ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

নিয়ম রক্ষার নির্বাচন অর্থনৈতিক সংকটকে জটিল করবে?

নির্বাচন

নিয়ম রক্ষার নির্বাচন অর্থনৈতিক সংকটকে জটিল করবে?

মঞ্জুরে খোদা

মঞ্জুরে খোদা

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:২৭ | আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১৫:৩৫

সরকারের সদিচ্ছা থাকলে যে কোনো ধরনের একটা বোঝাপড়ায় বিএনপিকে নির্বাচনে আনা সম্ভব হতো। কিন্তু তাদের সেই আন্তরিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। তাদের ছক মেনে বিএনপি নির্বাচনে না আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল ও সংঘাতময় হয়ে উঠেছে। বিরোধীদের সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়ে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনের দিকে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। দেশকে দীর্ঘ মেয়াদে অস্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে সরকার এর দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারবে না।

একটি রাজনৈতিক দলের অনেক দোষত্রুটি থাকতে পারে। এমনকি গুরুতর কোনো অভিযোগও থাকতে পারে। কিন্তু সেই রাজনৈতিক দল যদি নিষিদ্ধ না হয় এবং দেশে তাদের অবস্থান থাকে, তাহলে তাদের বক্তব্য শোনা ও বিবেচনা করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারের দায়িত্ব জনস্বার্থে কাজ করা; একই সঙ্গে বিরোধীদের যৌক্তিক দাবি আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণ ও একটি বোঝাপড়ায় আসা। এগুলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাধারণ চিত্র ও চর্চা। আমাদের দেশে সে অবস্থা কখনও ছিল না; নেই। আন্দোলন-সংগ্রাম ছাড়া এ দেশের মানুষ কোনো কিছুই অর্জন করেনি। বর্তমান শাসক দলও এই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু তারা তাদের অতীত ভুলে গেছে। ক্ষমতার মোহে বেপরোয়া হয়ে বিপদের দিকে হাঁটছে। কথাগুলো মোটেই নতুন কিছু নয়। ইতিহাসে এর অনেক উদাহরণ আছে। সেই শিক্ষা নেওয়া ও উপলব্ধি করার প্রয়োজনীয়তা এখানেই। 

নির্বাচন হয়তো হবে, তবে জাতিকে অনেক মূল্য দিতে হবে। কোনো অপরাধ না করে জাতি কেন দুর্ভোগ ও ক্ষতির শিকার হবে? এই ক্ষতি ক্ষুদ্র ও স্বল্পকালীন নয়। বলা যায়, বিশাল ও দীর্ঘমেয়াদি। কীভাবে, কতটা ক্ষতি হতে পারে, তার কিছুটা ধারণা নেওয়া যাক।

দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এমনিতেই নাজুক। যুদ্ধ ও বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি একে আরও জটিল করে তুলেছে। দ্রব্যমূল্য দিন দিন বাড়ছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্যাংকগুলো সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ প্রধানত তিন ধরনের সংকটের সম্মুখীন হবে– ১) আর্থিক ও ব্যবস্যা-বাণিজ্যের সংকট; ২) হরতাল-অবরোধ আন্দোলনে মানবিক ক্ষতি; ৩) রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিতিশীলতা। যে অর্থ ব্যয়ে এই সংসদ, সরকার হবে; চলমান আর্থিক সংকটের জন্য হবে সেটা বাড়তি চাপ। সে সংকট আসন্ন সরকার তা পুষিয়ে উঠবে কীভাবে, কোন জাদুবলে?

এবারের নির্বাচনে সরকারি খরচ ধরা হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। প্রার্থীদের নির্বাচনকেন্দ্রিক খরচ হবে এর বহুগুণ। নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের খরচ সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার মাত্রা বেঁধে দিলেও খরচ হবে এর অনেক বেশি। এর পরিমাণ নির্ভর করছে কতজন প্রার্থী হচ্ছেন ও কী ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে, তার ওপর। ২০১৮ সালে টিআইবি ১০৪ জন প্রার্থীর মধ্যে এক সমীক্ষাতে দেখিয়েছে, একেকজন প্রার্থী গড়ে ৭৪ লাখ ৯৫ হাজার ৩৮৮ টাকা ব্যয় করেছেন। সারাদেশে প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৮৪৮ জন। গড়ে এই খরচ হলে নির্বাচনের প্রার্থীরা ভোটের জন্য খরচ করেন প্রায় ১ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। এই হিসাব ২০১৮ সালের। ২০২৪ সালে এই খরচ বেড়ে হবে অনেক গুণ। সেই অঙ্ক হতে পারে ৫ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা।

নির্বাচন এখন জনস্বার্থ ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিষয় নয়। এটি এখন এক বিনিয়োগ। স্বাভাবিকভাবেই প্রার্থীরা তাদের বিনিয়োগের বহুগুণ অর্থ তুলে আনবেন। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পণ্যের দাম বাড়িয়ে, মজুত করে, সংকট সৃষ্টি করে মুনাফা করবেন। আমলা, রাজনীতিকরা নানা প্রকল্প-প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি-লুটপাটের মাধ্যমে সে আয় করবেন। তাদের সেই বাড়তি আয়ের প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।

