খন্দকার মুনীরুজ্জামান ছিলেন একজন আদর্শিক রাজনীতিক ও সাংবাদিক। এক জীবনে কয়েকটি অধ্যায়ই তার চলছিল সমান্তরালে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বব্যাপী বাম দলগুলো পড়েছিল দ্বিমুখী সংকটে। এক. আদর্শিক, দুই. আর্থিক সংকট। প্রায় সর্বব্যাপী বিস্তৃত সংকটের এই ঢেউয়ের আঘাত লেগেছিল বাংলাদেশেও। আমাদের বাম দলগুলোতে অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী ছিলেন, যারা দলের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। সংসার-পরিবার এসবই থাকত পেছনে; দল এবং দলের আদর্শই থাকত সামনে। অন্তরে ধারণ করা এই চেতনা প্রায় সার্বক্ষণিক তাদের জাগিয়ে রাখত বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয়ে। এই তালিকাভুক্তর মধ্যে অনেকেই ছিলেন, যাদের পেশা ছিল সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতার রোজগার দিয়ে তাদের অনেকের পক্ষেই সংসার চালানো ছিল কঠিন; তবুও তারা তাদের অঙ্গীকার ভোলেননি; প্রত্যয়ের সড়ক ছাড়েননি।
খন্দকার মুনীরুজ্জামান ছিলেন তেমনই একজন। শুধু রাজনৈতিক নেতা কিংবা কর্মী হিসেবেই নয়, তিনি তার পেশার প্রতিও ছিলেন অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধ। স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকাশে যেমন তার ভূমিকা ছিল ব্যাপক, তেমনি আমাদের গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও ছিলেন সমানতালে সোচ্চার। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামেও ছিলেন লড়াকু যোদ্ধা। সিপিবি ঢাকা মহানগরের সাবেক সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামানের এক জীবনের এই অধ্যায়গুলোর বাঁকে বাঁকে রয়েছে তার কর্মের দ্যুতি। শেষ পর্যন্ত তার কাঁধে বর্তেছিল দৈনিক সংবাদের দায়িত্ব। সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে খন্দকার মুনীরুজ্জামান সেই দায়িত্বটাও পালন করে যাচ্ছিলেন নিষ্ঠার সঙ্গে একেবারে শেষ পর্যন্ত। ক্লান্তি তাকে স্পর্শ করে না সহজে- বহুবার সাক্ষাতে এর প্রমাণ পেয়েছি। এক সময় দলের পত্রিকা সাপ্তাহিক একতার অফিস তার শুধু অফিসই নয়, যেন ছিল ঘরবাড়ি।
খন্দকার মুনীরুজ্জামানের রাজনীতি আর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি সেই কবেই। ধীরে ধীরে যখন এসব ক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপরিহার্য, তখনও ছিলেন সাধারণের কাতারেই। কোনো আত্মম্ভরিতা তাকে ছুঁতে পারেনি। সব ক্ষেত্রে, সবকিছুতেই নিজেকে নিবেদন কিংবা উৎসর্গ করে দিতেন। রাজনীতি করলেও পেশার সঙ্গে এর সংমিশ্রণ ঘটাননি। তার খোলা মন, অনুসন্ধিৎসু চোখ ছিল অনেকের মধ্যে আলাদা। লেখা, বলা কিংবা কাজের ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি তার সাহস, সততা, নিষ্ঠার যে সাক্ষ্য রেখে গেছেন, তা আমাদের জন্য অনুসরণীয় হয়েই থাকবে। জীবনযোদ্ধা, কলমযোদ্ধা, বাগ্‌যোদ্ধা (টেলিভিশনের টক শোতে কথা বলতেন নির্মোহভাবে) এবং আপাদমস্তক রাজনৈতিক যোদ্ধা খন্দকার মুনীরুজ্জামানের জীবনপ্রদীপ নিভে যায় ২০২০ সালের এই দিনে।
লড়াকু খন্দকার মুনীরুজ্জামান আপস করেননি কোনো অন্যায়ের সঙ্গে। ন্যায়-নীতির প্রতি নিষ্ঠ কমরেড মুনীরুজ্জামান আজ আমাদের সামনে স্মৃতির ফ্রেমবদ্ধ হলেও বেঁচে আছেন তার কর্ম ও ত্যাগে। দলীয় আদর্শ ধারণ করেও পেশার আদর্শ তিনি লালন করে দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকে বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভীক সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হিসেবে নিজেকে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে গেছেন। আদর্শিক রাজনীতির ভেতর দিয়ে সাংবাদিকতায় আসা মুনীর ভাই বিশ্বাসের সঙ্গেই সাংবাদিকতা করেছেন। তিনি তার অগ্রজ আদর্শিক সফল সাংবাদিকদের যোগ্য উত্তরসূরি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের শ্রমিক আন্দোলন, একাত্তর পর্বে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ- এসবই তার জীবন খতিয়ানের স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়।
জানতাম, তিনি ছিলেন খুব আড্ডাবাজ ও বন্ধুবৎসল। অনুজদের কাছে ছিলেন অনুপ্রেরণার শক্তি সঞ্চারক। কয়েকবার তার বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা শুনেছি। মনে আছে, একবার সন্তোষদার (সন্তোষ গুপ্ত) লেখা অনুলিখন করছি, তখন মুনীর ভাই হঠাৎ সংবাদ অফিসে সন্তোষদার কক্ষে ঢুকে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, জীবনের অংশ হয়ে থাকবে এই কাজ। এক দিন তুমি তা লেখায় তুলে আনবে। অনেক দিন সংবাদ অফিসে গিয়ে সন্তোষদার লেখা অনুলিখন করেছি আর মাঝেমধ্যে মুনীর ভাইয়ের নিচুকণ্ঠে যৌক্তিক কথা শুনেছি। আজ মানসপটে সেসব ভেসে উঠছে। ক্ষুরধার কলমসৈনিক খন্দকার মুনীরুজ্জামানের বিশ্নেষণ ছিল মেদহীন, ঝরঝরে। যার কিছু পাওয়ার লোভ নেই তিনি তো এমনই হবেন। দেশপাগল খন্দকার মুনীরুজ্জামান ভাইকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।
লেখক ও সাংবাদিক
daba_bishnu@yahoo.com