গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাপমারা ইউনিয়নের 'রংপুর সুগার মিলের' সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষুু খামারের জমিকে ঘিরে হামলা-মামলার ঘটনা জাতীয় শিরোনামে পরিণত হয়েছে। ঘটনাটিকে গণমাধ্যম কেবল 'সাঁওতালপল্লি'তে হামলা ও 'আদিবাসী ভূমি সংকট' হিসেবে উপস্থাপন করে চলেছে। সরকার ও প্রশাসনও ঘটনার যাবতীয় দরবার ধামাচাপা দিয়ে বলেছে, আদিবাসী সাঁওতালদের ব্যবহার করে চিনিকলের জমি দখল করার জন্য এই ঘটনার সূত্রপাত। কিন্তু আমাদের জানা জরুরি, কেন এই ঘটনা ঘটছে এবং ঘটে চলেছে? তিনজন সাঁওতাল আদিবাসী পুরুষের নিহত হওয়ার পরই কেন চিনিকলের সঙ্গে এই জমির বিবাদ নিয়ে সবাই দুম করে সোচ্চার হয়ে উঠল? ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রশাসন, চিনিকল, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং তাদের ভাড়াটে বাহিনী যদি সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মে 'নজিরবিহীন' হামলা না করত, আগুন দিয়ে সব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে না দিত, লুটপাট না করত, গুলি করে মানুষ না মারত তবে হয়তো দীর্ঘ নিশ্চুপতার আড়ালে রাষ্ট্রের এমনতর প্রবল অন্যায়গুলো ঘুপটি মেরেই থাকত।

রংপুর সুগার মিল লিমিটেড গাইবান্ধা জেলার একমাত্র ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের শ্রীপ্রতিপুর মৌজায় এই চিনিকল তৈরি করা হয়। ১৯৫৬ সালে 'পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন' ইক্ষু খামারের জন্য ১৫টি সাঁওতাল ও পাহাড়িয়া আদিবাসী গ্রাম ও ৫টি বাঙালি গ্রাম উচ্ছেদ করে। ৫নং সাপমারা ইউনিয়নের রামপুর, সাপমারা, মাদারপুর, নরেঙ্গাবাদ ও চকরহিমাপুর মৌজার ১৮৪২.৩০ একর ভূমি 'রংপুর সুগার মিলের ইক্ষু খামারের' জন্য অধিগ্রহণের নামে কেড়ে নেয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার। কথা ছিল অধিগ্রহণের নামে গ্রামের মানুষের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নেওয়া এই জমিনে আখ চাষ হবে। আখ-ভিন্ন অন্য কোনো ফসল চাষ করা হলে বা চিনিকলের উদ্দেশ্যর সঙ্গে সম্পর্কহীন কোনোকিছু করা হলে কেড়ে নেওয়া এসব জমি আবারও ভূমি মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে। অধিগ্রহণের পর বেশকিছু জমিনে আখ চাষ হয় এবং আখ ব্যবহার করে চিনিও উৎপাদিত হয়। কিন্তু চিনিকল কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার দরুন ৩১ মার্চ ২০০৪ সালে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরে নানা সময় একবার চালু হয়, আবার বন্ধ হয় এভাবেই চলতে থাকে। চিনিকল কর্তৃপক্ষ নানাভাবে অধিগ্রহণকৃত জমি বহিরাগত প্রভাবশালীদের কাছে ইজারা দিতে শুরু করে। বাপ-দাদার জমিনে অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবিতে আদিবাসী-বাঙালি ভূমিহীনদের তৈরি হয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন।

