হাসান হাফিজুর রহমান ২১-এর প্রথম স্মৃতিবার্ষিকীতেই 'একুশের সংকলন' করেছিলেন তাঁর সেকালের সাথী মুহম্মদ সুলতানের সঙ্গে। একুশের স্মৃতির একটি অতুলনীয়, সাহসী এবং মহৎ আকর গ্রন্থ এটি। হাসানের আর এক অমর কীর্তি 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ :দলিলপত্র' নামে ১৫ খণ্ডের দলিল ভান্ডার বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করার কীর্তি। হাসান নিজের জীবনপণ করে সংগৃহীত তথ্য থেকে নির্বাচিত তথ্যের এই সংকলন গ্রন্থ তৈরি করেছিলেন। যথার্থই এ ব্রত পালন করতে গিয়েই অসুস্থ শরীরের কর্মী হাসান হাফিজুর রহমান জীবন দান করেছেন এবং এদিক থেকে হাসান কেবল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম বিপ্লবী, সংগ্রামী ও সাহসী পথিকৃৎকবি ও সংগঠক নন, হাসান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ শহীদের মধ্যে আর এক শহীদ। দলিলপত্রের ১ম খণ্ডে ১৯৪৭ থেকে '৫৮ সাল পর্যন্ত বিস্তারিত পর্বের নানা ঐতিহাসিক দলিল, ভাষণ, বিবৃতি, বিতর্ক প্রভৃতির সংকলন করা হয়েছে। এরই মধ্যে আংশিকভাবে হলেও উদ্ধৃত হয়েছে ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালে করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে গণপরিষদের আলোচনা তথা পরিষদের কার্যবিবরণীর ভাষা নিয়ে অনুষ্ঠিত বিতর্ক।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিরও চার বছর আগের কথা। পাকিস্তান গণপরিষদে বক্তৃতা দান এবং কার্যবিবরণীর ক্ষেত্রে লেখা ছিল :'কেবলমাত্র উর্দু অথবা ইংরেজিতেই কোন সদস্য ভাষণ দিতে পারবেন এবং পরিষদের কার্যবিবরণী উর্দু অথবা ইংরেজিতেই পরিচালিত হবে।' পূর্ববঙ্গ তথা সেকালের পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাঙালি নামে নির্বাচিত কোনো 'মুসলমান সদস্য' এই ধারার পরিবর্তনের সামান্যমাত্র উদ্যোগ যেখানে সেদিন নেননি, সেখানে পূর্ববঙ্গ থেকে নির্বাচিত প্রধান সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং তার সাথীরা প্রেমহরি বর্মণ, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সেদিন মুসলিম লীগের নেতাদের তীব্র আক্রমণের মুখে অমিত সাহস ও দূরদৃষ্টি নিয়ে বাংলা ভাষার দাবিকে তুলে ধরেছিলেন।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উদ্যোগ নিয়ে গণপরিষদে কার্যবিবরণীর ভাষার ক্ষেত্রে সংশোধন এনে বলেছিলেন :'কার্যবিবরণী উর্দু অথবা ইংরেজি অথবা বাংলাতে পরিচালিত হোক।' অত্যন্ত নিরীহ এবং যুক্তিপূর্ণ একটি প্রস্তাব। উর্দুকে নাকচ করা নয়। উর্দুর সঙ্গে রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাকে স্থান দেওয়ার দাবি মাত্র।