অমুক ভাইয়ের চরিত্র, ফুলের মতো পবিত্র- এ জাতীয় স্লোগান আমাদের রাজনীতিতে খুবই জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহূত। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সর্বক্ষেত্রে প্রার্থীর চরিত্র নিয়ে সমর্থকদের উচ্চকণ্ঠের আওয়াজে মুখরিত থাকে নির্বাচনী এলাকা। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আবেগকে কাজে লাগাতে প্রার্থীরা ধর্মীয় পোশাক পরা ছবি তাদের পোস্টার, ব্যানার ও অন্যান্য মাধ্যমে ব্যবহার করেন। প্রার্থীদের চারিত্রিক গুণাবলি নিয়ে কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি প্রার্থীরাও ব্যস্ত থাকেন। প্রার্থীদের লক্ষ্য থাকে কীভাবে কে কার চেয়ে কত বেশি সৎ, ধার্মিক, সেবক ও জনদরদি তা প্রমাণ করা। নির্বাচন এলেই তাদের এমন চেষ্টা নতুন কিছু না হলেও কৌশলে নতুনত্ব থাকে। এভাবেই আমরা যুগের পর যুগ তাদের সত্য-মিথ্যার দাবিতে বিভ্রান্ত হচ্ছি। দলীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। কেননা, এখানে দলের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থকদের প্রশ্নহীন সমর্থন দিতে হয়। ফলে তাদের চারিত্রিক গুণাবলি যাই থাকুক, দলীয় আদর্শের কাছে তা ম্রিয়মাণ।
জাতীয় নির্বাচনের সময় দেখা যায়, কেবল নির্বাচনী নিয়ম মানার জন্য অনেকে তাদের দীর্ঘ দিনের খেলাপি ঋণ নবায়ন করেন। এটা যে কেবল প্রার্থী হওয়ার জন্য, তা বলা বাহুল্য। একই চিত্র অন্যান্য নির্বাচনেও দেখা যায়। যারা দেশের নীতিনির্ধারক বা জনগণের সেবক হবেন, তাদের মনোভাব যদি এমন হয়, তাহলে তাদের দিয়ে দেশের উপকার হওয়ার সম্ভাবনা কতটা থাকে তা ভাবনার বিষয়। কেবল ঋণখেলাপি নয়, বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত, সন্দেহভাজন বা আটক ব্যক্তিরা তথ্য গোপন করে নির্বাচনে প্রার্থী হন। চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এ রকম অনেকেই প্রার্থী হয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদমতে, অনেক প্রার্থীর বিরুদ্ধে অনৈতিক ও অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে, মামলা আছে; এমনকি জেলে থেকে বা জামিনে বের হয়ে প্রার্থী হয়েছেন এমনও আছে। আবার অনেক 'মৌসুমি' প্রার্থী আছেন, যারা কেবল নির্বাচনের সময় শহর বা বিদেশ থেকে হাজির হন। অর্থ বা প্রভাবের মাধ্যমে প্রার্থিতা নিয়ে নেন বলে শোনা যায়। সাধারণ মানুষ বা কর্মীদের সম্পর্কহীন প্রার্থীরা জয়ী হলেও জনসেবার কাজ কতটা করতে পারেন, তা বিবেচনা করা দরকার। যাদের বিষয়ে মানুষের নেতিবাচক মনোভাব বা আইনি অভিযোগ আছে, যারা জনবিচ্ছিন্ন; তাদের বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার। কেবল দলের প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করাই যদি লক্ষ্য থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ব্যক্তিদের উপস্থিতি বাড়তেই থাকবে। ফলে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গা দুর্বল হবে; মানুষ সেবা থেকে আরও বেশি বঞ্চিত হবে এবং রাজনীতিতে অপরাধী ও অরাজনীতিকদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী নির্বাচনে প্রার্থীর অন্যান্য দিকের সঙ্গে তাদের নৈতিক চরিত্র, অভিযোগ, স্থানীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার বিষয় বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনের মতো অত্যন্ত ঘৃণ্য ও স্পর্শকাতর অভিযোগ আছে, তাদের মনোনয়ন না দেওয়ার নৈতিক সিদ্ধান্ত থাকা দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর এ বিষয়ে মতৈক্য থাকার কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচনে অর্থ ও পেশিশক্তি বেড়েই চলেছে, যা আমাদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ- তা দলগুলোকে উপলব্ধি করতেই হবে। কেবল সাময়িক বিজয় দিয়ে ভবিষ্যতের পথকে কলুষিত, বিতর্কিত ও বিবর্জিত করা মোটেই যৌক্তিক নয় বলে মনে করি। নির্বাচন কমিশনও এ রকম বিষয়ে আরও জোরালো ভূমিকা নিতে পারে। প্রয়োজনে বিদ্যমান নির্বাচনী আইনের সংস্কার করা যেতে পারে। পাশাপাশি, নির্বাচনের নূ্যনতম এক বছর আগে যাদের খেলাপি ঋণ থাকে, তাদেরও অযোগ্য বিবেচনার বিধান করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। সাধারণ মানুষ সব সময় নির্বাচনের পক্ষে এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সঠিক প্রার্থীকে বাছাই করার অধিকার রাখে। রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের আবেগ-অনুভূতি ও অধিকারের বিষয় উপলব্ধি করা। কেবল এর মাধ্যমেই আমরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা করে প্রকৃত জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারি।
আবুল কাশেম উজ্জ্বল :শিক্ষক, শাবিপ্রবি, সিলেট