করোনা সংক্রমণের প্রায় ২০ মাস পর নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশে শনাক্তের হার নেমে আসে দেড় শতাংশের নিচে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়ন-পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে শনাক্তের হার পাঁচ শতাংশের নিচে থাকলে বা নামলে তখন তা বিক্ষিপ্ত সংক্রমণ বলে গণ্য হবে। তবে আমরা এও জানি, যদি এই হার টানা ১৪ দিন বজায় থাকে তাহলেই শুধু ধরে বা মেনে নেওয়া যায়, পরিস্থিতি সংক্রমণের নিম্ন পর্যায়ে। সেদিক থেকে আমরা এখন অপেক্ষাকৃত স্বস্তির মধ্যে থাকলেও নতুন করে অস্বস্তি ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে করোনার নতুন ধরন 'ওমিক্রন'। গোটা বিশ্বকেই নতুন করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ফেলেছে এই ধরন। বারবার রূপ বদলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া করোনার এই নতুন ধরন 'ওমিক্রন'-এর সংক্রমণ ক্ষমতা আরেক রূপ 'ডেলটা'র চেয়ে বেশি। এর সম্ভাব্য সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রস্তুতি হিসেবে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ইতোমধ্যে বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

২ ডিসেম্বর সমকালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'আফ্রিকায় ওমিক্রন শনাক্তের পর সেখান থেকে এদেশে এসেছেন ২৪০ জন।' আমি মনে করি, এ ব্যাপারে আতঙ্ক নয়, বরং তাদের পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সে কার্যক্রম শুরু করেছে। যারা এসেছেন, তাদের মধ্যে 'ওমিক্রন' তথা কভিড-১৯ দ্বারা কেউ সংক্রমিত হয়ে থাকলে তা ছড়াতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন প্রতিরোধ বিস্তারে সবরকম ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। আমাদের স্মরণে আছে, দেশে বিদেশ প্রত্যাগত বিশেষ করে ইতালি থেকে আসা সংক্রমিতদের মাধ্যমে করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। চীন ছাড়া সব দেশে তাই হয়েছে। কাজেই 'ওমিক্রন' যেসব দেশে ইতোমধ্যে শনাক্ত হয়েছে, সেসব দেশ থেকে প্রত্যাগতদের ব্যাপারে যেমন বিশেষ ব্যবস্থা সময়ক্ষেপণ না করে নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তেমনি ওইসব দেশ থেকে দেশে আসার ব্যাপারেও নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর 'ওমিক্রন' সংক্রমিত দেশে অবস্থানরত অনাবাসিক বাংলাদেশিদের আপাতত দেশে না আসার আহ্বান জানিয়েছে। তবে যারা নানা কারণে এদেশে আসতে বাধ্য হচ্ছেন (যেমন বাংলাদেশের যেসব আবাসিক নাগরিক ভিসার মেয়াদ শেষে সেসব দেশ থেকে ফিরে আসছেন বা যে সব বিদেশি নাগরিক সরকারি কাজে এদেশে আসছেন) তাদের কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা দরকার। বিশেষ করে যেসব দেশে ইতোমধ্যে 'ওমিক্রন'-এর গণসংক্রমণ (কমিউনিটি ট্রান্সমিশন) চলছে, যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা ও তার খোলা সীমান্ত-সংলগ্ন কয়েকটি প্রতিবেশী দেশ, সেখান থেকে কেউ এলে তাদের পূর্ণ মেয়াদে (১৪ দিন) প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন করা অবশ্যই প্রয়োজন।

তবে বিষয়টিকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে, ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে নয়। যাদের কথা বলা হচ্ছে, তারা সরকারি সতর্কতা জারির আগেই এসেছেন। তাদের আশ্বস্ত করেই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে, ভয়-ভীতি দেখিয়ে নয়। তাদের বাড়িতে লাল পতাকা টানিয়ে জনগণের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা অত্যন্ত অন্যায়। রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক নীতি। স্বাস্থ্য বিভাগ অবশ্যই তাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে ও জনস্বাস্থ্যের ব্যবস্থা নেবে বিদেশ থেকে আসাদের ও নিকটজনদের স্বাস্থ্যের স্বার্থেই। এমনটি অবশ্যই করতে হবে তাদের স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই।