নির্বাচন বর্জনকারীদের অবরোধ-হরতালের কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদনের ক্ষতি হবে। সে কারণে দ্রব্যমূল্য আরেক দফা বৃদ্ধি পাবে। সে অর্থ জনগণের পকেট থেকেই যাবে। বিডিনিউজের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, বিএনপির ডাকা পাঁচ দিনের অবরোধে তাদের অন্তত ৩২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই হরতাল-অবরোধ আরও ‘কত ৫ দিন’ হবে, সে কথা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিই বলবে। মাসে ১৫ দিন এমন অবরোধ হলে তাতে ক্ষতি হবে ৯৬ হাজার কোটি টাকা। পাঁচ দিনের অবরোধে ২৫ কোটি টাকার শুধু পরিবহন সম্পদেরই ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি হবে দেশের অর্থনীতির। তা কি দেশের উন্নয়নের জন্য সহায়ক?

এমনিতেই যুদ্ধ ও সংঘাতময় বিশ্ব রাজনীতির কারণে দেশের আর্থিক খাত চাপের মধ্যে আছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন প্রবাহ কমতির দিকে। এ রকম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সরকার কোন উৎস থেকে উন্নয়ন তহবিল সংগ্রহ করবে? সর্বশেষ তথ্য বলছে, অক্টোবর মাসে ১২৪ কোটি ডলার আয় কমেছে। সে হিসাবে দেশের রপ্তানি কমেছে ১৪ শতাংশ। দেশের এই সংকট ঘনীভূত হলে বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে চলে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে অর্থনীতি আরও চাপের মধ্যে পড়বে। পশ্চিমা দেশগুলো এ নির্বাচনকে প্রথম থেকেই সন্দেহের চোখে দেখছে; বিরোধিতা করছে। তারাও এ সংঘাতময় পরিস্থিতির সুযোগ নেবে।

বিতর্কিত এ নির্বাচনের কারণে ইউরোপ-আমেরিকায় বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেটা হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়বে। বাংলাদেশ এমনিতেই ডলার সংকট ও বৈদেশিক ঋণের চাপের মধ্যে আছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন থেকে নেমে ১৭ বিলিয়ন ডলারে চলে এসেছে। এমন অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার আসলে কী অর্জন করতে চায়? সে অবস্থা কি চলমান সংকটকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক করবে না?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট ও নির্বাচন ঘিরে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে, যা ক্ষমতাসীনদের প্রতি তাদের বৈরী মনোভাবেরই প্রকাশ। ইউরোপ-আমেরিকা হচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার। ভূরাজনৈতিক সমীকরণে চীন-ভারত ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে থাকলেও তারা আমাদের পণ্যের ক্রেতা নয়, বরং বাংলাদেশ হচ্ছে তাদের পণ্যের বাজার। উপরন্তু চীন-ভারতের থাকবে বাংলাদেশে তাদের স্বার্থ সুবিধার তীক্ষ্ণ নজর। পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের ওপর থাকবে পশ্চিমাদের চাপ। সুতরাং নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিই বলে দেবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থা কেমন হবে?
সর্বোপরি নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, দমনপীড়নের মাধ্যমে যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাদের যে ভাবমূর্তি তৈরি হবে, তা কি তাদের জন্য স্বস্তিকর হবে? ক্ষমতাসীনরা তাদের শাসনামলে ব্যাপক উন্নয়নের কথা বলেন। তা করতে গিয়ে যে বিপুল ঋণের বোঝা তৈরি করেছে, সেটাও মনে রাখতে হবে। সর্বশেষ তথ্য বলছে, এই ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা। এর ৭০ ভাগ নেওয়া হয়েছে গত ১০ বছরে। এই ঋণ পরিশোধ করতে যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার; এ নির্বাচন স্পষ্টত তার বিপরীত অবস্থা তৈরি করবে। তাহলে এ নির্বাচন কি শুধু যে কোনোভাবে ক্ষমতায় থাকা ও নিয়ম রক্ষার অনুষ্ঠান, কৌশল? 
শিক্ষার স্তর-মান নির্ধারণ করতে ছাত্রদের যেমন সারাবছর লেখাপড়া করার পর পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়; নির্বাচনও রাজনীতিকদের জন্য তাদের কর্মফল নির্ধারণের মাধ্যম। সরকার যে উন্নয়ন ও সুশাসনের কথা বলে; তাহলে তাদের তো যে কোনো ব্যবস্থায় এবং অবস্থায় সে পরীক্ষায় অংশ নিতে আপত্তি থাকার কথা নয়। অসদুপায় অবলম্বনের অভিসন্ধি না থাকলে পরীক্ষক, পরিদর্শক যে-ই হোক, শঙ্কিত হওয়ার কথা নয়। সেই সৎসাহস না থাকাই একটি বড় ‘কিন্তু’। গত নির্বাচন যেভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং যেভাবে সরকারি দল ক্ষমতায় এসেছে, সেভাবে আবার বিজয়ী হওয়া পরাজয়ের অধিক লজ্জার ও অগৌরবের। তার সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষতি-সংকটের প্রশ্ন তো আছেই।   

ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; সমন্বয়ক ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিস
 

আরও পড়ুন

×