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তার বক্তৃতায় গণপরিষদের সভাপতিকে সম্বোধন করে (ইংরেজিতে) বলেছিলেন :"মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমার এই প্রস্তাব আমি কোন সংকীর্ণ প্রাদেশিকতার মনোভাব থেকে পেশ করিনি। পূর্ববঙ্গ হিসেবে বাংলাকে যদি একটি প্রাদেশিক ভাষা বলা হয়, তবু এ কথা সত্য যে, আমাদের রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা। ৬ কোটি ৯০ লক্ষ যদি সমগ্র পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিবাসীর সংখ্যা হয়, তাহলে তার মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। সভাপতি মহোদয়, আপনিই বলুন, একটা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার নীতি কি হওয়া সংগত? একটা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হবে সেই রাষ্ট্রের অধিবাসীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে ভাষা বলে সেই ভাষা। আর সে কারণেই আমি মনে করি, আমাদের রাষ্ট্রের 'লিংগুয়া ফ্রাংকা' বা প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে বাংলা।
প্রিয় সভাপতি, আমি জানি এই কথা বলে আমি আমাদের রাষ্ট্রের বিপুল সংখ্যক মানুষের আকুতিকেই প্রকাশ করছি। এই পরিষদকে আমি কোটি কোটি মানুষের সেই আকুতির কথা অবগত করাবার জন্যই আজ এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছি। কী অবস্থায় পূর্ববঙ্গের মানুষ আজ বাস করছে? ধরুন একজন সাধারণ মানুষের কথা, একজন কৃষকের কথা। সে যদি ডাকঘরে যায় এবং শহরে পাঠরত তার পুত্রকে ডাকযোগে কিছু টাকা পাঠাতে চায়, তবে 'মানি অর্ডার ফর্মের ভাষা' সে বুঝতে অক্ষম হবে। কারণ মানি অর্ডার ফর্মের ভাষা হচ্ছে উর্দু এবং ইংরেজি। একজন গরিব কৃষক যদি একখণ্ড জমি বিক্রির জন্য স্ট্যাম্প কিনতে যায়, তবে বিক্রীত স্ট্যাম্পের ভাষা সে বুঝবে না। স্ট্যাম্পের গায়ে কেবল উর্দু এবং ইংরেজিতেই স্ট্যাম্পের মূল্যের কথা মুদ্রিত আছে। গরিব কৃষক বুঝবে না কত টাকার স্ট্যাম্প সে কত টাকা দিয়ে ক্রয় করতে বাধ্য হলো। আমাদের রাষ্ট্রের, পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষের এই হচ্ছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। অথচ যে কোন রাষ্ট্রের ভাষা হতে হবে এমন যে, সাধারণ মানুষ সে ভাষাকে বুঝতে পারে। অথচ রাষ্ট্রের ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ তার এই গণপরিষদ তথা পার্লামেন্টের কার্যবিবরণী অনুধাবন করতে সক্ষম হবে না। কারণ এই সংসদের কার্যবিবরণীর ভাষা সে জ্ঞাত নয়। আমি তো বুঝিনি উর্দুর সঙ্গে ইংরেজি যদি ভাষার প্রশ্নে কার্যবিবরণী পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্মানের সঙ্গে ব্যবহূত হতে পারে, তবে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষের ভাষা বাংলা কেন ব্যবহূত হতে পারবে না?"
