নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই নভেম্বরে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীর প্রাণহানির খবরে আমরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হলেও বিস্মিত নই। বস্তুত আমাদের জাতীয় জীবনে সড়ক দুর্ঘটনার সংকট কতটা গভীর, এ পরিসংখ্যান তারই প্রমাণ। রোববার সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে 'রোড সেফটি ফাউন্ডেশন' সূত্রে প্রকাশ, কেবল নভেম্বরেই সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৫৪ শিক্ষার্থীসহ চার শতাধিক প্রাণ হারিয়েছে।

আমরা দেখেছি, জ্বালানি তেলের সঙ্গে বাস ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় গত ১৮ নভেম্বর 'হাফ পাস' দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে ২৪ নভেম্বর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আবর্জনার গাড়ির চাপায় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানের প্রাণহানির ফলে শিক্ষার্থীদের হাফ পাসের আন্দোলন নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে রূপ নেয়। এর পর ২৯ নভেম্বর রাজধানীর রামপুরায় বাসচাপায় আরেক শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে নিরাপদ সড়কের আন্দোলন আরও বেগবান হয়।

ইতোমধ্যে রাজধানীসহ সব মহানগরে বাসে অর্ধেক ভাড়ার দাবি মেনে নেওয়া হলেও সড়ক নিরাপদ করতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। সড়কে অনিয়মের বিরুদ্ধে লাল কার্ড প্রদর্শনসহ অহিংস আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের দাবি অস্বীকারের উপায় নেই। নভেম্বরের এক মাসের প্রাণহানির ঘটনাতেই স্পষ্ট, দেশের সড়কগুলো কতটা দুর্ঘটনাপ্রবণ। সড়কে মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। এটা স্বতঃসিদ্ধ- সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বিশৃঙ্খলা। আর এ শৃঙ্খলা ফেরাতেই শিক্ষার্থীরা ৯ দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন। তারা সড়কে মৃত্যুর মামলার বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত করার কথা যেমন বলছেন, তেমনি হতাহতের ঘটনায় ক্ষতিপূরণেরও দাবি তুলেছেন। চলাচলের জন্য ফুটপাত, ফুট ওভারব্রিজ সর্বত্র নেই। পরিকল্পিত বাস 'স্টপেজ' ও পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও নেই। চালকদের প্রশিক্ষণ ও গাড়ির ফিটনেসের অভাবও প্রকট। তা ছাড়া ট্রাফিক নিয়ম পাঠ্যসূচিতে ঠিকভাবে থাকলে এ ব্যাপারে জনসচেতনতাও বাড়ত। নিরাপদ সড়কের স্বার্থেই শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে আমরা বহুলাংশে একমত। বস্তুত এগুলোর জন্য আইন কিংবা সরকারের নির্দেশনা আছে। তারপরও সেসব বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন? জেল-জরিমানা বাড়িয়ে সড়ক পরিবহন আইন করা হলেও বাস্তবায়নে সরকারের জোর না থাকা দুঃখজনক। আমরা দেখেছি, প্রায় আট বছর ঝুলে থাকা ওই আইনটি ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর পাস হলেও পরিবহন নেতাদের দাবি মেনে সেটি শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ১২৬টি ধারার মধ্যে ২৯টি ধারাই সংশোধনের খসড়া প্রস্তুত করেছে।

প্রশ্ন হলো, আইনের উদ্দেশ্য যদি নিরাপদ সড়ক হয় তবে কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে সেখানে ছাড় দেওয়া কতটা যৌক্তিক? তার চেয়ে বড় বিষয়, নিরাপদ সড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিবহন মালিকরা নিজেরাই যদি সচেষ্ট না হন, তবে সড়ক নিরাপদ হবে কীভাবে? সমকাল অনলাইনের খবর অনুযায়ী, রোববার শিক্ষার্থীরা রাজধানীতে প্রতীকী লাশ নিয়ে মিছিল করেছেন। তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে- 'আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে?' সহপাঠীর মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই তাদের যেমন ক্ষুব্ধ করেছে, তেমনি করেছে শোকাহত। বিশেষ করে তাদের আন্দোলনের মধ্যেই নভেম্বরে সড়কে প্রাণহানির পরিসংখ্যানটি আমাদের দেখিয়েছে, সড়কের ব্যাপারে আমাদের উদাসীনতার ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে! সড়কের প্রাণহানির ক্ষেত্রে বহুপক্ষের দায় অস্বীকারের উপায় নেই। গাড়িচালক, যানবাহনের ফিটনেস, সড়কের অবস্থা, যাত্রীর অসচেতনতা; সর্বোপরি প্রশাসনের দায়ও রয়েছে। সব পক্ষ দায়িত্বশীল হলে এবং আইন প্রয়োগে প্রশাসন কঠোর হলে সড়ক দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমতে পারে। জাতীয় স্বার্থেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সমর্থন করা এবং সে দাবি মেনে নেওয়ার মানসিকতা প্রশাসনের থাকা দরকার। শিক্ষার্থীরা কেন পড়াশোনা ছেড়ে বারবার সড়কে নামতে বাধ্য হচ্ছেন- তাও আমাদের বুঝতে হবে। আমরা চাই, দুই সপ্তাহেরও অধিককাল চলা শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনের ইতিবাচক সমাপ্তি হোক। সে জন্য সরকারের উদ্যোগের তাগিদও আমরা দিয়ে আসছি।

আমরা প্রত্যাশা করি, কেবল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় যাওয়াই নয় বরং প্রকৃত অর্থেই সড়ককে নিরাপদ করতে প্রশাসনের সদিচ্ছা জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনা যেভাবে মহামারি আকার ধারণ করেছে তাতে কেউ নিরাপদ নয়। নিরাপদ সড়কের জন্য স্বল্প মেয়াদে ব্যবস্থার চাইতে আমরা একটি স্থায়ী পদক্ষেপের কথা বলছি। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে পদ্ধতিগত সংস্কার করে হলেও নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।