কয়েক বছর আগে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশোতে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রসঙ্গে আলোচনার এক পর্যায়ে মন্তব্য করেছিলাম, বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশকে যদি নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁর তাজমহলের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে তা কি খুব অযৌক্তিক হবে? কারণ সোনারগাঁর ওই তাজমহল (রেপ্লিকা) দেখতে অবিকল আগ্রার তাজমহলের মতো হলেও ওটার ভেতরে সম্রাজ্ঞী মমতাজের সমাধি নেই। আমাদের দেশে গণতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে দীর্ঘকাল ধরেই। এই গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য লড়াই করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আমাদের সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছে। রক্তক্ষয়ী ওই যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের জীবনহানি ঘটেছে; মা-বোনদের সল্ফ্ভ্রম হারাতে হয়েছে। ৯ মাসের যুদ্ধের পর দেশ শত্রুমুক্ত হয়েছে; পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। স্বাধীনতার ১১ মাসের মাথায় আমরা পেয়েছিলাম একটি সংবিধান। এই সংবিধানে আমাদের জাতীয় চার মৌলনীতির প্রথমেই রয়েছে গণতন্ত্র। তবে সাংবিধানিকভাবে গণতন্ত্রকে সর্বোচ্চে স্থান দেওয়া হলেও কার্যত তা কতটুকু কার্যকর হয়েছে, তা কিন্তু প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আমাদের গণতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশ হয়েছে- এমন দাবি আমরা করতে পারি না।
একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের অবস্থান কেমন, তা বোঝার বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যারোমিটার নেই। তবে, রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতিই বলে দেয়, গণতন্ত্র কেমন আছে। আর রাজনৈতিক সেই পরিবেশ মূর্ত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক দলগুলোর কথাবার্তা ও আচরণে। আমাদের এ দেশে গণতন্ত্র আছে কি নেই, তা এক অন্তহীন বিতর্ক। যে দল যখন ক্ষমতাসীন থাকে, তারা দাবি করে- দেশে গণতন্ত্র ভরা বর্ষায় বানের পানির মতো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর যারা সরকারের বাইরে অর্থাৎ বিরোধী দলে থাকে, তাদের ভাষায়- গণতন্ত্রের নদীতে শুধু ভাটা-ই চলছে না; তা যেন চৈত্রের খরায় শুকিয়ে খটখটে মাঠ। বলা বাহুল্য, দু'পক্ষের ভাষ্যই সর্বাংশে সত্য বা মিথ্যা নয়। আসলে একটি দেশে গণতন্ত্র তখনই প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে যখন সে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো অর্থাৎ এগুলোর নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক রীতি-পদ্ধতির প্রতি বিশ্বস্ততা দেখাতে সক্ষম হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আমাদের দেশে সে চর্চা কখনোই করা হয়নি। প্রতিপক্ষকে অবদমনের মানসিকতা গণতন্ত্রকে মাথা তুলেই দাঁড়াতে দিচ্ছে না। বর্তমানে দেশে এক রকম বিরোধী দলহীন পরিবেশ বিরাজ করছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য নানা কারণে এতটাই ন্যুব্জ; স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়-উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ৮ নভেম্বর যুক্তরাজ্যের লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেছেন, সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক দল টিকে থাকবে কীভাবে? (সমকাল ৯ নভেম্বর)। বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সংশয়ের মধ্যে ইতিবাচক দিক রয়েছে। আমাদের দেশে সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করতে নানা ফন্দি-ফিকির করে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটা অবশ্যই ইতিবাচক একটা দিক। কেননা, আমার ধারণা, তিনি