এমন নিরীহ অকাট্য প্রশ্ন এবং যুক্তির জবাবদানের ক্ষমতা সেদিনের পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ছিল না। তাই প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবের জবাবে আক্রমণের ভাষায় বলতে পেরেছিলেন :"মাননীয় সদস্য, পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ভুল ধারণা, 'মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং' সৃষ্টির অবাঞ্ছিত উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলার প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।"
পাকিস্তানকে মুসলিম রাষ্ট্র বলে আখ্যাদানকারী মুখ লিয়াকত আলী অচিরে কেবল যে তারই 'স্বধর্মী' ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হয়েছিলেন তাই নয়, লিয়াকত আলীর এমন আক্রমণাত্মক জবাব আজ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। লিয়াকত আলী আজ বিস্মৃত। স্মরণীয়, বরণীয় আজ সেদিনের সেই প্রতিকূল পরিবেশে যথার্থই অসহায় তথাপি সাহসী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং তার সঙ্গীরা।
এই বিতর্কের শেষে যখন 'উর্দু এবং ইংরেজির সঙ্গে বাংলার' প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া হয়েছিল তখন তমিজউদ্দীন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের সেই সভায় পূর্ববঙ্গের মুসলিম লীগ সদস্যদের বিরোধিতার কারণে নাকচ হয়ে গিয়েছিল ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উত্থাপিত সে প্রস্তাব।
কিন্তু পূর্ববঙ্গের সচেতন রাজনৈতিক নেতা ও সমাজসেবী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং তার সাথীরা ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে অমর হয়ে থাকার দাবিদার। অথচ আমরা ইতিহাসের এই অনুপ্রেরণাদায়ক ঘটনাকে বিস্মৃতির অন্ধকার গহ্বরে নিক্ষেপ করে ইতিহাস সৃষ্টির মূর্খ চেষ্টায় নিবদ্ধ রয়েছি।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সেদিন থেকেই পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ও সামন্তবাদী জান্তার নির্মম আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এবং সে কারণেই ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর হামলার শিকারে পরিণত হয়েছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জীবনী বিস্তারিতভাবে আমাদের জানা আবশ্যক। নতুন প্রজন্মকে জানানো আবশ্যক। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের রাষ্ট্র বাংলাদেশ। সাম্প্রদায়িকতার হীনমন্য এবং মধ্যযুগীয় শৃঙ্খল ভাঙার জন্যই স্বাধীনতার যুদ্ধ এবং মুক্তির সংগ্রাম '৪৭ সাল থেকে শুরু হয়ে '৭১ সালে চরম পরিণতি লাভ করেছিল।
একটি বিশ্বকোষ অন্বেষণ করে দেখলাম, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সংক্ষিপ্ত জীবনীতে লেখা রয়েছে :"ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। জন্ম রামাইল, ত্রিপুরা, ১৮৮৬। আইনজীবী, রাজনীতিবিদ। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বিএ পাস। অতঃপর আইন পাস করে কুমিল্লায় আইন ব্যবসার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু। ১৯২১-এ কংগ্রেসের আন্দোলনে যোগদান। ১৯৩০-এ আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য গ্রেপ্তার। ১৯৩৭-এ কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত। ১৯৪২-এ 'ভারত ছাড়' আন্দোলনে পুনরায় গ্রেপ্তার। ১৯৪৭-এ দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য। ১৯৪৮-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের অধিবেশন শুরু হলে পরিষদ পরিচালনার নিয়মকানুনে বলা হয়েছিল, গণপরিষদের আলোচনায় ইংরেজি বা উর্দু ছাড়া অন্য কোনো ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রথম ব্যক্তি যিনি ভাষা প্রশ্নে সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করেন এবং বাংলা ভাষাকে সমান মর্যাদাদানের দাবি জানান। ১৯৫৪-তে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত। আবু হোসেন সরকার ও পরে আতাউর রহমান খানের মন্ত্রিসভার সদস্য। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত।" [চরিতাভিধান ও বাংলা একাডেমি।]।
সংক্ষিপ্ত এ কাহিনি যথার্থ। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জীবন কাহিনি বর্তমানের সংগ্রামী তরুণ প্রজন্মের জন্য অপার অনুপ্রেরণা ও তাৎপর্যময় এক জীবনের কাহিনি। তরুণরা এগিয়ে আসুন এমন জীবনের কাহিনি গবেষণা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে উদ্ধার করে বাংলাদেশের বেদিমূলে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়ে।
আহা! কী মর্মান্তিক মৃত্যু বাংলাদেশের ভাষার এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ৮৫ বছর বয়সে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে '৭১ সালের ২৯ মার্চ তারিখে তিনি বন্দি হন। অসমর্থিত সূত্রে জানা যায়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে শহীদ হন ১৪ এপ্রিল ১৯৭১।
দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ; ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারকগ্রন্থ (১৯৯৮) থেকে ঈষৎ সংক্ষেপে পুর্নমুদ্রিত