বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক হজরত ইমাম গাজ্জালী (র.) বলেছিলেন- মানবজীবনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে মুখের ভাষাকে আয়ত্তে রাখতে সমর্থ হওয়া। এ কথাটি সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যত না প্রযোজ্য, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রযোজ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদদের বেলায়। কারণ রাজনীতিবিদরা সবসময় জনগণের এবং জনমানসের রাডারের নিচে অবস্থান করেন। তাদের প্রতিটা কাজ, প্রতিটা কথা সেই রাডারে ধরা পড়ে, আর মানুষ তা পর্যবেক্ষণ করে। তাই রাজনীতিবিদদের তাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে যে অন্যদের চেয়ে বেশি সচেতন আর যত্নশীল হওয়া আবশ্যক- এ কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের দিকে তাকালে মনে হয়, আমাদের রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক ভাষার ব্যাপারটি নিয়ে মাথা ঘামাতে আদৌ আগ্রহী নন।
গত কয়েক দিন ধরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানের যেসব 'বাণী' সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'ভাইরাল' হয়ে চলছে, তা যেন অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছ। একটি ভার্চুয়াল সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং তার নাতনি জাইমা রহমানকে নিয়ে এমন সব শব্দ ব্যবহার করেছেন, যাকে কোনো অবস্থাতেই ভদ্রজনোচিত বলা চলে না। প্রথমে ভেবেছিলাম, এটা হয়তো তার বিরোধীপক্ষের কোনো ডিজিটাল কারসাজি। পরে দেখা গেল, তিনি তার বক্তব্যকে ডিফেন্ডই করছেন!
প্রতিমন্ত্রী অবশ্য ওই বক্তব্যে নিজের পরিবারের আভিজাত্য প্রকাশ করতে ভুল করেননি। স্বীকার করি, তার পরিবারের আভিজাত্যের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। তার বাবা ছিলেন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী বিচারপতি এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। তিনি তার বক্তব্যে নিজ সন্তানদেরও রাজপুত্র আর রাজকন্যা বলে সম্বোধন করেছেন। এই আধা সামন্ততান্ত্রিক- আধা পুঁজিবাদী সমাজে সব বাবা-মা-ই তাদের সন্তানদের রাজপুত্র-রাজকন্যা হিসেবে কল্পনা করবেন- এতেও দোষের কিছু দেখি না। কিন্তু নিজের কন্যার বয়সী আরেকজনকে যেভাবে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করেছেন, তাতে তার নিজের বিকৃত রুচির পরিচয়ই স্পষ্ট হয়েছে।
ইতোমধ্যে তার এ বক্তব্য নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নিন্দা এবং সমালোচনার ঝড় উঠেছে। নারীপক্ষসহ বিভিন্ন সংগঠন এর নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু এসবের ফলে প্রতিমন্ত্রী যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। সামাজিক মাধ্যম থেকে জানা যায়, তার প্রথম বক্তব্যের সমালোচনা করায় তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় নারীনেত্রীদের বিরুদ্ধে ক্ষেপেছেন। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রতি ইঙ্গিত করে অশালীন কথা বলতে ছাড়েননি। এরই মাঝে তিনি আরও একটা কাজ করেছেন- দেশের একজন সুপরিচিত অভিনেত্রীকে টেলিফোনে হুমকি দিয়েছেন এই বলে- প্রয়োজনে পুলিশ, র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা পাঠিয়ে তুলে নিয়ে আসবেন। এখানেও তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা প্রকাশের অযোগ্য।


একজন সাংসদ এবং প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদার একজন মানুষের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ কেউ আশা করেনি। তার কথা ও ভাষা সব ধরনের ভব্যতা এবং শিষ্টাচার অতিক্রম করে গেছে। কোনো সভ্য দেশে এ ধরনের আচরণ আশা করা যায় না। রাজনীতিতে বিরোধ থাকবে, সমালোচনা থাকবে, রেষারেষিও থাকবে। এই দ্বন্দ্ব আর সমালোচনাই রাজনীতির সৌন্দর্য। কিন্তু প্রতিমন্ত্রী যা করলেন বা করছেন, তার ব্যাখ্যা তো প্রচলিত রাজনীতিতে নেই। এ যেন রাজনীতিকের মুখে দুর্বৃত্তের ভাষা!
