একটি সর্বাত্মক ও রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্র ৫০ বছর অতিক্রম করছে। সংগত কারণেই '৭১-এর রণাঙ্গন পর্যায়ের একজন হিসেবে এবং পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বাপর ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর প্রেক্ষাপট এবং তাৎপর্য তুলে ধরা একান্ত জরুরি। কারণ, যে ইতিহাসের ওপর বাঙালি জনগোষ্ঠীকে পাকিস্তানের সামরিক ও ধর্মতান্ত্রিক অপশাসনে পিষ্ট হয়ে ২৩ বছর কাটাতে হয়েছে ও যে প্রেক্ষাপটে ৯ মাসের সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা লাভ করেছে, তা নবীন নাগরিকদের অবশ্যপাঠ্য।

সোমবার, ২০ অগ্রহায়ণ ১৩৭৮, অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। ঐতিহাসিক এ দিনটির প্রেক্ষাপট এ রকম- মুক্তিবাহিনীর লাগাতার আক্রমণে নভেম্বরের শুরুতেই হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনীর ভয়ে তারা প্রায় প্রতিটি রণাঙ্গন থেকে পিছিয়ে আসতে থাকে। ভারতের নজর সরাতে দেশটির পশ্চিমাংশে আকস্মিক হামলা চালায় পাকিস্তান। ফলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন- 'বাংলাদেশের যুদ্ধ আজ থেকে ভারতেরও যুদ্ধ।' ফলে গড়ে ওঠে দুই দেশের যৌথ সামরিক কমান্ড। মুক্তি ও মিত্রবাহিনী একযোগে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে শুরু করে। ঠিক সে সময় বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাসের একটি বহুল তাৎপর্যময় সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন ভারতনেত্রী। ৬ ডিসেম্বর দেশের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করলেন, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিচার-বিবেচনা করে ভারত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আরও বললেন, আমরা তড়িঘড়ি করে বা আবেগপ্রবণ হয়ে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিনি। স্বতঃস্ম্ফূর্ত গণবিদ্রোহ এবং গণমানুষের সর্বাত্মক প্রতিরোধ সংগ্রাম দেখে আমাদের বিলক্ষণ মনে হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষকে আর কখনোই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না পাকিস্তান।
শ্রীমতী গান্ধীর বক্তব্য শেষ হতে না হতেই পার্লামেন্টে উপস্থিত ভারতীয় সব জনপ্রতিনিধি এককণ্ঠে 'জয় বাংলা', 'জয় বাংলাদেশ' বলে হর্ষধ্বনি দিয়ে ওঠেন। সবাই নতুন রাষ্ট্রকে অভিনন্দিত করেন।

মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৬ ডিসেম্বর হিমালয়ের কোলঘেঁষা রাষ্ট্র ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করে। তবে ভারতের স্বীকৃতিটি ছিল সমূহ তাৎপর্যপূর্ণ। যে ভারত এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, যে ভারত মুক্তিবাহিনীকে আশ্রয় দিয়েছে; অস্ত্র-গোলাবারুদ জুগিয়ে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করেছে; এমনকি পাকিস্তান, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল প্রতিরোধের মুখেও বাংলাদেশের পাশ থেকে সরে দাঁড়ায়নি; সেই ভারতের স্বীকৃতির ব্যাপারটি ছিল ইতিহাসের বড় আশীর্বাদ। কারণ এ স্বীকৃতি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে বিশ্বমানচিত্রে অমোচনীয় কালিতে লিপিবদ্ধ করে। বাংলাদেশের এই স্বীকৃতি মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানকে এতটাই হতবিহ্বল করে যে, দেশটি ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। যদিও ১৯৬৫ সালে দুই দেশের সর্বাত্মক যুদ্ধের সময়েও পাকিস্তান এমন সিদ্ধান্ত নেয়নি। অর্থাৎ ডিসেম্বরের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহটি ছিল বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাসের অত্যন্ত তাৎপর্যময় সময়। ৩ ডিসেম্বর থেকে মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর যুগপৎ আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী প্রায় প্রতিটি রণাঙ্গনে পর্যুদস্ত হতে শুরু করে। সীমান্তের জেলাগুলো থেকে পালিয়ে তারা নিরাপদ এলাকায় আশ্রয় নিতে শুরু করে। এরই মধ্যে ভারতের স্বীকৃতির খবরটি যুদ্ধরত মুক্তিবাহিনী ও ভারত সীমান্তের রিফিউজি ক্যাম্পগুলোতে ব্যাপক আনন্দ-উল্লাসের সৃষ্টি করে। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। চারদিকে স্লোগান ওঠে- জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় ইন্দিরা গান্ধী।

