গত আগস্টে ঢাকায় 'বঙ্গবন্ধু টি২০ সিরিজ ২০২১'-এ ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ 'সিরিজ জয়'ই শুধু করেনি বলা যায়, এক নতুন ইতিহাসই গড়েছিল। আমরা তখন এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই লিখেছিলাম- অনন্য বিজয়ে অদম্য বাংলাদেশ। চলমান টি২০ বিশ্বকাপের সঙ্গে ওই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সময়ের ব্যবধান খুব কমই। মাসকটে টি২০ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে হারের পর কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ ও তার সতীর্থরা। তারপর ওমান ও পাপুয়া নিউগিনির মতো দুর্বল দলকে হারিয়ে সমালোচনার ঝড় কিছুটা সামাল দিতে পারলেও টি২০ বিশ্বকাপে সুপার টুয়েলভে পাঁচটি ম্যাচের প্রতিটিতেই বাংলাদেশের শোচনীয় পরাজয় আত্মসমালোচনার পাশাপাশি কারণ অনুসন্ধানের তাগিদ দিয়েছে। বৃহস্পতিবার দুবাইয়ে সেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই শেষ ম্যাচে লজ্জাজনক হার প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে- বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই বিপর্যয়ের দায় কি শুধু ক্রিকেটারদেরই? শুক্রবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যথার্থই বলা হয়েছে, দায় কারোরই কম নয়।

আমরা জানি, টি২০ বিশ্বকাপ ২০২১-এর অধ্যায়জুড়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স হতাশা আর বিবর্ণতার। বিদ্যমান বাস্তবতায় এ প্রশ্নও দাঁড়ায়- টি২০ বিশ্বকাপের জন্য মাহমুদউল্লাহ ও সতীর্থদের অনুশীলন, মনোবল কিংবা টিমওয়ার্ক কোনো কিছুই কি ছিল ছকবদ্ধ? আমরা দেখেছি, দলের প্রতিটি হারের পর কঠোর সমালোচানার তীরে বিদ্ধ হয়েছেন ক্রিকেট প্রশাসনের কর্মকর্তারাও। পারস্পরিক দোষারোপের মধ্য দিয়ে সংশ্নিষ্ট প্রায় সবাই নিজ নিজ দায় এড়াতে চেয়েছেন।

আমরা মনে করি, এমনটি দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে সুচারু রূপরেখার প্রণয়ন ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ঘাটতিরই বহিঃপ্রকাশ। ক্রিকেট বিশ্নেষক ও বাংলাদেশ দলের সাবেক ক্রিকেটাররাও এই বিপর্যয়ের বেশকিছু কারণ সুনির্দিষ্ট করে সমালোচনায় উচ্চকণ্ঠ। টিম ম্যানেজমেন্টের ভুল পরিকল্পনা কিংবা দল গঠনে নির্বাচকমণ্ডলীর ভুলের যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, তা আমলে নিয়ে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে বিসিবির করণীয় রয়েছে অনেক কিছু। এই বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। দলের শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, প্রশিক্ষক সব ব্যাপারেই নির্মোহ পর্যালোচনাক্রমে পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি। বাংলাদেশের ক্রিকেট যে গৌরবোজ্জ্বল ধারায় ফিরেছিল সেখান থেকে কী জন্য, কাদের ব্যর্থতায় অনাকাঙ্ক্ষিত-দুঃখজনক এই পশ্চাৎমুখীনতার কারণগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই।

আমরা জানি, আমাদের ক্রিকেটে বিনিয়োগ কম নয়। এত বড় বিপর্যয়ের পর দলের প্রস্তুতি নিয়ে আজ যেসব কথা উঠছে তাই বা কেন? কেন দায়িত্বশীলরা আগেই এসব আমলে রাখেননি? আমরা মনে করি, শুধু ক্রিকেটারদের ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার অবকাশ নেই। আমরা এও জানি, যে কোনো ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি বিষয়। ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের মতো ক্রিকেটের পরাক্রমশালী দলগুলোকে যে দল নাস্তানাবুদ করার সক্ষমতা দেখিয়েছে, সেই বাংলাদেশ কি শুধু টি২০ বিশ্বকাপে মাঠের কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারার কারণেই পড়ল এই বিপর্যয়ের মুখে?

আমাদের ক্রিকেটের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা জরুরি, দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আর বিশ্বকাপের আসরের প্রেক্ষাপট এক নয়। সেই নিরিখেই দল গঠন, পরিচালনা, অনুশীলন ও মাঠের কন্ডিশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে যথাযথ জ্ঞানলব্ধ করতে না পারার ব্যর্থতা কমবেশি সংশ্নিষ্ট সবারই। করোনা পরিস্থিতিতে ক্রিকেটসহ বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন যখন প্রায় বিপর্যস্ত, তখন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের যে অনন্য অর্জন ছিল তাতে আরেকবার প্রমাণিত হয়েছিল- বাংলাদেশ অদম্য।

আমরা ক্রিকেট নিয়ে আশা আর আশাভঙ্গের ইতিহাসের বৃত্তাবদ্ধে থাকতে চাই না। আমরা সংশ্নিষ্ট সবার দায়িত্বশীলতার কথা পুনর্বার মনে করিয়ে দিতে চাই। পরাজয়ে নেতিবাচক অবস্থান না নিয়ে সংশ্নিষ্ট সবাইকে ব্যর্থতার গ্লানি মুছে ফেলতে করণীয় সবকিছুই করতে হবে ক্রিকেটকে প্রাধান্য দিয়ে। বিশ্ব ক্রিকেটের চলমান মহাযজ্ঞ থেকে বাংলাদেশের ঝরে পড়া থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোতে হবে। কেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এ অবস্থা তা খুঁজে বের করে লড়াকু মেজাজ, সংহতি, দক্ষতা-শৃঙ্খলা বিশ্বমানের করার জন্য ক্রিকেট কর্মকর্তারা দ্রুত সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করবেন- এটিই প্রত্যাশিত।