বিশ্বব্যাপী করোনার টিকা সরবরাহের বৈষম্য এখনও বিদ্যমান। এ কারণেও করোনার নতুন ধরন তৈরি হচ্ছে। যেসব জায়গায় টিকা পৌঁছায়নি, সেখানে বাধাহীনভাবে সংক্রমণ ছড়ানোর কারণে প্রতিনিয়ত নতুন ধরন সৃষ্টি করছে এই ভাইরাস। দেশে নতুন ধরনের সংক্রমণ শনাক্ত করতে বিশেষ ধরনের আরটি-পিসিআর টেস্ট কিট ও জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে জোর দিতে হবে। দেশে আইইডিসিআর ছাড়া এ ধরনের আরটি-পিসিআর টেস্ট কিট নেই বলেই আমার ধারণা। আমি মনে করি, বড় বড় হাসপাতালে 'ওমিক্রন' ধরন শনাক্তে বিশেষ ধরনের আরটি-পিসিআর টেস্ট কিট সরবরাহ করা প্রয়োজন। এভাবে যদি আমরা নজরদারি শক্তিশালী করতে পারি, তাহলে প্রথমেই তা শনাক্ত করা যাবে এবং সেই নিরিখে নেওয়া যাবে ব্যবস্থাও।


ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টিকা মজুদ করে এরপর তৃতীয় ডোজও দেওয়া শুরু করেছে। কিন্তু এই সত্য এড়ানো যাবে না, আফ্রিকার অনেক দেশ আছে যেখানে এক শতাংশ টিকাও দেওয়া হয়নি। এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, 'ওমিক্রন' এমন সব দেশেই সৃষ্টি হয়েছে, যেসব দেশে অধিকাংশ মানুষের টিকা নিশ্চিত হয়নি। সেসব দেশ থেকেই উচ্চ আয়ের দেশে ডেলটা ও নতুন ধরনের 'ওমিক্রন' ভ্যারিয়েন্টটি ছড়িয়ে পড়েছে। বৈষম্যের নেতিবাচক ফল আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশে জীবন রক্ষাকারী দামি ওষুধের প্রযুক্তি সহায়তার মাধ্যমে উৎপাদন করে তা কম দামে উন্নয়নশীল দেশেই সরবরাহ করতে দেওয়া। কিন্তু কভিডের ক্ষেত্রে উচ্চ আয়ের দেশগুলো সেই নীতির পথ ধরে হাঁটেনি, টিকার ওপর মেধাস্বত্বের অধিকার শিথিল করেনি।

বিশ্বের অনেক দেশেই স্বাস্থ্যকর্মীদের জরুরি স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রীও সহজলভ্য নয়। তাহলে অবস্থাটা কী, তা সহজেই আমাদের কাছে অনুমেয়। যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সমগ্র বিশ্বে স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী বা অন্য চিকিৎসা উপকরণ ন্যায্য বণ্টন করে থাকে, তারাও প্রয়োজনীয় সম্পদের ঘাটতিতে করোনা মহামারি মোকাবিলায় পড়েছে সংকটে। নতুন প্রেক্ষাপটে আমাদের সংক্রমণ প্রতিরোধে সব নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস অব্যাহত রাখতে হবে। প্রত্যেক শনাক্ত রোগীকে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা রেখে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। যাদের মধ্যে কভিড-১৯-এর লক্ষণ দেখা যাবে, তাদের বিনা মূল্যে পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া দরকার। ভিড় নিয়ন্ত্রণসহ সবরকম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সচেতনতা-সতর্কতায় কোনো ভাটা যেন দেখা না যায়, তা নিশ্চিত করার দায় তো শুধু সরকারেরই নয়, সমাজ ও ব্যক্তিরও। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। কোনোভাবেই নতুন ধরনকে অবহেলা করা যাবে না।