বলা বাহুল্য, হিমালয় রাজ্য ভুটান ও বিশেষত বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতির তিলক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে বহুগুণ সামনে এগিয়ে দেয়। অবধারিত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। এই স্বীকৃতিতে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম অভিষেক ঘটে। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ শ্রীমতী ইন্দিরার ঐতিহাসিক ঘোষণায় আরও বলা হয়, 'বাংলাদেশের স্বীকৃতি একটি মানবিক সত্যের স্বীকৃতি মাত্র। তবে ভারতের পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত খুব ছোট বিষয় নয়।' তিনি আরও বলেন, 'বাংলাদেশের আজ বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। সূর্যোদয়কে যারা অন্ধকার ভাবে, তারা কেবলই অন্ধ মাত্র। অস্বীকৃতির দৃষ্টিহীনতা ভোরের আলোকে অস্বীকার করতে পারে না। জয় বাংলার যাত্রা শুরু হয়েছে অনেক আগে। সেই পথে আজ নতুন একটি মোড় সংযুক্ত হলো, তবে এই পথও কুসুমাস্তীর্ণ নয়।' তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে অন্তর থেকে শুভেচ্ছা জানান; বাংলাদেশের গণমানুষ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দিত করেন।


শ্রীমতী ইন্দিরা এই আস্থাও প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে ভারত ও বাংলাদেশ পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধা, নিজেদের সার্বভৌমত্ব, একে অপরের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা ও ভূখণ্ডগত অধিকার সংরক্ষণের এমন নীতি অবলম্বন করবে, যাতে দুই দেশের মানুষ উপকৃত হয়। ভারতের স্বীকৃতিকে তাৎক্ষণিক স্বাগত জানান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তারা লিখিতভাবে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর ভারত সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দুই দেশের কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের সেই ঐতিহাসিক ভিত্তি, অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর সে কারণেই বাংলাদেশ ও ভারতের 'মৈত্রী দিবস', যা অমোচনীয় কালিতে লেখা। মোটকথা, ৬ ডিসেম্বরের পর থেকে বাংলাদেশ সুনিশ্চিত বিজয়ের পথে যাত্রা করে। যৌথ বাহিনী একের পর এক অঞ্চল দখল করে পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে থাকে। নরসিংদী দখল করে যৌথ বাহিনীর একটি দল ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থান নেয়। অন্য দলগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া-নরসিংদী এবং কালিয়াকৈর-জয়দেবপুর দখল করে রাজধানীর উপকণ্ঠে হাজির হয়। টাঙ্গাইলের মাটিতে মুক্তিবাহিনী পুরো জেলা দখলে রেখে ভারতীয় ছত্রীসেনাদের ঢাকার পথে যাত্রার পথ সুগম করে।

এ সময়ে ঢাকায় পরিপূর্ণভাবে অবরুদ্ধ হয় পাকিস্তানি বাহিনী। মিত্রবাহিনীর যুগপৎ আক্রমণে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রতিটি যুদ্ধবিমান ওড়ার ক্ষমতা হারায়। আত্মসমর্পণ ছাড়া পাকিস্তানি বাহিনীর আর কোনো পথ খোলা থাকে না। ঠিক এ সময়ে দিল্লিস্থ মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতির আরজি পৌঁছে জেনারেল মানেকশর কাছে। কিন্তু ভারত যুদ্ধবিরতি মানেনি। বরং সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছে- যুদ্ধবিরতির কোনো কৌশল নয়; হতে হবে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ, অবিলম্বে এবং সে আত্মসমর্পণ হতে হবে প্রকাশ্যে, যাতে সবাই দেখতে পায়।

অর্থাৎ নিরুপায় পাকিস্তানি সেনানায়ক জে. নিয়াজি তখন সর্বতোভাবেই নতজানু। এ সময় আরও একটি ঘটনা ঘটে। আমেরিকার দূতিয়ালিতে জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পেশ করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই- নিশ্চিত পরাজয় থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করা। কিন্তু সেদিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন সে প্রস্তাবে ভেটো দিয়ে তা অকেজো করে দেয়। সব চেষ্টা বিফলে গেলে উপায়হীন হয়ে পড়ে পাকিস্তান। এর পর আসে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী নতজানু হয় সেই রমনার উদ্যানেই; যেখান থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিকে সর্বাত্মক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে ডাক দিয়েছিলেন। ৯৩ হাজার হানাদার সৈন্য নিয়ে মুক্ত ঢাকায় হাজার হাজার মানুষের আকাশ ফাটানো 'জয় বাংলা' ধ্বনির মধ্যে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করলেন জেনারেল নিয়াজি যৌথ বাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে। হাজারো বাঙালি জে. অরোরা এবং মিত্রবাহিনীর সদস্যদের জড়িয়ে ধরলেন। এই আত্মসমর্পণটি ছিল পৃথিবীর একমাত্র প্রকাশ্য আত্মসমর্পণ, যা ঠেকাতে চেয়েও ব্যর্থ হয় পাকিস্তান। বুড়িগঙ্গার পানিতে তখন দিনের সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সেই রমনা ময়দানে পূর্ববাংলার এক ইতিহাস শেষ হয়ে আরেক ইতিহাস শুরু হচ্ছে।

ডিসেম্বর ২২, ১৯৭১। মুজিবনগর থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত করা হলো রাজধানী। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা স্বদেশে ফিরলেন। মুজিবনগর থেকে পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানীতে রূপান্তরিত হলো। ঢাকা নগরী তখন উল্লাসমুখর। অপেক্ষমাণ হাজার হাজার মানুষ 'জয় বাংলা' 'জয় বঙ্গবন্ধু' ধ্বনিতে ফেটে পড়ল। দীর্ঘ ৯ মাস পর ঢাকা নগরী এক নির্ভয় প্রাণে উদ্দীপিত হয়ে উঠল। হাজার হাজার মানুষ মুক্তি ও মিত্রবাহিনীকে বীরোচিত সংবর্ধনা জানাল। সর্বত্র জয় বাংলা, জয় ইন্দিরা ধ্বনি উঠল। এপ্রিলের এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দুপুরে মেহেরপুরের আম্র্রকুঞ্জে স্বাধীনতার যে তামস-তপস্যা শুরু হয়েছিল, ডিসেম্বরের সূর্যকরোজ্জ্বল অপরাহেপ্ত বুড়িগঙ্গার তীরে সে মুক্তিযজ্ঞের শেষ আহূতি পড়ল। স্থায়ী হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। এর পর দ্রুত আসতে থাকল বিশ্ব-স্বীকৃতি। প্রথমে পূর্ব জার্মানি, পোল্যান্ড; এর পর বুলগেরিয়া, বার্মা, নেপাল, বার্বাডোস, যুগোশ্নাভিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চেকোশ্নোভাকিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ বহু দেশ।

ইতিহাসের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে সিক্ত বাংলাদেশ আজ ৫০ বছর পেরিয়েছে। সাফল্য-ব্যর্থতার সিঁড়ি বেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা মুক্তিবাহিনীর সদস্য, তারা নিশ্চয় একদিন থাকব না। কিন্তু প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ থাকবে; থাকবে জাতীয় স্বাধীনতার রক্তরঞ্জিত ইতিহাস। জয় বাংলা।

হারুন হাবীব :মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক