করোনায় চাকরির পরীক্ষা অনেক দিন বন্ধ ছিল। এখন চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হচ্ছে। এতে চাকরিপ্রার্থীদের মনে আশার সঞ্চার হচ্ছে। কারণ কভিড-১৯ মহামারিতে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল, যা ছিল কালো মেঘের মতো। এখন আস্তে আস্তে হতাশার কালো মেঘ পরিস্কার হতে যাচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ পরীক্ষা ঢাকায় হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। যেমন পরীক্ষার্থীদের আর্থিক কষ্ট, ভোগান্তি, সময় নষ্ট, হয়রানি ইত্যাদি। এখন দাবি হচ্ছে, পরীক্ষার্থীদের হয়রানি বন্ধ করা। এর জন্য সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরির পরীক্ষা বিভাগীয় শহরে হওয়া উচিত; যা বাস্তবে কার্যকর হলে চাকরি পরীক্ষার্থীদের হয়রানি বন্ধ হবে। কার্যত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পরীক্ষার্থীদের বিপক্ষে যাচ্ছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যেমন একদিনে অনেক প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা হওয়া, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
প্রতিদিন রাস্তায় যে সংখ্যক সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে, তাতে বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে পরীক্ষা দেওয়া এক ধরনের জীবনের ঝুঁকিতে পড়তে হয়। অনেক পরীক্ষার্থী রাস্তায় তীব্র যানজটের কারণে সঠিক সময়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। সম্প্রতি লঞ্চ পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় শতাধিক বিসিএস পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি; যা খুবই দুঃখজনক। ফলে এ বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। চাকরির পরীক্ষা বিভাগীয় শহরে হওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে, যা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। আমিও এই দাবির সঙ্গে একমত।
চাকরিতে আবেদন করতে পরীক্ষার্থীদের ব্যাংক ড্রাফট করতে এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে যাতায়াতের জন্য টাকার প্রয়োজন হয়। পড়াশোনা শেষে অভিভাবকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া অনেক কষ্টের, যা তাদের মানসিক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই পরীক্ষার্থীদের এসব ভোগান্তি হ্রাস করা একান্ত জরুরি।
বরাবরের মতো ৪৩তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা এবারও দেশের আট বিভাগীয় শহরে সফল ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ২৯ অক্টোবর। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় কেন্দ্রে দেশের সবচেয়ে বড় চাকরির পরীক্ষার কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
এ ছাড়া প্রথমবারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা আটটি বিভাগীয় শহরে অনুষ্ঠিত হয়; যা সবার কাছে প্রশংসা পেয়েছে। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের কারণেই দেশের বিভাগীয় শহরে ভর্তি পরীক্ষা নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইতোমধ্যে দেশসেরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আট বিভাগীয় শহরে নেওয়া এই ভর্তি পরীক্ষা সফল ও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। ঘটেনি কোনো জালিয়াতি ও অপ্রীতিকর ঘটনা। ফলে নতুন করে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে চাকরির পরীক্ষা বিভাগীয় শহরে নেওয়ার বিষয়টি। এভাবে সব চাকরির পরীক্ষা যদি বিভাগীয় শহরে অনুষ্ঠিত হয় এবং কর্তৃপক্ষ যদি এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তা হবে চাকরি প্রত্যাশীদের জন্য সেরা সিদ্ধান্ত।
বিভাগীয় শহরে পরীক্ষা নিতে চাকরিপ্রার্থীরা বিভিন্ন সময় মানববন্ধন, মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। কিন্তু এখনও সেই দাবি আদায় হয়নি। সম্প্রতি দেশব্যাপী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এ দাবি অনেক গুরুত্ব পাচ্ছে। চাকরির পরীক্ষা বিভাগীয় শহরে নেওয়া সময়ের দাবি। এটা খুবই যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করি।
বেকার বলতে শ্রমশক্তির সেই অংশকে বুঝানো হয়, যারা একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চেষ্টা করা সত্ত্বেও কোনো কাজ পায় না। একজন বেকার ব্যক্তিকে চাকরির সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। চাকরিপ্রার্থী অনেকেই তার নিজস্ব গ্রাম বা জেলা শহর কিংবা বিভাগীয় শহর ছেড়ে রাজধানীতে আসে কেবল একটি চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য। কখনও প্রতি সপ্তাহে চাকরির পরীক্ষা থাকে, আবার কখনও দুই সপ্তাহে বা মাসে একবার থাকে। যখন বেকার ব্যক্তিরা নিজেদের হাত খরচের টাকা জোগাড় করতে কষ্ট হয়, সেখানে প্রতি সপ্তাহে বা মাসে ঢাকায় আসা-যাওয়া ও ঢাকায় থাকার খরচ বহন করা তাদের কাছে যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। ঢাকায় পরীক্ষা দেওয়া যেমন আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়, তেমনি যাতায়াতের সমস্যা ও নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই লক্ষণীয়। যদিও বিভাগীয় শহরে পরীক্ষা হলে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের আশঙ্কা থাকে। কিন্তু বিসিএস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা প্রমাণ করে যে, কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে এসব আশঙ্কা সহজেই মোকাবিলা বা রোধ করা সম্ভব। বিভাগীয় শহরে পরীক্ষা নিলে এ সমস্যা কোনো সমস্যাই নয়। তবুও কর্তৃপক্ষকে একটু বাড়তি নজরদারি এবং মনিটরিং ব্যবস্থার জোরদার করতে হবে।
পরীক্ষা বিভাগীয় শহরে হলে চাকরি আবেদনকারীদের আর্থিক কষ্ট লাঘব, ভোগান্তি দূর, সময় সাশ্রয় ও হয়রানি বন্ধ করা সম্ভব হবে। তাই সরকারকে এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে পরীক্ষার্থীরা হয়রানিমুক্ত পরীক্ষা দিতে পারে।
মো. শফিকুল ইসলাম :সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