কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর একটা কথা বাংলায় চালু আছে। তর না সইলে দ্রুত কাঁঠাল পাকিয়ে খেতে হবে। কিলিয়ে সত্যি কাঁঠাল পাকানো যায় কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। খালি হাতে কিলাতে গেলে তো কাঁঠালের গায়ের কাঁটায় হাত রক্তাক্ত হতে পারে। যেভাবেই হোক, কোনো অংশ থেঁতলে দিয়ে খপাখপ কয়েকটি কোয়া খাওয়া যেতে পারে, কিন্তু পুরো কাঁঠাল কিছুতেই নয়। তবে কীল বা লোহার একটা গোঁজ কাঁঠালের বোঁটার কাছে ঠেসে ঢুকিয়ে দিলে কাঁঠাল তাড়াতাড়ি পাকে, সন্দেহ নেই। কারণ, তাতে ফল পাকার যে নিজস্ব জৈবিক উপাদান ইথিলিন নামক হরমোন, সেটার দ্রুত নিঃসরণ হয়। এই বৈজ্ঞানিক আলোচনায় গেলে আর রাজনীতি বলা হবে না। তাই জাহাজের খবর থাক, আদা কেনাবেচায় আসি।

২০১৯ সালের শেষভাগে আমার এক সাংবাদিক বন্ধু মন্তব্য করেছিলেন, ছাত্রলীগ মারতে মারতেই নুরকে নেতা বানিয়ে দেবে। নুর মানে নুরুল হক নুর। বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনে প্রায় অজানা প্রান্ত থেকে হাউই বাজির মতো কেন্দ্রে উড়ে আসা নেতা। এখন প্রবলভাবে আলোচিত। সদ্য নতুন একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করেছেন। বয়স ৩০। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ২০১৩-১৪ সালে ভর্তি এবং এখন মাস্টার্স-পরবর্তী ছাত্রত্বে আছেন। আমি কখনও তাকে কাছে থেকে দেখিনি, কথা বলিনি। তবে তার খবরাখবর মনোযোগ দিয়ে পড়ি।

সবাই জানেন, দীর্ঘ ২৮ বছরেরও বেশি সময় পরে ২০১৯-এর মার্চে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে বিস্ময় জাগিয়ে নুরুল হক নুর সহসভাপতি বা ভিপি (ভাইস প্রেসিডেন্ট) নামক শীর্ষ পদটিতে বিজয়ী হয়েছিলেন স্বয়ং ছাত্রলীগের সভাপতিকে হারিয়ে দিয়ে। নানা অনিয়মে বিতর্কিত নির্বাচনটিতে প্রায় পুরো কমিটিই ছাত্রলীগের, কেবল ভিপি ছাড়া। ছাত্রলীগ 'মানি না' হুঙ্কার দিয়ে গর্জে উঠে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করলেও ওই দিনই সন্ধ্যায় ফলাফল মেনে নেয়। আর নুর দাবি করেন, জবরদস্তিহীন সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ছাত্রলীগের পাত্তা পাওয়া যেত না। তিনি নিজে জিতলেও নির্বাচন বাতিল করে ভোট পুনঃগ্রহণের দাবি তুলেছিলেন। অন্যান্য ছাত্র সংগঠনও অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন মাঝপথে বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল। অবশ্য সব পক্ষই জেদাজেদি ত্যাগ করে ডাকসু কাজ করুক; চেয়েছে। যদিও ডাকসু পঙ্গুই থেকে গেছে। এই ডাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন নুরের পরিচয় ডাকসুর সাবেক ভিপি অথবা শুধু ভিপি নুর।

ছাত্রসমাজে নুরের জনপ্রিয়তা ও উত্থানের পটভূমি হলো ২০১৭-১৮ সালের কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন, যা 'কোটাবিরোধী আন্দোলন' বলে পরিচিতি পায়। সরকারি চাকরিতে ন্যায়সংগতভাবেই জেলা, নারী, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী প্রভৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রতিযোগিতার মধ্যেই সংরক্ষণ বা কোটা থাকে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ও বিভিন্ন চাপে কোটা বেড়ে যায় এবং বিশেষভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের ৩০ শতাংশ কোটা যুক্ত হয়ে মোট কোটা ৫৬ শতাংশ হয়ে গিয়েছিল। এতে প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ অনেকের চাকরি পাওয়ার সুযোগ কমে যায়। মুক্তিযোদ্ধা কোটা তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত দেওয়ার কথা ওঠে। তাই কোটা কমিয়ে ১০-১৫ শতাংশের মধ্যে আনার জন্য আইন সংশোধনের দাবি ছাত্র-তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়। কিন্তু সরকার দাবি উত্থাপনকারীদের রাজনৈতিকভাবে সন্দেহ করায় মেনে নিচ্ছিল না। আলোচনা, সভা-সেমিনার থেকে আন্দোলন রাস্তায় গড়ায় এবং সেটি সম্ভব করেছিলেন নুরুল হক ও তার সঙ্গীরা 'বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ' নামে সংগঠন তৈরি করে নেতৃত্ব দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরো কোটা প্রথা বাতিল ঘোষণা করে উত্তেজনা  থামিয়ে দেন। প্রান্তিক ও প্রতিবন্ধী মানুষদের অন্তর্ভুক্তির ভিন্ন নীতি নেন।


পটুয়াখালীর চর অধ্যুষিত গ্রামে জন্ম নেওয়া, গ্রামে বেড়ে ওঠা নুর ছাত্রলীগ করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুহসীন হলে ছাত্রলীগের কমিটিতে ছিলেন। কিন্তু কোটা প্রশ্নে বিরোধ হলে তিনি ছাত্রলীগ থেকে দূরে সরে যান। ছাত্রলীগ কোটা সংস্কার আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করে। সেই থেকে শুরু হয় ছাত্রলীগারদের হাতে নুরের মার খাওয়া। আন্দোলন-কর্মসূচির একটি দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে মারের চোটে আর্তনাদ করে এক শিক্ষকের পা জড়িয়ে ধরে থাকা নুরের ছবিটি নিশ্চয়ই অনেকে ভোলেননি। তবে বেধড়ক মার খেয়েও নুরের আন্দোলন না ছাড়ার একরোখা সাহসী ভাবমূর্তি ছাত্রছাত্রীদের আকৃষ্ট করে থাকবে, যা ডাকসু নির্বাচনে তার জন্য ভোট এনে দিয়েছে। ডাকসু ভিপির মতো মর্যাদাশীল পদে থেকেও নুরের মার খাওয়া থামল না। খোদ ডাকসু অফিসে, নিজ সংগঠনের কাজে সফরে বেরিয়ে জেলার পর জেলায়, ইফতার পার্টিতেও তিনি হামলার শিকার হয়েই চলেছেন। রাজনৈতিক দল গঠনের আগ পর্যন্ত ১৯ বার ছোট-বড় হামলার হিসাব পাওয়া যায় মিডিয়ার খবর টুকিয়ে। গ্রেপ্তার হয়েছেন; ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগেও মামলা হয়েছে।

গত এক-দেড় দশকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই দুটো অস্ত্রের বহুল প্রয়োগের কারণে রাজনীতির বক্তৃতার ভাষায় 'হামলা-মামলা' শব্দবন্ধের ব্যবহার দেখা যায়। ২০১৬ সালে শীর্ষস্থানীয় এক সংবাদপত্র সম্পাদকের বিরুদ্ধে তো সারাদেশে একই অভিযোগে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ-যুবলীগের সদস্যরা অল্প কয়েক দিনের মধ্যে ৭৯টি মামলা করে এক বিচিত্র রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এমনকি 'গায়েবি মামলা' শব্দবন্ধও মিডিয়ায় ব্যবহূত হয়েছে। অপরাধের ঘটনা ছাড়া ও বর্ণিত ঘটনায় অনুপস্থিত ব্যক্তির নামে করা মামলাকে ওই শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে। বহু রাজনৈতিক কর্মীকে গায়েবি মামলায় আগাম জামিন নিতে হাইকোর্টে ছুটতে হয়েছে। তারা তখন মূলত বিএনপির লোক।

