মানুষ যখন থেকে কয়লা পোড়ানো এবং তেল-গ্যাস ব্যবহার শুরু করে, সেই সময়ের তুলনায় পৃথিবীর তাপমাত্রা এখন ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। এর ফলে দ্রুত বদলে যাচ্ছে আবহাওয়ার চেনাজানা রূপ। মানুষ যেভাবে বন উজাড় করছে; পাহাড় কেটে ফেলছে; খাল, পুকুর ভরাট করছে; তাতে বিপজ্জনক হয়ে পড়ছে প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন।
প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব আজ সবার চোখেই ধরা পড়ছে। বিশ্বজুড়ে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, দাবানল, ঝড়, বজ্রপাত বেড়েই চলেছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, চলতি শতকের শেষে গিয়ে বিশ্বের তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। তাহলে এর প্রভাব বিশ্বের একেক জায়গায় একেক রকম হবে। অস্ট্রেলিয়ায় অতিরিক্ত গরম পড়তে পারে এবং খরার প্রকোপ দেখা দিতে পারে। ব্রিটেনে বৃষ্টিপাতের মাত্রা ব্যাপক বেড়ে গিয়ে ঘন ঘন বন্যা হবে। সাগরের তলদেশের উচ্চতা বেড়ে প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের ছোট অনেক দ্বীপ বা দ্বীপরাষ্ট্র বিলীন হয়ে যেতে পারে।
প্রকৃতি ও জীবন এক সুতোয় গাঁথা। তাই জীবন সবার ঊর্ধ্বে। সব উন্নয়ন-চিন্তার আগে প্রকৃতি বা জলবায়ুর উন্নয়ন-চিন্তা করতে হবে। প্রকৃতি ও জীবন যদি না থাকে তাহলে উন্নয়ন কোনো কাজে আসবে না। অতি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
জাতিসংঘের বৈশ্বিক উষ্ণতাবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) গবেষণায় দেখা যায়, আমাদের গ্রহটি ১২ বছরের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির চূড়ান্ত সীমা (১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) অতিক্রম করতে পারে। সেটা কিনা প্রাক-শিল্পযুগের মাত্রার থেকেও বেশি। এতে আবহাওয়া পরিস্থিতি অস্বাভাবিক রূপ নেবে। বিশেষ করে চরম দুর্ভিক্ষ, দাবানল, বন্যা সেই সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের খাদ্য সংকটের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। তাপমাত্রার এই সীমা অতিক্রম এড়াতে সুদূরপ্রসারী ও নজিরবিহীন পরিবর্তন আনা দরকার।
কয়েকটি অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারলেও কিছুটা তাপমাত্রা কমানো সম্ভব। এক. আমাদের পানি সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহার করা উচিত। বিশেষ করে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের কাজে জড়িত থাকার চেষ্টা করতে হবে। দুই. জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি সবদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। একটি টেকসই কমিউনিটি জীবনযাত্রা প্রতিষ্ঠায় অন্যদের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করতে হবে। অংশীদারভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। তিন. শক্তির অপচয় রোধে জলবায়ুর তাপমাত্রা কমানো সম্ভব। ওয়াশিং মেশিনে কাপড় যদি ধুতেই হয়, তাহলে সেটি শুকানোর কাজ মেশিনের টাম্বেল ড্রায়ারে না করে বাইরে রোদে বা বাতাসের মধ্যে রশিতে মেলে দিন। এতে কাপড় শুকানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। ঘরকে ঠান্ডা করতে এসির ব্যবহার বন্ধ করুন। ঘর গরম করতে হিটারের ব্যবহার বন্ধ করুন, নয়তো হিটারের তাপমাত্রা কমিয়ে দিন। প্রথম ক্ষতি হচ্ছে, আমরা এসি চালাতে গিয়ে অনেক বেশি পরিমাণে এনার্জি খরচ করছি। আরেকটি ভয়াবহ ক্ষতির কারণ, বেশিরভাগ এসি এবং রেফ্রিজারেটরে বতর্মানে ক্লোরোফ্লুরো কার্বন-সিএফসি নামক এক কেমিক্যাল ব্যবহূত হয়। চার. গণপরিবহন ব্যবহার করেও ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের পরিবর্তে হাঁটা, সাইক্লিং বা গণপরিবহনের ব্যবহার কার্বন নির্গমন কমিয়ে আনার পাশাপাশি আপনাকে ফিট রাখতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহারেও কার্বন নির্গমন কমানো সম্ভব।
এ ছাড়া ইটভাটা কমানো, বেশি বেশি তালগাছ লাগানো, ছাদকৃষি বৃদ্ধি, কয়লার ব্যবহার কমানো, পাহাড় কাটা বন্ধ- এসব ছোট বিষয়ও জলবায়ুর উষ্ণতা কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই অতি দ্রুত বিশ্বের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এক হয়ে এ বিষয়গুলো বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। নয়তো খুব দ্রুতই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে বতর্মান ও আগামী প্রজন্মকে হুমকির সম্মুখীন হতে হবে।
শিক্ষক, বান্দরবান ক্যান্ট. পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ

বিষয় : জলবায়ু পরিবর্তন রুখতে... রোজিনা আকতার

মন্তব্য করুন