এটা বিলক্ষণ জানেন, শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। আর সে গণতান্ত্রিক রাজনীতির মাঠে লড়াইও উপভোগ্য এবং অর্থবহ হয় না। কেউ কেউ এ প্রসঙ্গ তুলতে পারেন- সরকারের ভূমিকার কারণেই বিএনপি তার সাবলীল রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই চান, বিএনপি তার অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকুক, তাহলে তার উচিত এক সময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সতীর্থ এ দলটিকে রাজনৈতিক তৎপরতার প্রয়োজনীয় স্পেস দেওয়া। যুক্তি হিসেবে এ বক্তব্য তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। বস্তুত আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি পরমতসহিষুষ্ণ না হন, তাহলে গণতন্ত্র সোনার হরিণ হয়েই থাকবে।
দেশে এখন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের একক রাজত্ব চলছে- এ কথা অস্বীকার করা যাবে না। চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি দলগতভাবে অংশ না নিলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্থানীয় নেতা চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে বেশিরভাগ জায়গায় আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগই। নিজেদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষও হচ্ছে নানা জায়গায়। এর মধ্যে ৯ নভেম্বরের সমকালের 'সহিংসতার উস্কানি' খবরটি পড়ে অনেকেরই চক্ষু চড়কগাছ। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রকাশ্যে এমন সহিংসতার উস্কানি বা সন্ত্রাসী হুমকি দিতে পারেন- তা বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। সমকালের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুরের হুমাইপুরে এক নির্বাচনী প্রচার সভায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে প্রয়োজনে 'একে-৪৭ রাইফেল' ব্যবহারের হুমকি দিয়ে বলেছেন, 'প্রশাসন আমাদের, পুলিশ আমাদের, সরকার আমাদের। আর কিছু বলার আছে? এমপি সাহেবের চোখ লাল হয়ে আছে। উনার ইঙ্গিতেই আমি এগুলো বলছি।' রাজশাহীর তানোরে ক্ষমতাসীন দলের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী বিদ্রোহী প্রার্থীকে এই বলে হুমকি দিয়েছেন, 'তুমি আওয়ামী লীগ করবা, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত মানবা না- তুমি এত বড় বাঘের বাচ্চা হতে পারো না। তোমাকে আমরা বিড়াল বানিয়ে দেব।' কক্সবাজারের একটি ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এই বলে ভোটারদের হুমকি দিয়েছেন, 'যারা নৌকায় ভোট দেবে না, তাদের চিহ্নিত করা হবে। কবরস্থানে তাদের কবর দিতে দেওয়া হবে না।' আর গত ২৩ অক্টোবর কুষ্টিয়ার যুবলীগ নেতা রবিউল ইসলাম সদম্ভে নিজেকে কুষ্টিয়া জেলার 'মাস্তান' ঘোষণা করে বলেছেন, 'আমি রবিউল, আমি কুষ্টিয়া জেলার মাস্তান। আমাকে মাস্তানির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। আমার যেসব ছেলেপেলে আছে, তাদের নিয়ে চাইলে আমি থানার সামনে দুই-তিন ঘণ্টা লড়াই করে থানাকে হটিয়ে দিতে পারি।' প্রতিদ্বন্দ্বী দল বা প্রার্থীকে এমন হুমকি-ধমকি দেওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তার দলের মধ্যে থেকে যারা দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছেন, তাদের ব্যাপারে তিনি কী ভাবছেন? তাদের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগ এবং সরকারের যে ইমেজ সংকট তৈরি হচ্ছে, তা নিশ্চয় তিনি অনুধাবন করতে পারছেন। বর্তমান সরকার উন্নয়নসহ অনেক প্রশংসনীয় কাজ করছে। তা সত্ত্বেও সরকারের প্রতি জনগণের ক্ষোভের বিষয়টি চাপা থাকছে না। পরিচিত অনেকেই বলেন, উন্নয়নের দিকে তাকালে আওয়ামী লীগের প্রতি মনটা প্রসন্ন হয়ে ওঠে। কিন্তু ওই একে-৪৭ রাইফেলওয়ালাদের কথাবার্তা শুনলেই মনটা চুপসে যায়।
সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক