বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে মূলত মানুষের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডে। দুনিয়াজুডে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণের সমন্বয়ে বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে। এর একটি উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য সামগ্রিকভাবে বিনষ্ট হয়। ফলে উৎপাদন, ভোগ আর অণুজীবের চক্রাকার খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে যায়। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির অপরিমাণদর্শী ব্যবহারের ফলে জলবায়ুর এ পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের সেই ভারসাম্যই সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়ে। তাই বাড়ছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা। বরফ গলছে মেরু অঞ্চলে। দ্রুত হারে বাড়ছে সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা। সাগরের নোনাজল ঢুকছে উপকূলে। বদলে যাচ্ছে বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল; বন্য হাতির চলাচলের করিডোর, ডলফিনের আবাস। আর হারিয়ে যাচ্ছে এসব প্রাণীর হরেক রকম প্রজাতি। হারিয়ে গেছে নানান ঔষধি বৃক্ষ, লতাগুল্ম। হানা দিচ্ছে নানা ধরনের ভাইরাস।
বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন একটি অসম প্রক্রিয়া। উদাহরণস্বরূপ, জলবায়ু পরিবর্তনের বড় কারণ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। বিশ্বের সব ক'টি দেশের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিজ্ঞানীদের জোট বা প্যানেল আইপিসিসির পঞ্চম প্রতিবেদন বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ঝুঁকিতে পড়বে। ২০১২ সালে প্রকাশিত ক্লাইমেট ভালনারেবিলিটি মনিটরের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বছর অতিরিক্ত ছয় লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে পড়বে।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ ছাড়াও হরেক রকম পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাব্যঞ্জক কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা দেশের পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। বন্য হাতির চলাচলের করিডোর পর্যন্ত বিনষ্ট হয়েছে। দুই হাজার হেক্টর বন ধ্বংস হয়েছে। রোহিঙ্গা শিবির এলাকার মাটি, পানি, বন ও জীববৈচিত্র্য বড় ধরনের হুমকিতে পড়েছে। বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য ভেঙে পড়ায় আর্থসামাজিক ক্ষতি আরও বাড়ছে। রোহিঙ্গা সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে বিশ্বনেতৃত্বকে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে দেখা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে উত্তরণ ও ক্ষতিপূরণ আদায়ে বাংলাদেশকে জোরালোভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করতে হবে। ২০০৮-০৯ সালে প্রণীত বাংলাদেশ জলবায়ু কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা হালনাগাদ করতে হবে জরুরিভাবে।
তাই, ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে নিজের অধিকার আদায় করে নিতে বাংলাদেশের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প ছিল না। আমরা জানি, জলবায়ু পরিবর্তনে ঐতিহাসিকভাবে উন্নত দেশগুলো দায়ী। আর উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সনদ অনুযায়ী জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলা সর্বজনীন উদ্দেশ্য ও অগ্রাধিকার হলেও দেশভেদে দায়িত্ব ভিন্ন। জলবায়ু সনদ মোতাবেক উন্নত দেশগুলোকে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি দেশের বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের উন্নত, টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও বৈষম্যহীন জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। উন্নত দেশগুলোকে এ সত্য কার্যকরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণসহ টেকসই, পরিবেশবান্ধব উন্নয়নে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে। জলবায়ু সনদ যখন ১৯৯২ সালে তৈরি হয় তখন এ মূলনীতিগুলো ছিল। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরে অনুষ্ঠিত রিও সম্মেলনের ঘোষণায়ও সেগুলো রয়েছে। পরবর্তীকালে তা দুর্বল হতে হতে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
শিল্পোন্নত দেশগুলো আগেই বিশ্বের বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ করেছে। এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে দিতে না চাইলে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমাতে হবে। শিল্পোন্নত দেশগুলো কী পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমাবে, তার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে তারা ইচ্ছামতো কার্বন নিঃসরণ নিয়ে কাজ করছে। তাই সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা রয়েই গেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রতিরোধে প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ২০৩০ সাল নাগাদ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার যে পরিমাণে কমাতে হবে, বর্তমানে বিশ্ব তার চেয়ে ১২০ শতাংশ বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পথে রয়েছে। গ্লাসগো সম্মেলনে এর রাশ টানার চেষ্টা করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বিশ্বব্যাংক জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ করে চলেছে। কভিড-১৯ মহামারিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমেছে। তবে জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ তহবিলে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রয়েই গেছে।
জাতিসংঘ জলবায়ু সনদের অধীনে ১৯৯৭ সালে করা কিয়োটো প্রটোকলে কার্বন নিঃসরণ কমাতে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ কমানোর অঙ্গীকার করেছিল। রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা ও কার্বন নিঃসরণের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে তৈরি করা ওই চুক্তির শর্ত সব দেশ পালন করেনি। পরবর্তীকালে ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশনের (এনডিসি) নামে সে বাধ্যবাধকতার শর্তটি উঠিয়ে দেওয়া হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে ঐচ্ছিকভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন মাত্রা ঠিক করা হয়েছে। যার অর্থ হলো, রাষ্ট্রগুলো জাতীয়ভাবে নির্গমন কমানোর মাত্রা নিরূপণ এবং তা পূরণে কাজ করবে। বাধ্যবাধকতার শর্ত উঠিয়ে নেওয়ার পরও দেশগুলো পর্যাপ্ত কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি গত ছয় বছরে। ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চুক্তির ১৯৭টি দেশের মধ্যে মাত্র ৯৫টি দেশ নতুন এনডিসি দাখিল করেছে। এর বেশিরভাগই উন্নয়নশীল দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ এনডিসি দাখিল করলেও লক্ষ্যে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। আবার জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো অধিকাংশ দেশ নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য বৃদ্ধি করেনি। চীন বলছে, ২০৬০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনবে। ভারত ২০৭০ সালে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিঃসরণ ৫৫ শতাংশ ও যুক্তরাজ্য ৬৮ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা পর্যাপ্ত নয়।
২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৪৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে। কিন্তু জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন রূপরেখা সনদের (ইউএনএফসিসিসি) এক সমীক্ষা বলছে, যেসব দেশ ইতোমধ্যে এনডিসি দাখিল করেছে, তাদের অঙ্গীকার অর্জিত হওয়ার পরও ২০১০ সালের তুলনায় ২০৩০ সাল নাগাদ বৈশ্বিকভাবে মাত্র ১৭ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। এমন পরিস্থিতিতে বড় রকমের ধাক্কা না দিলে ২০৫০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
আমাদের দরকষাকষির ফলে কোপেনহেগেন আর কানকুন সম্মেলনে ধনী দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে দরিদ্রদের জন্য বছরে ১০ হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি অধরাই থেকে যাচ্ছে। বাস্তবে, বিশ্বের কয়েকটি দরিদ্রতম দেশের জনগণ প্রতি বছর জলবায়ু সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় মাথাপিছু মাত্র ১ ডলারের মতো সহায়তা পাচ্ছে! যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোতে কপ২৬-এ নতুন তহবিল ঘোষণা করা হয়নি। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো একাট্টা ছিল বলে জলবায়ুতাড়িত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় কিছুটা আশাব্যঞ্জক ফল কপ২৬ সম্মেলনে পাওয়া গেছে।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের শিকার দেশগুলোর বিপন্নতার সুযোগ নিচ্ছে বিশ্বব্যাংকের মতো বহুজাতিক সংস্থা। বেসরকারি সংস্থা অক্সফ্যাম বলছে, জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রভাব মোকাবিলায় সাহায্যের বদলে দরিদ্র দেশগুলোকে কোটি কোটি ডলার ঋণ দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বে মোট শক্তি ব্যবহারের ৮১ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি। উদ্বেগজনক হারে কয়েক দশক ধরে অব্যাহতভাবে মোট জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে। একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক চুক্তি এ বিপর্যয় অনেকাংশে এড়াতে পারে। দরিদ্র দেশগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসতে পর্যাপ্ত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ আহরণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে ধ্বংস ত্বরান্বিত না করে টেকসই পথে চলা শুরু করতে হবে। উৎপাদন ব্যবস্থা টেকসই, সবুজ ও পরিবেশবান্ধব করা ছাড়া উপায় নেই। প্রাণ-প্রকৃতিবিধ্বংসী ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে মানুষ ও প্রকৃতির ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কই এখন বিশ্ববাসীর কাম্য। পৃথিবীর সর্বজনের এই আকাঙ্ক্ষার জন্য বৈশ্বিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের বিকল্প নেই। প্রত্যাশা করছি, বছরে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার জীবাশ্ম জ্বালানির পেছনে ভর্তুকি না দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের অঙ্গীকার আসবে কপ২৭ সম্মেলন থেকে। তাহলেই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগসহ জলবায়ু প্রশমন ও অভিযোজনে অর্থায়নের জোর প্রতিশ্রুতি ও পথনকশা মিলবে। জলবায়ুতাড়িত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় মিলবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন, কারিগরি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা। কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমানোর পাশাপাশি অভিযোজন করতে হবে। ধ্রুপদি গবেষণা করতে হবে। জলবায়ু অর্থায়ন বাড়াতে হবে।
হজলবায়ু সনদের অধীনে ১৩৬ উন্নয়নশীল দেশের জোট ৭৭-জাতির অন্যতম লিড নেগোশিয়েটর, কিয়োটো প্রটোকল যৌথ বাস্তবায়ন কমিটির সাবেক সভাপতি, অভিযোজন কমিটির সাবেক সদস্য
quamrul2039@gmail.com