শেষ দেখা জুন ২০০৫ সালে, বার্লিনে। এসেছিলেন জার্মানি। গ্যয়টে ইনস্টিটিউটের ফেলোশিপে। যা হয় ফেলোশিপে, টাকাকড়ি, যাবতীয় খরচাপাতি দিচ্ছে সরকার (গ্যয়টে ইনস্টিটিউট), চরকির মতো ঘোরাচ্ছে এ শহরে-ও শহরে। ফেলোশিপের সময়কাল শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে কুবুদ্ধি দিলুম, অসুস্থ হওয়ার ভান করুন। কেন? অন্তত অনুজের সঙ্গে দিনদুয়েক কাটানো যায়। ডাক্তারনি পরিচিত তথা বন্ধু। বললেন, 'ঠিক আছে।' প্রেসক্রিপশনে লিখলেন, 'অত্যধিক ঘোরাঘুরিতে বিশ্রাম আবশ্যক।' এ দেশে (ইউরোপেও) ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনেই স্বর্ণমাদুলি। কারও কিছু বলার এখতিয়ার নেই।
বার্লিনে যিনি দেখভালের দায়িত্বে, হাসপাতালে ব্যবস্থা করতে উদ্‌গ্রীব। করবেনই। আগেই শিখিয়ে দিয়েছিলুম, কী বলতে হবে। কথা শুনে ক্লাউস হোফমান (তত্ত্বাবধায়ক) ভ্যাবাচ্যাকা। জিয়া হায়দার বলেন :'হাসপাতালে থাকাই ভালো কিন্তু সমস্যা হাসপাতালের, হোটেলের খাবার পেটে সহ্য হচ্ছে না, আমরা, বাংলাদেশে খাই কাঁচামরিচের ঝাল, শুঁটকির ঝোল, কচুর লতি, করলা ভর্তা, পানদোক্তা। এগুলি ডায়াবেটিস রোগীর জন্য উত্তম দেশীয় পথ্য। এখানে নিশ্চয় অনেক বাংলাদেশি আছেন, খুঁজে দেখছি। ওখানে বিশ্রাম নেব, শুশ্রূষা পাব।' খাদ্যতালিকা শুনে নাকি ক্লাউস প্রায়-মূর্ছা যান।
নোটবুক বের করে জিয়া হায়দার কাকে-কাকে ফোন করেন, ক্লাউসের বাপের সাধ্যি নেই আবিস্কারের। কথা বলেন বাংলায়। শেষে, ''তুই অন্য নাম বলবি, 'হায়দার' যোগ করবি না।" ক্লাউস ফোনে জিজ্ঞেস করলেন বাড়ির ঠিকানা। ক্লাউস নিজের গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেলেন। ডিনারে বললুম, পাস্তা। এদেশীয় গুলাশসহ। খেতে-খেতে বলি, এই নিয়ে মজার নাটক লিখতে পারেন। কাহিনির মূলে একজন। প্রাথমিক সমস্যা বিদেশে থাকা। আবহাওয়া। ভাষা। সংস্কৃতি। খাদ্য কালচার। পরামর্শ দিই, এই নিয়ে মজার নাটক লিখতে পারেন।
''তুই বরং কাহিনির সারমর্ম মামুনুর রশীদকে লিখতে পারিস। আমিও বলব। আমার চেয়ে মামুন দুই জার্মানির চেহারা-চরিত্র ভালো জানে। মামুন কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানিতে এসেছে। আমি আসিনি। মামুনের 'ওরা কদম আলী' নাটক জার্মান ভাষায় অনূদিত। মঞ্চস্থ। বাংলাদেশের একজন নাট্যকারের নাটক জার্মান ভাষায় অনূদিত এবং জার্মান প্রোডাকশন, পরিচালক জার্মান, অভিনেতা-অভিনেত্রীও এই গর্বে আনন্দে আমার বুক ৯৬ ইঞ্চি বেড়ে যায়।' বিস্ময়মানি মামুন-প্রগলভতায়। 'ওরাই আমাদের নাট্য প্রগতিশীলে আগুয়ান, আমরা বয়স্ক। সেলিম আল দীনসহ আরও কয়েকজন আছে। সেলিমের বোধবুদ্ধি, কাজ, সংগ্রামও করি। সেলিমকে আমিই প্রথম টেলিভিশনে চান্স দিয়েছিলাম। ট্যালেন্টেড। আরও একজন স্বপনের (জাহিদ হায়দার) বন্ধু জামিল (জামিল আহমেদ) নাট্যকলার সার্বিক কলায় সুপণ্ডিত। মামুন, সেলিম, জামিলরা নাটক, নাট্যকলার গুরুস্থানীয় হবে। দৃঢ় বিশ্বাস।
আশ্চর্য! অতীতে বলেননি কখনও। মা রহিমা খাতুন, বাপ শেখ মোহাম্মদ হাকিমউদ্দীন, একদা প্রতাপশালী জমিদার। শুনেছি (লোকমুখে), 'জমিদারের পেরথম ছাওয়াল রউফ (জিয়া হায়দার) জমিদারি দর্শনে আয়ছে, ভেট দেওয়া লাগবি।' পেয়েছেন। পাবনা ছাড়াও ঢাকার মানিকগঞ্জে (ওখানেও জমিদারি ছিল শেখ মোহাম্মদ হাকিমউদ্দীনের) আমাদের, পাঠককে বঞ্চিত করেছেন। জীবনী লেখেননি। তার অতীত, সময়কালের। রাজনীতির। দেশভাগের। পরবর্তী জীবনের। দুঃখসুখপ্রেমের। যে-বাঙালি নারীর প্রেমে আজীবন ব্যাচেলর, তার কথা ভাবীকাল জানবে না।
মার্কিন দেশে থাকাকালীন জেন কেলির মায়ায় সসগ্রিন্ধ, জেন্নিও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসে মাসাধিক কাটিয়ে স্বদেশে ফেরত এবং 'দূর হতে তোমায় ভালোবাসি, বাসিব/স্বপনেশয়নে মনে রাখিব।' ওই পর্যন্তই। দেহাত্মক না হলেও দোঁহায়।
যেতে পারতেন মার্কিন দেশে। যাননি। ভাইবোনদের কে দেখবে? ভাইবোনদের (ছোটমার ভাইবোনদেরও) উৎসর্গ করেছেন নিজেকে। বিস্তর জমিজমা, টাকা দিয়ে। 'তোরা মানুষ হ, সুখশান্তি আমার নয়, তোদের।' বলতেন।
জিয়া হায়দারের দৌলতেই আমাদের পাবনার দোহারপাড়ার বাড়িতে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির কেউকেটা দেখেছিলুম। আবদুল গনি হাজারী পঞ্চাশ-ষাট দশকে বহুমান্য, প্রতাপশালী কবি (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে 'পাকিস্তান অবজারভারের দ্বিতীয় ব্যক্তি।')। ঔপন্যাসিক সরদার জয়েনউদ্দীন (মামা বলতুম। আত্মীয়)। চিত্রালীর সম্পাদক সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ। কবি-ঔপন্যাসিক-প্রাবন্ধিক সৈয়দ শামসুল হক। সম্পর্কিত মামা কবি-গীতিকার-প্রাবন্ধিক-অধ্যাপক ডক্টর আবু হেনা মোস্তফা কামাল। মামা-ভাগ্নের প্রতিযোগিতা। কবিতায়। গানে। রেডিওতে দু'জনেরই গান। রেকর্ডও প্রকাশিত। পরে দু'জনেই অধ্যাপনায়। কলেজে। বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইতোমধ্যে আরও কাহিনি। থাক। স্বল্পপরিসরে বিস্তার বাহুল্য।
নাট্যকলা নিয়ে হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ। নিউইয়র্ক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, থিয়েটারে যুক্ত। দেশে ফিরে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা, একক প্রচেষ্টায়। সূতিকাঘর ১৪/২, মালিবাগ (ঢাকা)। বাসাবাড়ি। ভাড়া। দিনের পর দিন মিটিং। নাট্যগোষ্ঠীর নাম ঠিক হয় না। ''তুই-ই বলেছিলি 'নাগরিক'। তোর নামই ঠিক করি। সংযোজন করি নাট্য সম্প্রদায়। ফজলে লোহানী দায় দেন।''
স্মরণ করিয়ে দিই, ''নারায়ণগঞ্জ থেকে একটি অনিয়মিত সাহিত্য পত্রিকা 'নাগরিক' আসত বাড়িতে। পত্রিকার নাম মনে রেখে বলেছিলুম। আপনারা গ্রহণ করেন।"
স্মৃতি দীর্ঘ করব না, আত্মজীবনী 'ইল্লিন ঝিল্লিনে' বিস্তারিত। পাঠক পড়তে পারেন। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়-এর ইতিহাস জানতে।
সর্বাংশে সত্য- এই জিয়া হায়দারই নাগরিক নাট্য সম্প্র্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। তার জন্মদিন স্মরণীয়।
কবি