২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ তাদের শ্রমিক-কর্মচারী ও ভাড়াটে মাস্তান বাহিনী নিয়ে হামলা চালায় মাদারপুর মৌজায় নতুনভাবে ঘরবসতি নির্মাণ করে বসবাসরত নিরীহ আদিবাসী ও বাঙালিদের ওপর। কয়েক মাস ধরে এখানে তারা মাটির ছাপরা ঘর তুলে বসবাস করছিলেন। আশপাশের জমিনে খেসারি কালাই, ধান ও শস্য বুনেছেন। হামলাকারীরা আগুন জ্বালিয়ে তছনছ করে দেয়। ঘটনার দিন সকাল ১০টার দিকে চিনিকল কর্তৃপক্ষ পুলিশ, সাপমারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বার, চিনিকল শ্রমিকদের নিয়ে কাটাবাড়ি মোড়ে আসেন। তাদের উপস্থিতি দেখে স্থানীয় আদিবাসী ও বাঙালিরা তাদের আগমনের কারণ জানতে চায়। তখন আদিবাসী-বাঙালিরা বলেন, গণমাধ্যম ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সামনে আখ কাটতে হবে। কারণ কোনো প্রমাণ না থাকলে চিনিকল কর্তৃপক্ষ আখ 'চুরি' হয়েছে এমন মিথ্যা অপবাদ চাপাতে পারে। এ নিয়ে চিনিকল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কিছু কথা কাটাকাটি হয়। তাদের সঙ্গে আসা সাপমারা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার মো. শাহ আলম সরকার এ সময় পুলিশের দিকে তীর ছুড়ে মারে। এ নিয়ে পুলিশ মারমুখী হয়। চিনিকলের লোকজন মাঝি হেমব্রম ও দ্বিজেন টুডুকে ধরে আটকে ফেলে। পুলিশ এ সময় কোনো ঘোষণা ছাড়াই জনতার দিকে গুলি ছোড়ে। প্রতিবাদী জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং দেখতে পায় শ্যামল হেমব্রমসহ তিনজন আদিবাসী গুলিতে জখমপ্রাপ্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় আহতদের হাসপাতালে নিতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং পুলিশ ও চিনিকল কর্তৃপক্ষ চলে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার সময় গুলিতে জখমপ্রাপ্ত শ্যামল হেমব্রম মারা যান।

হঠাৎ বিকেলে পুরো এলাকা ঘেরাও দিয়ে বন্দুক নিয়ে এগিয়ে আসে একদল সশস্ত্র পুরুষ। প্রশাসন, চিনিকল ও জনপ্রতিনিধিরা মুহূর্তেই মাদারপুর মৌজায় নতুন বসতি স্থাপনকারীদের বসতি চুরমার করে দেন। গুলিতে এলাকা ঝাঁজরা হয়ে যায়। এলাকাবাসী সাত-আটজন সাঁওতাল আদিবাসীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নিথর পড়ে থাকতে দেখেন। নিমেষেই পুলিশ এলাকা থেকে সবাইকে উচ্ছেদ করে। পরে চিনিকল কর্তৃপক্ষ দিনরাত ট্রাক্টর চালিয়ে বসতভিটা গুঁড়িয়ে সমান করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। যেন বসতির কোনো চিহ্ন না থাকে। কেবল বসতিঘর নয়, তারা জাহেরথান, পূজাস্থল, মন্দির, ধর্মস্থল, বিদ্যালয় সবই ভেঙেচুরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। হামলার পরের দিন পুলিশ মঙ্গল মার্ডির (৫০) লাশ ফেরত দেয়। আহত অবস্থায় ঘরে মারা যান রমেশ টুডু। চোখে গুলিতে মারাত্মক জখমপ্রাপ্ত দ্বিজেন টুডু জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে, বিমল কিসকু ও চরণ সরেন ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

ওই ঘটনা থেকে আমরা কী শিক্ষা পেলাম? রাষ্ট্রের অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এবং উন্নয়ন কর্মসূচি জনবান্ধব ও জনগণের পূর্ণ সম্মতিতে হওয়া জরুরি। অধিগ্রহণের মানে যেন আর কখনোই মানুষকে বুঝতে না হয় 'জোর করে কেড়ে নেওয়া'। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিরা কী এভাবে 'আখ বা বীজ-আখ' কাটার জন্য খুন-হামলা-অগ্নিসংযোগ-গুলি করতে পারেন? এই ঘটনায় রক্তাক্ত মানুষের পাশে রাষ্ট্র না দাঁড়ালেও মানুষই দাঁড়িয়েছে মানুষের পাশে। নানা বয়সের তরুণ, প্রবীণ নারী-পুরুষরা ছুটে এসেছে গোবিন্দগঞ্জে। দেশব্যাপী মানুষ এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ন্যায়বিচার দাবি করেছে। সিলেটে ঘটনার প্রতিবাদে মঞ্চস্থ হয়েছে নাটক 'ভূমিসূত্র'। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের নির্যাতিত ভূমিহীন আদিবাসী ও বাঙালিদের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। অধিকার সচেতন নাগরিক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আদিবাসী ও মানবাধিকার সংগঠন। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সরব ও সোচ্চার। বাগদাফার্মের এই চলমান ভূমি আন্দোলন প্রমাণ করে চলেছে এটি যৌক্তিক, ন্যায্য এবং মানবিক। নানা সংঘাত আর সংকটে আবর্তিত চলমান দুনিয়ায় এই আন্দোলন এক বিরল ঐক্য তুলে ধরেছে। এভাবেই সব মানুষের মানবিক সম্পর্ক এবং সমঅধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে গড়ে উঠুক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এক স্বপ্টম্নময় বাংলাদেশ।

গবেষক ও লেখক
animistbangla@gmail.com