গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের 'হাফ পাস' বা অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে প্রায়ই যেভাবে আন্দোলন করতে হচ্ছে, তা অভিপ্রেত ছিল না। বস্তুত আইনগত ভিত্তি না থাকলেও অর্ধেক ভাড়া শিক্ষার্থীদের অঘোষিত অধিকার। তারপরও এ অধিকার আদায়ে শিক্ষার্থীদের বারবার রাস্তায় নামতে হবে কেন? সম্প্রতি রাজধানীজুড়ে অধিকারবঞ্চিত ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আমরা দেখেছি। পরিবহন শ্রমিকদের দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন আন্দোলনরত অনেকে। বস্তুত অর্ধেক ভাড়া দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সময়ে বাসের চালক কিংবা তার সহযোগীর দ্বারা হেনস্তার শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সোমবার সমকালের প্রথম পাতায় প্রকাশ, 'হাফ ভাড়া দিতে চাওয়ায় ছাত্রীকে ধর্ষণের হুমকি।'

আমরা মনে করি, বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলতে পারে। কিন্তু যেভাবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ করা হচ্ছে; তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সপ্তাহখানেক আগেও রাজধানীর রামপুরায় অর্ধেক ভাড়া নিয়ে তর্কের এক পর্যায়ে এক ছাত্রকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। এখন দেখছি ধর্ষণের হুমকি। এমন আচরণ শুধু অবমাননাকরই নয়, ফৌজদারি অপরাধও বটে। বস্তুত চালক কিংবা সহযোগীদের দ্বারা বাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার খবরও আমরা দেখেছি। অর্ধেক ভাড়ার জন্য ছাত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার প্রতিবাদে রোববার রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ যথার্থ। এ ঘটনায় চালক ও তার সহকারীর দ্রুত গ্রেপ্তারে আমরা স্বাগত জানাই। তাদের যথাযথ বিচার যেমন প্রত্যাশিত, তেমনি শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়ার বিষয়টিও সমাধান হওয়া জরুরি।

আমরা দেখেছি, গত কয়েক দিন ধরেই শিক্ষার্থীরা অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। বিশেষ করে, ডিজেল ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় গণপরিবহনের ভাড়া যেভাবে বেড়েছে, স্বাভাবিকভাবেই তাতে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ বাড়া স্বাভাবিক। এ অবস্থায় তাদের অর্ধেক ভাড়া আরও বেশি প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো, হাফ ভাড়ার বিষয়টি অনেকটা ঐতিহাসিক মীমাংসিত বিষয় হলেও নতুন নতুন পরিস্থিতিতে কেন তাদের সড়ক অবরোধ করে তা আদায় করতে হবে? আমরা জানি, ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ৯ দফার একটি ছিল, ঢাকাসহ সারাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়ার দাবি। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতিও গণপরিবহনে শিক্ষার্থী ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের 'হাফ পাস' নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে। তাই এ বিষয়টির স্থায়ী সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

সোমবার বাসে অর্ধেক ভাড়া চালুর দাবিতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের অবরোধ শিক্ষার্থীরা দাবি মানার আশ্বাস পেয়ে তুলে নেন। এটি যেন শুধু আশ্বাসের মধ্যে না থাকে। বলাবাহুল্য, রাজধানীসহ অনেক শহরে উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থী টিউশনিসহ নানা কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালান। গণপরিবহন শিক্ষার্থীদের থেকে অর্ধেক ভাড়া গ্রহণ করলে তাদের জন্যও স্বস্তিদায়ক হয়। দেখা যায়, মহানগরীসহ শহরতলির বাস ও মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারণে ৭০ শতাংশ আসন গড় বোঝাই ধরে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। ফলে অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ আসনের ভাড়া বাকি ৭০ শতাংশ যাত্রী পরিশোধ করেন। তাই ৩০ শতাংশ আসনে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়ায় পরিবহন অস্বাভাবিক নয়। এ ক্ষেত্রে বাস মালিকদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া উচিত।

তবে আমরা মনে করি, সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারের উচিত ছাত্র ভাড়া নিয়ে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে একটি সমঝোতা করা। সাধারণ যাত্রী কিংবা ছাত্রদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বেসরকারি গণপরিবহনের সঙ্গে সরকারের চুক্তি থাকা প্রয়োজন। বিশ্বের অন্যান্য দেশে বেসরকারি গণপরিবহনের সঙ্গে সরকার যেভাবে চুক্তি করে থাকে; আমাদের দেশেও তা অনুসরণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরাও গণপরিবহন মালিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারেন। আমরা চাই, শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়ার বিষয়টির একটা স্থায়ী সমাধান হোক। তা না হলে পরিবহন শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সাংঘর্ষিক অবস্থান দূর হবে না।