গত ২০ মাসে নানারকম পরিস্থিতিতে পড়ে আমরা কম অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিনি। আমরা এ ব্যাপারে এখন অনেক অভিজ্ঞ। 'ওমিক্রন' নতুন ধরন। সেটিকে চিনতে ও প্রতিরোধ করতে দরকার অভিজ্ঞতা। 'ওমিক্রন' ছড়িয়ে পড়া বিলম্বিত করতে পারলে সে অভিজ্ঞতা আমরা পাব। আমরা ডেলটা সংক্রমণকে বিলম্বিত করতে পেরেছিলাম বলেই ভারতের মতো আমাদের পরিস্থিতি নাজুক হয়নি। ভারতে যখন ডেলটা ধরন ভয়াবহ আকার নিয়েছিল তখন আমরা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা যথাযথ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এ জন্য আমাদের দেশে তা আছড়ে পড়তে পারেনি। তবে 'ওমিক্রন' ডেলটা ধরনের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হওয়ায় ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি। তাই নতুন ধরন প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং তা হতে হবে বহুমুখী। ডেলটার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ওমিক্রন ঠেকাতে কার্যক্রম চালাতে হবে জোরদারভাবে। ভয় নয়, দরকার যথাযথ কার্যক্রম ও সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। সমন্বয়ের বিষয়টিও জরুরি। সমন্বিত কার্যক্রম কী সুফল দিতে পারে, এমন দৃষ্টান্ত আমাদের সামনেই আছে। নতুন প্রেক্ষাপটে আমাদের হাসপাতালসহ আনুষঙ্গিক কোনো ক্ষেত্রেই যেন ঘাটতি না থাকে, তাও নিশ্চিত করা জরুরি। বিভিন্ন উৎস থেকে টিকার চাহিদার নিরিখে সংগ্রহ প্রক্রিয়া জোরদার করা, আমাদের নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থার পথ মসৃণ করা এবং টিকাদান কর্মসূচির পরিসর ক্রমবৃদ্ধিরও বিকল্প নেই। মনে রাখা দরকার, টিকা দেওয়া মানেই কিন্তু নিরাপদ হয়ে যাওয়া নয়। কাজেই স্বাস্থ্যবিধির ব্যত্যয় ঘটানো মানে নিজেকে তো বটেই, অন্যকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া।

কীভাবে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ বন্ধ করা যায়- এ পদ্ধতি আমাদের দেশের সিংহভাগ মানুষই এখন জানে। কিন্তু মানার ক্ষেত্রে অনেকেরই রয়েছে অনাগ্রহ। আমাদের বেদনাবিধুর অভিজ্ঞতা থেকেই আগামী দিনগুলো নিরাপদ করতে সেই ব্যবস্থাই সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাসহ এ-সংক্রান্ত যেসব ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি রয়েছে, সেসব দূর করতে যেন কোনো সময়ক্ষেপণ না হয়। মনে রাখতে হবে, দুর্যোগ আবার হানা দিতে পারে। তাই প্রতিরোধমূলক সবকিছুই নিশ্চিত করতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।

করোনা বিশ্বমারি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই এর প্রতিরোধে যূথবদ্ধ প্রয়াস-আন্তরিকতার বিকল্প নেই। এর প্রতিরোধে কোনোরকম বৈষম্য জিইয়ে থাকা মানেই সবাই শঙ্কার ছায়াবৃত্ত থাকা। কোনো দেশই একা নিরাপদে থাকতে পারবে না। আমরা এখন সংক্রমণের দিক থেকে নিম্ন পর্যায়ে আছি বটে কিন্তু তাই বলে নিশ্চিন্তে বসে থাকার অবকাশ মোটেও নেই। স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যের কোনো অবকাশ নেই। নতুন বাস্তবতায় সারাবিশ্বকে একযোগে কাজ করতে পরিকল্পিত উদ্যোগ-আয়োজনেরও বিকল্প নেই।

ডা. মুশতাক হোসেন: উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর