কুমিল্লায় দিনদুপুরে যেভাবে কাউন্সিলর ও তার সহযোগীকে গুলি করে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে, তা সিনেমার চিত্রকেও যেন হার মানায়। মঙ্গলবার সমকালের প্রতিবেদনে প্রকাশ, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. সোহেল ও তার সহযোগী হরিপদ সাহাকে সোমবার বিকেলে নগরীর পাথরিয়াপাড়ায় কাউন্সিলরের কার্যালয়ে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি করে। এ ঘটনায় আরও অন্তত আটজন গুলিবিদ্ধ হন। এ অঘটন কেবল আইনশৃঙ্খলাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং আরও কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বস্তুত দেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড যেভাবে বাড়ছে, এটি তারই সাম্প্রতিক নিকৃষ্টতম নজির। আমাদের মনে আছে, ১০ বছর আগে ২০১১ সালে এভাবে দলীয় কার্যালয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন নরসিংদী পৌরসভার মেয়র লোকমান হোসেন। একইভাবে ২০১৪ সালে ফেনী শহরের একাডেমি এলাকায় প্রকাশ্যে ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হককে কুপিয়ে, গুলি করে, গাড়িসহ পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, মেয়র লোকমান হত্যার বিচার যেমন থমকে আছে; তেমনি ঝুলে আছে একরাম হত্যার বিচারও। কুমিল্লার কাউন্সিলর সোহেল ও তার সহযোগীকে হত্যার বিষয়টি একই পরিণতি বরণ করুক, তা আমরা চাই না। আমরা মনে করি, এটি একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা এবং একে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই দেখা উচিত। মঙ্গলবার সমকাল অনলাইনে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত খবরে বলা হয়েছে, কুমিল্লায় কাউন্সিল সোহেল হত্যাকাণ্ডে শাহ আলম নামে এক ব্যক্তিকে সন্দেহ করছে নিহতদের পরিবার। অভিযোগ রয়েছে, শাহ আলম একজন মাদক চোরাকারবারি। তার সঙ্গে নিহত কাউন্সিলরের বিরোধও ছিল। পুলিশের একটি সূত্রও জানিয়েছে, এ ঘটনায় শাহ আলমকে আটক করতে পারলে পুরো ঘটনার রহস্য বের করা যাবে। স্থানীয়রাও বলেছেন, কুমিল্লায় মাদক ও চোরাকারবারিদের অপরাধ কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার কারণেই তাকে 'টার্গেট' করে হত্যা করা হয়েছে। কারণ, এ কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন বলে মাদক ও চোরাকারবারিদের সঙ্গে বিরোধ হয়। আমরা মনে করি, এর বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অন্যান্য দিকও খতিয়ে দেখতে হবে। তার অন্য কোনো ব্যবসায়ী কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ খুনের ঘটনায় জড়িত কিনা তাও দেখা প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো, দুর্বৃত্তরা কীভাবে এত সহজে কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে কার্যালয়ে প্রবেশ করে কাউন্সিলর সোহেল ও তার সহযোগীর ওপর উপর্যুপরি গুলি ছুড়ে এবং অন্যদেরও আহত করে নিরাপদে চলে গেল! এত বড় একটা ঘটনার কিছুই কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগ থেকে আঁচ করতে পারেনি? কুমিল্লার ১৭ নম্বর ওয়ার্ডটি সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় এর আশপাশে মাদক ও চোরাকারবারিদের সিন্ডিকেট থাকার বিষয়টিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অজানা থাকার কথা নয়। এমনকি সেখানে মাদক-চোরাকারবারিদের সঙ্গে কাউন্সিলর সোহেলের বিরোধের বিষয়টিও তাদের জানার কথা। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে যেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক থাকা উচিত ছিল, সেভাবে তারা দায়িত্ব পালন করতে পারেনি বলেই আমাদের মনে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতা দেখে আসছি। প্রতিপক্ষের প্রার্থীকে ঘায়েলের যে অশুভ প্রতিযোগিতা আমরা দেখছি এবং একইভাবে সামাজিক বিরোধে প্রতিপক্ষের প্রতি প্রতিশোধের যে ধারা স্পষ্ট; কুমিল্লার কাউন্সিলর ও তার সহযোগীকে গুলিকে করে হত্যা তার বাইরে নয়। বস্তুত সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক যেমন আলগা হচ্ছে, তেমনি সামাজিক অনৈতিক প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে রাজনৈতিক বিরোধে সহিংসতার চিত্র। সর্বত্র সহিষুষ্ণতা ও সহনশীলতার অভাব যেমন স্পষ্ট, তেমনি আইনশৃঙ্খলার অবনতিও কম দায়ী নয়। কুমিল্লার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উত্তেজিত জনতা কর্তৃক অভিযুক্তদের বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের যে ঘটনা ঘটেছে তাও বাড়াবাড়ি এবং অগ্রহণযোগ্য। আমরা মনে করি, কুমিল্লায় কাউন্সিলর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের খুঁজে বের করে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। একই সঙ্গে ঘটনার নেপথ্যে কোনো মহল থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

বিষয় : কুমিল্লায় কাউন্সিলর হত্যা

মন্তব্য করুন