ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

‘ইসলামোফোবিয়া’র ভুল ও পাশ্চাত্যের নয়া বোঝাপড়া

সম্প্রীতি

‘ইসলামোফোবিয়া’র ভুল ও পাশ্চাত্যের নয়া বোঝাপড়া

.

কাজী জহিরুল ইসলাম 

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:২৩

পৃথিবী একটি বৃহৎ গ্রাম। এই গ্রামের মোট জনসংখ্যা ৮০০ কোটি। ৬০০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধর্মের অনুসারী এবং প্রায় ২০০ কোটি মানুষ মুসলমান। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার দুর্ঘটনার পর পৃথিবীর মানুষের আচরণ বদলে যায়। সবাই সবাইকে সন্দেহ করতে শুরু করে। যেহেতু টুইন টাওয়ার দুর্ঘটনার দায় একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠী মুসলমানদের ওপর চাপানো হয়েছে; সারা পৃথিবীর মানুষ ঘৃণার আঙুল তুলতে শুরু করে মুসলমানদের দিকে। এমনকি মুসলমানরাও রাস্তায় দাড়ি-টুপিওয়ালা মানুষ দেখলে ভয়ে কুঁকড়ে যেতে শুরু করে। বিমানে চড়েছেন, পাশের সিটে দাড়ি-টুপিওয়ালা এক লোক। আপনি সারাক্ষণ আতঙ্কে আছেন– লোকটা প্লেনে বোমা ফাটাবে না তো! এই যে ‘ইসলামোফোবিয়া’ ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে; এর ফলে কট্টরপন্থি মুসলমান কেউ কেউ প্রতিশোধস্পৃহায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আরও বেশি উগ্র আচরণ করতে শুরু করে। পৃথিবীর এখানে-ওখানে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে শুরু করে। নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য কোথাও কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেই তার দায় (ক্রেডিট) তারা নিতে শুরু করে। পৃথিবী অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিক অস্থির হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত, শিক্ষিত, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ যারা, ইউরোপীয় ও আমেরিকানরা বুঝতে শিখল– ঘৃণা দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। অস্থির পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে দরকার ভালোবাসা। তারা মাল্টি রেইস, মাল্টি এথনিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিতে শুরু করে।

২০০০ সালে আমি জাতিসংঘের একজন কর্মী হিসেবে কসোভো যাই। সার্বিয়ার কাছ থেকে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আলাদা হয় আলবেনিয়ান জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত জনপদ কসোভো। এর প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ আলবেনিয়ান হলেও, ১০ শতাংশ সার্বিয়ান তখনও কসোভোতে। ওরা কি এখানেই থাকবে? কসোভোর আলবেনিয়ানরা ওদের সার্বিয়ায় তাড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, যাদের সহযোগিতায় কসোভো যুদ্ধে জয়লাভ করে, বাদ সাধে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বক্তব্য হলো, ওরা এখানেই থাকবে। শুধু ওরাই না; ক্রোয়াট, তার্কিশ, রোমা; সবাই এই ভূখণ্ডে থাকবে। সবাইকে নিয়েই তোমাদের রচনা করতে হবে এক বহুজাতিক মানুষের শান্তিপূর্ণ দেশ। সেই থেকে আমি বহু পরিচয়ের সমাজ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অনুভব করতে শুরু করি। 

আজ ২০২৩ সালে এসে উন্নত দেশের মানুষদের মধ্যে এই বিশ্বাস আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। তারা বুঝতে শিখেছে, ৯/১১-তে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে ঘৃণার বীজ তারা বুনেছিল, সেই বীজ থেকে জন্ম নেওয়া চারাগাছগুলো আজ মহিরুহ ও বিষবৃক্ষ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। ওদের নিঃশ্বাস থেকে নিঃসৃত বিষবাষ্পে পৃথিবীর বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। সময় এসেছে সেসব বিষাক্ত গাছ নিধন করে ভালোবাসার 
বীজ বপনের। সেই কাজটিই এখন উন্নত পৃথিবীর মানুষ শুরু করেছে।

২০২২ সালের ২৯ জুলাই টেক্সাসের কংগ্রেসম্যান আল গ্রিন কংগ্রেস সভায় ইসলামকে পৃথিবীর একটি মহান ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বিল উত্থাপন করেন। এই বিলের সপক্ষে বলা হয়, ইসলামের নীতিগুলো পৃথিবীতে শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় কাজ করে। অথচ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমারা বলে আসছিল, ইসলাম অশান্তি সৃষ্টি করে, জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে। একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করতে করতে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে এসেছে যে, আজ ইসলামোফোবিয়া, মানে ইসলামাতঙ্কের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে ওদেরকেই জেহাদ (কমব্যাট) ঘোষণা করতে হচ্ছে। ওরা বুঝতে পেরেছে, ২০০ কোটি মানুষের মনে আঘাত দিয়ে কিছুতেই পৃথিবীতে সুখ-শান্তিতে বসবাস করা যাবে না।

নিশ্চয় মনে আছে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান জাতিসংঘে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি ‘কমব্যাট ইসলামোফোবিয়া’ শব্দযুগল উচ্চারণ করেন। এই শব্দযুগল আমার ভালো লাগেনি। কিন্তু তাঁর যুক্তি, এই শব্দযুগলের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যটি ভালো লেগেছিল। ইমরান খানের ভাষণের তিন বছর পর ২০২২ সালে জাতিসংঘ ১৫ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক কমব্যাট ইসলামোফোবিয়া’ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। কেন ১৫ মার্চ? কারণ ২০১৯ সালের এই দিনে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্চ এলাকার দুটি মসজিদে ঢুকে ইসলামোফোবিয়ায় আক্রান্ত এক ব্যক্তি গুলি করে জুমার নামাজে প্রার্থনারত ৫১ জনকে হত্যা এবং ৪০ জনকে আহত করে।

এখন থেকে সারা পৃথিবীর মানুষ ১৫ মার্চকে ‘ইসলামাতঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ দিবস হিসেবে পালন করবে। কমব্যাট ইসলামোফোবিয়ার অর্থ এই নয়, যে মানুষ ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলবে তাকে প্রতিহত করো, তাকে শাসাও, তাকে আক্রমণ করো। মূলত আমার ভেতরে যদি ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামাতঙ্ক থাকে, আমি যেন সেই ভীতির বিরুদ্ধে, সেই আতঙ্কের বিরুদ্ধে, ঘৃণার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হই। এটি 
নিজের ভেতরের নেতিবাচক চিন্তার বিরুদ্ধে ইতিবাচক চিন্তার যুদ্ধ। 

এই দিবস তখনই সফল হবে যখন জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো এর তাৎপর্য তুলে ধরে তাদের নাগরিকদের সচেতন করবে। তাদের দেশের/ভাষার বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখকরা বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি করবেন। মানবাধিকারকর্মীরা এ বিষয়ে সোচ্চার হবেন। সরকারগুলো ইসলামোফোবিয়া বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় আইন করবে। যেমন আমেরিকা কংগ্রেসে বিল 
উত্থাপন করেছে ইসলামকে একটি মহান ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করার। 
    
কাজী জহিরুল ইসলাম: কবি ও জাতিসংঘের কর্মী 
mibabla71@gmail.com
 

আরও পড়ুন

×