কেন এমন হলো? এ কি তার ব্যক্তিগত বিষয়- যেমনটি বলেছেন সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক? নাকি এর পেছনে আর কোনো কারণ আছে? এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার আগে আমাদের চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে একবার দৃষ্টি ফেরানো দরকার বলে মনে করি। সুযোগ পেলেই এক দলের নেতাকর্মীরা অন্য দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংবেদনশীল ভাষা ব্যবহার করে আসছেন। নিকট অতীতে জাতীয় সংসদে পর্যন্ত এরূপ আচরণ লক্ষ্য করা গেছে। এ ধরনের কথাবার্তা যে দেশে গণতন্ত্রের বিকাশে এক প্রচণ্ড বাধা- তা অনেকেই বুঝতে পারেন না।
প্রতিমন্ত্রী যা বলেছেন বা বলছেন, তা যদি ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে মানতেই হবে যে তিনি মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত। তার চিকিৎসা দরকার। সে ক্ষেত্রে তিনি আর রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকতে পারেন না। আর যদি এটি রাজনৈতিক হয়ে থাকে, তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে- কেন?
অনেকেই অবশ্য মনে করছেন, ডা. মুরাদ সরকারি দল আওয়ামী লীগের 'ইস্যু দিয়ে ইস্যু ঢাকা'র পুরোনো পলিসির শিকার হতে যাচ্ছেন। এ কথা সবাই জানেন যে, গত কিছুদিন ধরেই সরকার বিভিন্নমুখী চাপে রয়েছে। একদিকে তেল-গ্যাসসহ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিভিন্ন ইস্যুতে ছাত্রদের আন্দোলন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অসুস্থতা, অন্যদিকে ইউপি নির্বাচনে নিজ দলের কোন্দল আর ভরাডুবি। এসব সামাল দিতে সরকার নতুন আরেকটা ইস্যু খুঁজছে। সেই ক্ষেত্রে ডা. মুরাদকে দিয়ে এক নতুন ইস্যুর জন্ম দেওয়া হচ্ছে। কারণ, অসংলগ্ন কথা বলায় তিনি বরাবরই পারঙ্গম।
আমরা যা-ই বলি না কেন, এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, রাজনীতিকে যে রাজনীতির ভাষা দিয়েই মোকাবিলা করতে হয়- এ বিষয়টিই যেন বাংলাদেশ থেকে উঠে যাচ্ছে। পরিবর্তে লাঠি, হেলমেট এসবই হয়ে উঠছে রাজনীতির হাতিয়ার। সেই সঙ্গে যোগ হচ্ছে খিস্তিখেউড়। তাই প্রতিমন্ত্রী যা করেছেন, তাতে অবাক হওয়ার হয়তো কিছু নেই। তারপরও কথা থেকে যায়। প্রশ্ন জাগে- তিনি যে কাজটি করেছেন, তার প্রতিক্রিয়াটা কি তার বোধে এসেছে? তিনি কি ভাবতে পারছেন, তার এই ভাষা ব্যবহারের ফলে তার পিতা, যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক, তাকেও তিনি ছোট করে ফেলেছেন? তিনি কি ভুলে গেছেন, আমাদের এই দেশে সন্তানের আচরণ দিয়ে বাবা-মাকে মূল্যায়ন করা হয়? তিনি কি ভাবতে পারছেন, তার এই ভাষা ব্যবহারের ফলে তার নিজের স্ত্রী এবং কন্যাটি কতটুকু বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন? তিনি কি এও ভেবেছেন, তার ব্যবহূত ভাষার কারণে তার দলের ইমেজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে? সর্বোপরি তিনি নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হয়ে গোটা মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মকে কত অতলে নিয়ে গেছেন? আমার দৃঢ় বিশ্বাস- তিনি তা বুঝতে পারেননি। পারলে এমন ভাষা তিনি কিছুতেই ব্যবহার করতে পারতেন না।
আমাদের সবারই মনে রাখা দরকার, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেই ভিন্ন দলের নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে খিস্তিখেউড় করতে হবে- এটা কখনোই কোনো আদর্শ রাজনীতিবিদের কাজ হতে পারে না। প্রতিমন্ত্রী যা করেছেন, তার জন্য কোনো সভ্য দেশ হলে তার বিরুদ্ধে দেওয়ানি এবং ফৌজদারি উভয় আদালতেই মামলা হতো। আমাদের দেশে অন্তত এতটুকু আশা করতে পারি যে, অবিলম্বে এই প্রতিমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।
মোশতাক আহমেদ:জাতিসংঘের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কলাম লেখক