ভিপি নুরের ওপরে ২০তম হামলা হয়েছে সবেমাত্র; গত বুধবার, ১৭ নভেম্বর। এবার তার পরিচয় 'বাংলাদেশ গণঅধিকার পরিষদ'-এর সদস্য সচিব। গত ২৬ অক্টোবর এ নামে নতুন রাজনৈতিক দলটির আত্মপ্রকাশ ঘোষিত হয় রাজধানীতে আনুষ্ঠানিকভাবে। দলের আহ্বায়ক অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার পুত্র। নবগঠিত দলের এ দুই শীর্ষ নেতা সহকর্মীদের নিয়ে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকীতে টাঙ্গাইলের সন্তোষে তার সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য গেলে সেখানে এক দল যুবক তাদের ওপর হামলা চালিয়ে আহত করে। সন্দেহাতীত অভিযোগ অনুসারে হামলাকারীরা ওই স্থানের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। লাঠিসোটা, ইট-পাটকেল নিয়ে হামলা চালানো হয়। রেজা, নুর প্রমুখ পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার পেয়ে স্থান ত্যাগ করেন। ছাত্রলীগ কি এখন মারতে মারতে নুরের দলটাকে বড় বানিয়ে দেবে?

সেদিনের আক্রমণে ড. রেজার মাথায় একটা ঢিল লাগলেও নুর অক্ষত ছিলেন এবং পুলিশের গাড়িতে বসেই তিনি ফেসবুক লাইভে নাতিদীর্ঘ ভাষণ দেন। বিস্ময়কর ও অপ্রাসঙ্গিক যে, তিনি ওই ভাষণে প্রধানত ভারতকে দোষারোপ করে বিষোদ্গার করেন।

লক্ষণীয়, ২০ বার হলেও নুরের শরীরে মারগুলো মৃদু বা মোলায়েম। হাত-পা ভেঙে দেওয়া নয় যে তিনি অচল হয়ে পড়েন। এ কারণে তিনি সচল থাকায় কার লাভ, কার লোকসান সে বিষয়ে জল্পনা-কল্পনা সমাজে ও সামাজিক মিডিয়ায় বেশ সচল। এ জল্পনা বেড়ে যায় তিনি রাজনৈতিক দল গঠন করার পরে। দল ঘোষণার পরদিনই মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নামে সংগঠনের এক নেতা রেজা কিবরিয়া, নুরুল হকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক অভিযোগের কিছু ফিরিস্তি দিয়ে মামলা করার আবেদন করেন এবং থানায় একটি জিডি গ্রহণ করা হয়। গণঅধিকার পরিষদ ঘোষিত কর্মসূচি যদিও একেবারে সাদামাটা মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দলের মতো, তবু জল্পনায় কেউ বলেন, নুর জামায়াতে ইসলামীর প্রডাক্ট; কেউ বলেন, এরা ছদ্মবেশে আওয়ামী লীগের বি-টিম; নির্বাচনে কাজে লাগাবে। সরকারবিরোধী উচ্চবাচ্যের কারণে বিএনপি প্রায়ই নুরের প্রতি সংহতি দেখায়। কিন্তু নিশ্চয়ই ভয়ে আছে যে তার বিপ্লবীপনা ঝিমিয়ে পড়া বিএনপির তরুণ কর্মীদের না টান দেয়।

নুরের প্রকৃত রাজনৈতিক রং তথা তিনি নিজের টিমে খেলেন, না হায়ারে খেলেন অথবা কার কাঁঠাল নেপথ্যে কে পাকাচ্ছে, তা বুঝতে-চিনতে একটু সময় নেবে। আপাতত আমাদের সোজাসুজি প্রশ্ন- শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কার্যক্রমে হামলা কেন? এ ধরনের হামলার সাম্প্রতিক প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ২০১৮-এর নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে প্রচারেই নামতে না দেওয়া। প্রথম দিন থেকে হামলা। আর এখন তো আওয়ামী লীগ নিজেদের মধ্যেই যথেষ্ট কিলাকিলি-খুনোখুনি করছে। কেন কিলাকিলি? গণতন্ত্রকে একটু সুযোগ দেওয়া হোক না। সমকালে গতকাল প্রকাশিত খবরে দেখুন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে বলেছেন, 'যে কেউ রাজনৈতিক দল করতে পারবে, এতে বাধা দেওয়া হবে না। আমরা বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী।'

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক