চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় শনিবার প্রতিপক্ষের আঘাতে যেভাবে এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের একজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন, তা মর্মান্তিক। সহপাঠীরা হামলা চালিয়ে ওই শিক্ষার্থীর মাথার খুলি এমনভাবে থেঁতলে দিয়েছে, যেখানে চিকিৎসক লিখতে বাধ্য হয়েছেন- 'হাড় নেই, চাপ দিবেন না।' রোববার সমকালের প্রথম পাতায় প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনটির শিরোনামেও চিকিৎসকের এ হৃদয়বিদারক আকুতি স্থান পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরতে থাকা ছবিটি আমাদের ছাত্র রাজনীতির আত্মঘাতী প্রবণতার প্রতীক হয়ে উঠেছে যেন। বস্তুত চিকিৎসকের এ 'নোট' দেশের চলমান ছাত্র রাজনীতির সংকটই স্পষ্ট করে তুলেছে।

আমাদের মনে আছে, দুই বছর আগে দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের পীঠস্থান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় তথা বুয়েটেও সহপাঠীদের নির্মম নৃশংসতায় প্রাণ হারান আবরার ফাহাদ। ওই ঘটনায়ও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতারা। স্বস্তির বিষয়, চিকিৎসকের তথ্য অনুযায়ী আহত শিক্ষার্থী আকিবের শারীরিক অবস্থা উন্নতির পথে। তবে চোখ খুললেও কিংবা তরল খাবার খেলেও তিনি এখনও পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নন। প্রশ্ন হলো, আকিব কী এমন অপরাধ করেছেন যে মেডিকেলের সাদা অ্যাপ্রোন পরা সাত-আট সহপাঠী 'শত্রু' জ্ঞান করে তার ওপর হামলে পড়ল? কতটা জিঘাংসু হলে কেউ এমন নির্মমভাবে কাউকে আঘাত করতে পারে। যাদের চিকিৎসক হয়ে প্রাণ বাঁচানোর কথা, তারাই এমন প্রাণঘাতী হয়ে উঠল কেন? মন্দের ভালো, আকিবের পরিণতি বুয়েটের আবরার ফাহাদের মতো হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হত্যার রাজনীতি অনেক আগেই চালু হয়েছে।

উচ্চশিক্ষা নিতে এসে অনেক শিক্ষার্থী মায়ের কোলে ফিরে গেছেন লাশ হয়ে। যে দল যখন ক্ষমতায় থাকছে, সে দলের ছাত্ররা মানুষ গড়ার আঙিনায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে যখন প্রতিপক্ষ নেই, তখন নিজেদের মধ্যেই ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব হচ্ছে এবং নিজ দলের কর্মীদের প্রতিপক্ষ জ্ঞান করে হামলা করতেও দ্বিধা করছে না! মেডিকেল কলেজসহ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আবাসিকের হল কিংবা হোস্টেলের কর্তৃত্ব কর্তৃপক্ষের হাতে না থেকে ছাত্রনেতারা নিয়ন্ত্রণ করছেন বলেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে যেমন জিম্মি, তেমনি তার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নিজেরা সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে। আমাদের অজানা নয়, একজন শিক্ষার্থী কত স্বপ্ন নিয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।

মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার ব্রত থাকে অনেকেরই। সন্তানকে ঘিরে মা-বাবা-পরিবারেরও অনেক স্বপ্ন থাকে। মেডিকেল কলেজের পাঠ শেষ করে যে চিকিৎসকরা মানুষকে সেবা দিয়ে ভালো করার প্রচেষ্টা চালান, সেই মেডিকেল কলেজই যদি তথাকথিত ছাত্র রাজনীতির কারণে অসুস্থ হয়, তার চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘ দেড় বছর পর মেডিকেল কলেজসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে দুই মাসও হয়নি। সর্বত্র পূর্ণোদ্যমে এখনও শিক্ষা কার্যক্রমও শুরু হয়নি।

এর মধ্যেই আধিপত্য বিস্তারের 'লড়াই' শুরু হয়ে গেছে! সহযোগী দৈনিকের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দু'পক্ষের বিরোধের মূলে রয়েছে হাসপাতাল এলাকায় ওষুধের দোকানে চাঁদাবাজি। তাছাড়া হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের দালাল ও অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দ্বন্দ্ব রয়েছে দুই গ্রুপের মধ্যে। সেখানে ক্যাম্পাস ও ছাত্রাবাসে আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় দু'পক্ষ এর আগেও এভাবে সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। মনে রাখা দরকার, এভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার কারণে শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নানাভাবে। কখনও শিক্ষার্থীর রক্ত ঝরছে, কখনও বন্ধ হচ্ছে শিক্ষার সুযোগ। আমরা মনে করি, ছাত্র রাজনীতির এ ধারা চলতে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে তাই রাজনীতিবিদদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আকিবের ওপর হামলাকারীদের অতিদ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।