নিপীড়িত ও জুম্ম জনগণের অধিকার আন্দোলনের পথিকৃৎ বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ (এমএন) লারমা। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদ সদস্য ও সাবেক সাংসদ। তার জন্ম রাঙামাটি পার্বত্য জেলার নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট মৌজার মাওরুম (মহাপুরম) গ্রামে ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। বিপ্লবী এমএন লারমা ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি সচেতন ছিলেন। তিনি ১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম পাহাড়ি ছাত্র সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা। ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগদানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে যুক্ত হন। পাকিস্তান আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫৪ হাজার একর ভূমির ওপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করতে সেখানকার প্রায় এক লাখ আদিবাসীকে স্থানচ্যুত করা হয়। ১৯৬০ থেকে ৬৫ সাল পর্যন্ত কাপ্তাই বাঁধবিরোধী আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন তিনি।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা। প্রথমে এ সমিতির সাধারণ সম্পাদক, পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০-এ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তরাঞ্চল থেকে বিপুল ভোটে সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এর পর গড়ে তোলেন 'শান্তিবাহিনী', যা জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা।  
এমএন লারমাই সর্বপ্রথম পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জন্য স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ছাড়া ভাষাগত সংখ্যালঘু পাহাড়ি আদিবাসীর মুক্তি নেই। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি পার্বত্যাঞ্চলের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রসঙ্গ উত্থাপন করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে চার দফা দাবি পেশ করেন।  
এমএন লারমাকে জুম্ম জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা বলা হলেও তার চিন্তা-চেতনার ব্যাপ্তি যে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এরও প্রমাণ পাওয়া যায়। স্বাধীনতাপরবর্তী গণপরিষদে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের পাশাপাশি দেশের শোষিত-বঞ্চিত জনতার মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সর্বদা সোচ্চার ছিলেন।
মেহনতি মানুষের নেতা এমএন লারমা ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবর সংবিধান বিলের ওপর সাধারণ আলোচনায় বলেছিলেন, 'বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের মনের কথা পুরোপুরি এই সংবিধানে নেই। যদি সাড়ে সাত কোটি মানুষের মনের কথা এই সংবিধানে থাকত, তাহলে আমার আপত্তির কোনো কারণ থাকত না। কিন্তু আজ আমি দেখতে পাচ্ছি পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা, মাথাভাঙ্গা, শঙ্খ, মাতামুহুরি, কর্ণফুলী, যমুনা, কুশিয়ারা প্রভৃতি নদীতে রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে যারা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর নিজেদের জীবন তিলে তিলে ক্ষয় করে নৌকা বেয়ে দাঁড় টেনে চলেছেন; রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা শক্ত মাটি চষে সোনার ফসল ফলিয়ে চলেছেন, তাদের মনের কথা এই সংবিধানে লেখা হয়নি। আমি বলছি, আজকে যারা রাস্তায় রাস্তায় রিকশা চালিয়ে জীবন নির্বাহ করে চলেছেন, তাদের মনের কথা এই সংবিধানে লেখা হয়নি।'
যে বিষয়ে তার পরিস্কার দাবি ছিল তা হলো- দেশের বহু জাতির সত্তা ও অবদানের স্বীকৃতি সংবিধানে দেওয়া হয়নি। তিনি আদিবাসীর জাতিগত পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতির জোরাল দাবি জানিয়েছিলেন। আমাদের দেশে বাঙালি জাতি ছাড়াও ৫০টির অধিক জাতিসত্তা রয়েছে। দেশের মুক্তিযুদ্ধে এসব জাতিগোষ্ঠীর লোকজন স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করে অসামান্য অবদান রেখেছেন। এসব জাতিসত্তার মানুষ সংখ্যায় কম হলেও সংস্কৃতির দিক থেকে তাদের ভিন্নতা রয়েছে। তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার রয়েছে। কিন্তু সংবিধানে যখন একক সত্তাবিশিষ্ট শুধু বাঙালি জাতির কথা তুলে ধরা হয়, তখন তিনি এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন।
৫০টিরও অধিক ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তা এ দেশের পাহাড় ও সমতলে এখনও বিদ্যমান, যারা জাতি হিসেবে বাঙালি নয় এবং তাদের 'উপজাতি' বলাও অগ্রহণযোগ্য। এসব ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর লোকজনকে আমরা একসঙ্গে 'আদিবাসী' বলি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য সংসদে গৃহীত হয়নি। সংবিধানে বাঙালি ছাড়া চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, হাজং, কোচ, মণিপুরি, খাসি, সাঁওতাল, ওরাওঁ, মাহাতো, রাখাইন, মুন্ডা- এসব জাতিসত্তার স্বীকৃতি মেলেনি।
পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার তাদের দাবি স্বীকার করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তিটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এমএন লারমার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ অনেকটা সার্থক হবে বলা যায়। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর প্রায় ২৪ বছর হতে চলেছে; মূল বিষয়গুলোসহ চুক্তির অনেক ধারা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। পাশাপাশি সারাদেশে আদিবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার চর্চার পথ যেন আরও সংকুুচিত হয়ে আসছে। আদিবাসীর চিরাচরিত ভূমিগুলোতে রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষণা, ইকো-পার্ক, পর্যটন কেন্দ্র ও নানা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়ায় আদিবাসীদের মনে ভীতি ও উচ্ছেদের আতঙ্ক বিরাজমান। এ ছাড়া ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, আদিবাসীর ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা ঘটনা ঘটেই চলেছে। তাই যেখানে সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সত্য কথা বলা ও পাশে থাকার সাহস দিন দিন যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে, ঠিক এই সময়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মতো অজেয় শক্তিমান প্রতীক ও জোরাল কণ্ঠস্বর অনেক বেশি প্রয়োজন। 
মাত্র ৪৪ বছর বয়সে অবসান ঘটে বিপ্লবী এমএন লারমার বর্ণাঢ্য জীবন। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর বিভেদপন্থি গ্রুপের এক বিশ্বাসঘাতকতামূলক সশস্ত্র হামলায় আট সহযোদ্ধাসহ তিনি নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন। আজ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে শুধু শ্রদ্ধাভরে স্মরণই করছি না; তার মতো অধিকার আদায়ের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর সংসদ ও রাজপথে যে কতটা প্রয়োজন, সেটাও অনুধাবন করছি। এমএন লারমার সংগ্রাম ও সাধনা বৃথা যেতে পারে না। বিপ্লবী চে গুয়েভারা মনে করতেন- 'বিপ্লবীকে হত্যা করা যায়, কিন্তু বিপ্লবকে কখনও নয়। বিপ্লবীকে হত্যা করলেও বিপ্লবের সুফল ঠিকই থেকে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।'
এমএন লারমা বলেছিলেন, 'অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়।' আমাদের বর্তমান যুব প্রজন্মের কাছে এমএন লারমার বিপ্লবী চেতনা ও আদর্শ প্রেরণা হিসেবে কাজ করে যাবে। 
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য