সে কহে বিস্তর মিছা যে কহে বিস্তর', রায়গুণাকরের (ভারতচন্দ্র) কবিতার পঙ্‌ক্তি, বাংলায় প্রবাদ, প্রায় তিনশ বছর। যুগে যুগে প্রচলিত, প্রমাণিত। আজকের বাংলাদেশেও। প্রতি মুহূর্তে। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আরও।
ক্ষমতাধারী হলে, মন্ত্রী হলে বিস্তর মিছা কথা কওয়াই যেন দুস্তর। সংবিধান ছুঁয়ে শপথবাক্য পাঠে এ রকম কিছু আছে কিনা, অজানা। কয়েকজন মন্ত্রী আছেন, বাকবাকুম পায়রা। পাখা (আঙুল, হাত) ঝাড়েন মিডিয়ায়, দেখা ও শোনা রীতিমতন বিরক্তিকর।
এত কথা কহেন, ভুলেও যান, কী করিয়াছেন আগে। কথা কইবার মুখ আছে, চুপ থাকবেন কেন? প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে কইতে হবে। না কহিলে গদি দোলদোলদুলুনি।
মন্ত্রী, রাজনীতিকের সবসময় আবোলতাবোল বকাবকি লোকের অপছন্দ, মৌন অবলম্বন কখন দরকার জ্যোতি বসু একবার একজন মন্ত্রীকে ধমকের সুরে বলেছিলেন, অশোক মিত্রের লেখায় উল্লেখিত।
আমরা জানি, মাথা আগে পচে, তারপর আস্ত শরীর। মাথা থেকে নয়, শরীর থেকেই গন্ধ ছোটে হাওয়ায়। মাথার পচনের মূলে শরীর দায়ী। ভেতরে ভেতরে পোকার আস্তানা, খলবলানি।
অন্নদাশঙ্কর রায় একটি প্রবন্ধে জানিয়েছেন, 'না-জেনে কিছু বলি না। না-পড়ে কিছু ভাবি না। না-ভেবে কিছু লিখি না।' অর্থাৎ, জেনে, ভেবে, চিন্তা পোক্ত করে বলতে হবে। বলাই শ্রেয়। ভাবুকের। রাজনীতিকের, বেফাঁস কথা আদতে অশিক্ষার। জ্ঞানগম্যি কম। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণ শান্তিপ্রিয়। ধর্মে সহিষুষ্ণ। কিন্তু অ-সাধারণ কিছু গোষ্ঠী, ধর্মীয় উন্মাদনায়, ধর্মকে পুঁজি-ব্যবসায় একচ্ছত্র, লাভবান জেনে যে কাণ্ড ঘটিয়েছে অষ্টমী পুজো থেকে অকল্পনীয়। দাঙ্গার সমস্ত আয়োজন গুছিয়েই পথে নেমেছে। সফলও অনেকটা। অস্বীকার করলে, যে করবে, অসৎ। ধর্মে অসৎ। মানবিকতায় অসৎ। সাম্যে অসৎ। ধর্মীয় অসহিষুষ্ণতায় অসৎ। দেশপ্রেমে অসৎ। এবং সর্বোপরি নিজেও অসৎ। অসততায় দেশ চক্রাকার। অস্বীকার করবেন?
রাষ্ট্রধর্ম একটি কেন? বাংলাদেশে আর কোনো ধর্ম নেই। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান লুপ্ত? রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম যুক্ত করে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টানকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করা হয়নি? হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে। যত রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় প্রতাপশালী, একজোট হয়ে সংবিধান কেটেকুটে সংবিধান সাম্প্রদায়িককরণ করেছে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান মুসলিমকে বিচ্ছিন্ন করে সাম্প্রদায়িক বিভাজন, সম্প্র্রীতির বারোটা বাজিয়েছে। ঘৃণা ছড়িয়েছে।
ছড়ানোর অন্যতম কারণ, বাংলাদেশেরই দু'জন গবেষক গবেষণা সন্দর্ভে প্রমাণিত করেছেন হাজার-হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা বিকাশ।
বাংলাদেশের একজন নামি ডাক্তার ফেসবুকে লিখেছেন, 'মন্দির-গির্জায় ঘণ্টা বাজলে অসহিষ্ণু মুসলমান তেড়েফুঁড়ে চিৎকার করে। কিন্তু রাতভর মাইকে ওয়াজ মাহফিল, কান ঝালাপালা, রাতের ঘুম হারাম এই নিয়ে কিছু বললে বিধর্মী? হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান বললে ইসলামের অবমাননা, আঘাত? এই কি সেক্যুলার দেশ? কোথায় সেক্যুলারিজম? সরকার চুপ কেন? সরকার এতটাই আস্কারা দিয়েছে, কোন মুখে বলবে বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ?'
-ফেসবুকের এই পোস্ট সরকারই সরিয়েছে। জেনেছি।
বার্লিনে অষ্টমীর বিকেলে বার্লিনের পুজো সংগঠন একটি শোভাযাত্রার আয়োজন করে, পুলিশের অনুমতি নিয়ে। গোল বাধে, যে পথ দিয়ে যাবে, ওই পথে গির্জা। বৈকালিক প্রার্থনা। সংগঠনের কয়েকজন গির্জায় গিয়ে যাজকের সঙ্গে কথা বলে। যাজকের অজানা পুজো, দুর্গা কী। জেনে : 'নিশ্চয় যাবে। একটি শর্ত। তোমাদের গডেসকে (দেবী) গির্জার ভেতরে নিয়ে এসো। আমরা দেখব, সবাই মিলে সেলিব্রেট করব।' একেই বলে ধর্মীয় সহিষুষ্ণতা। ধর্মীয় মানবপ্রেম। ইউরোপসহ উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকায় রাষ্ট্রধর্ম যিশুবাদ নয়। গণতন্ত্র। ধর্মনিরপেক্ষতা। সংবিধানে নেই ধর্ম। রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকতে পারে না। কার্ল মার্কস সেই কবেই বলেছেন।
এক মন্ত্রী কহেন, 'বাংলাদেশে যে সম্প্র্রীতি আছে, তা পৃথিবীর কোনো জায়গায় নেই।' তাই? পৃথিবীর কয়টি দেশ ঘুরেছেন? কয়টি দেশের সংবিধান জানেন? কয়টি দেশের মানুষের সঙ্গে দহরম মহরম? নাড়ি টিপেছেন? কবি ভারতচন্দ্রের কথাই ঠিক নয় তবে?
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংসদ মাহবুবউল-আলম হানিফ মুখ ফসকে সত্যি কথা বলছেন, 'শিক্ষাব্যবস্থার কারণে ধর্মপ্রাণের চেয়ে ধর্মান্ধ মানুষ বেশি।' গোলায় গলদ কী, ব্যাখ্যা করেননি। সাহস নেই।
'সেক্যুলার দেশে' ধর্মের নামে 'ছায়া ঘনাইছে বনে বনে/গগনে ডাকে দেয়া।' বর্ষণ ঘোরতর। ভেসে যাবে দেশকুল। বাংলাদেশের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান বলতেই পারেন এখন : 'না বাঁচাবে আমায় যদি মারবে কেন তবে?/ কিসের তরে এই আয়োজন এমন কলরবে?'
মন্ত্রী-রাজনীতিক নেতা ঝেড়ে কাশুন। সময় বহিয়া যায়।

কবি