি যাত্রীদের জন্য তাদের মিটার বন্ধ রাখে। অর্থনৈতিক সংকট থাকা সত্ত্বেও সেখানকার মানুষ অনুদান দেওয়ার জন্য উদগ্রীব। কায়রোতে তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবারের আবাসনের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার জবাবে মানুষ এগিয়ে আসে। এসব নাগরিক সংহতিই কেবল ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের মানবিক দিকটি সমাধান করতে পারে। কিন্তু যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এ অবস্থার জন্ম দিয়েছে, তা কেবল রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোই সমাধান করতে পারে।
গত ১৬ বছর ধরে আমরা ইসরায়েলি অপরাধের সহযোগী হিসেবে মিসরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছি। দেড় যুগ ধরে মিসর ইসরায়েলের সহযোগী হিসেবে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং পরিচালনা করেছে। প্রতিবাদী স্লোগানে মানুষ প্রশ্ন করছে– ‘এদিকে মিসর, ওদিকে ফিলিস্তিন, কিন্তু ক্রসিংয়ের চাবি কার হাতে?’ তারা আরও বলছে– ‘মিসর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র, আর এটি হলো গণহত্যার যুদ্ধ!’ তাদের অনুরোধ– ‘আমাদের শাসনকারীরা শবদেহের মতো। আপনারা আমাদের লজ্জায় মরতে বাধ্য করছেন!’ তাদের ভাষায়– ‘বোমাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের। আরবরা বিশ্বাসঘাতক!’

সম্ভবত ১২ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মিসরের মানুষ ও সরকার এ বিষয়ে একমত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে– ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করা যাবে না। গাজায় পর্যাপ্ত সাহায্য প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে এবং ইসরায়েলি বোমা হামলা বন্ধ করতে হবে। এর বাইরেও মানুষের প্রত্যাশা হলো, গাজা অবরোধ সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা এবং রাফাহ ক্রসিং হবে বন্ধুসুলভ ‘সহজ’ সীমান্ত।

রাফাহ সীমান্তটি বড় বেদনামাখা। শহরটি ১৯৭৯ সালের শান্তি চুক্তি অনুসারে ভাগ হয়ে যায় এবং সিনাই পর্বত ইসরায়েল থেকে মিসরকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। রাফাহর পরিবারগুলোকে কাঁটাতারের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন করা হয়। সেখানে সীমানা তৈরির জন্য মাঠ ও বাগান ধ্বংস করা হয়েছিল। সেখানকার মানুষের বেদনা, ‘আমাদের এবং আমাদের পরিবারের মধ্যে একটি ক্রসিং আছে। কিন্তু কেন জায়নবাদীরা আমাদের ক্রসিং নিয়ন্ত্রণ করবে?’   

এখানে ইসরায়েলের যুদ্ধে কেউই বিস্মিত নয়। কিন্তু বিস্ময়ের কারণ হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ কত সহজে এর সহযোগী হয়ে উঠছে এবং হতাহতের সংখ্যা বাড়ার পরও এমনকি শহর ধ্বংসের পরও তারা কীভাবে নির্বাক থাকছে! প্রতিক্রিয়া হিসেবে এখানে ‘বয়কট’ একটা সাধারণ বুলিতে পরিণত হয়েছে। মানুষ এখানে কিছু করতে চায় কিন্তু কেবল বয়কটের পথই সবার জন্য খোলা। সামাজিক মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক গ্রুপ, দোকান ও শপিংমলে মানুষ কেনার জন্য স্থানীয় বিকল্প পণ্য খুঁজছে।

গ্লোবাল সাউথের মানুষ যা ১০০ বছর ধরে জানছে, গ্লোবাল নর্থের মানুষ তা এখন বুঝতে পারছে। তা হলো, জায়নবাদীরা সব ভূমি দখল করতে চায়। সেখানে কোনো ফিলিস্তিনি থাকতে পারবে না এবং সেই ভূমি পাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা থামবে না। মানুষ অনুধাবন করছে, তাদের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারগুলো কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিন দখলে ইসরায়েলকে ক্রমাগত সাহায্য করে যাচ্ছে এবং পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমও এতে মদদ দিচ্ছে। তারা যে পদ্ধতি ও মূল্যবোধ মেনে চলে, এটা কি তা সমর্থন করে?

মানুষ বুঝতে পারছে, ফিলিস্তিনিদের অধিকার সারাবিশ্বের অধিকার থেকে ভিন্ন নয়। মিসরীয় সাংবাদিক ইউনিয়নের কর্মীরা বিশ্ববিবেক জাগানোর জন্য কায়রো থেকে আন্তর্জাতিক কাফেলার ২৩০ মাইল ভ্রমণের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যা শেষ হবে রাফাহ ক্রসিংয়ে। এ কর্মসূচিতে শত শত মানুষ সাড়া দিয়েছে। সেই কাফেলাকে কায়রো ছেড়ে যেতে দেবে কিনা, তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। কারণ ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রতিবাদ করার জন্যও মিসর সরকার তার নাগরিকদের গ্রেপ্তার করছে। যেখানে অন্য দেশের নাগরিকরা এ প্রতিবাদে যোগ দিচ্ছে, সেখানে এ আন্দোলন দমানো কি সহ্য করা যায়? সাংবাদিক ইউনিয়নের একটি প্রতিবাদী ব্যানারে লেখা– ‘বিশ্ববিবেককে দমাবেন না!’

আহদাফ সুয়াইফ: মিসরীয় লেখক; গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×