করোনাক্রান্ত হয়ে পত্রপত্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় নেই বললেই চলে। তবু অভ্যাসের কারণে মাঝেমধ্যে কাগজে চোখ বুলাতে হয় এবং অনেক সংবাদে নৈরাশ্য মনকে বিবশ করে। আনন্দ যে একেবারে নেই, এমনটাও বলা যায় না। সম্প্রতি একটি দৈনিকে প্রকাশিত দুটি সম্পাদকীয়-পরবর্তী নিবন্ধ মনোযোগ দিয়ে পড়েছি, উপলব্ধি করার চেষ্টা করছি। একটি বস্তুনিষ্ঠ লেখা 'রাজনীতির এক ভুলে হয়ে যায় সর্বনাশ'-এ নিবন্ধকার যথার্থই নির্দেশ করেছেন 'বঙ্গবন্ধু একটা জীবন কাটিয়ে দিলেন মোশতাকের মতো নষ্ট, ভণ্ডকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে, তাকে পাশে রেখে।' মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সরকারে থেকেও নানাভাবে মোশতাক পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করে প্রবাসী সরকার ও মুক্তিসংগ্রামকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করেছেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও যথোচিত ব্যবস্থা নেওয়ায় মোশতাকের দুরভিসন্ধি ফলপ্রসূ হয়নি। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু যেসব সামরিক কর্মকর্তার ওপর আস্থা রেখেছিলেন, তাদের অনেকে জাতির পিতার আপৎকালে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারেননি কিংবা করেননি। সুবিধাভোগীরা এখন নিজেদের সাফাই গাইছেন- যা স্বাভাবিক।
১৯৭৩-এ জাতীয় সংসদের নির্বাচন প্রায় সুষ্ঠুভাবে হলেও চাঁদের কলঙ্কের মতো কয়েকটি আসনের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। অবশ্য আওয়ামী লীগের ঘোরতর শত্রুও এমন আসনের সংখ্যা ১৫-২০টির বেশি চিহ্নিত করতে পারেননি। ৩০০ আসনের মধ্যে ৫০-৬০টি আসন ভিন্ন মতাবলম্বীরা পেলে এমন কী মহাভারত অশুদ্ধ হতো? কিন্তু কেউ যদি নিজের যোগ্যতা-জনপ্রিয়তা অথবা আদর্শিক কারণে নির্বাচিত হতে না পারে, সে দোষ তো বিজয়ী দলের ওপর বর্তায় না। ৭৩-এর সবচেয়ে সমালোচিত সাংসদ ছিলেন মোশতাক। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায়ী ও পরবর্তী সময়ে জাসদ নেতা রশিদ ইঞ্জিনিয়ার বিপুল ভোটে অগ্রগামী থাকলেও শেষ মুহূর্তের কারসাজিতে খন্দকার মোশতাককে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। বঙ্গবন্ধু টেরও পেলেন না, কী বিষাক্ত সরীসৃপ অলক্ষ্যে তার আস্তিনে আশ্রয় নিল তারই দলীয় জার্সির বদৌলতে। বন্ধুর ছদ্মবেশে মোশতাক শুধু বঙ্গবন্ধুকে নয়, বাঙালি জাতিকে খুন করে বাংলাদেশের নাম ইতিহাসের পাতা থেকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টায় মেতে উঠেছিলেন। শুধু মোশতাক কেন? বঙ্গবন্ধুর অতি ঘনিষ্ঠ স্নেহধন্য স্বজন পর্যন্ত স্বার্থান্ধ হয়ে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। এর কিছুটা বর্ণনা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ 'আমার একাত্তর'-এ (১৯৯৭) রয়েছে। ৭১-এ তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলায় পৌঁছে সবিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন ক্ষমতার লোভ, মোহ ও পরশ্রীকাতরতা- যার বিষময় পরিণতি বাংলাদেশের ইতিহাসের কলঙ্কতম অধ্যায়।
তাজউদ্দীনের ব্যাপারে 'প্রভাবশালী' একজনের অভিযোগ প্রসঙ্গে আনিসুজ্জামান লিখেছেন, 'তাজউদ্দীনকে আমি এতই ভালো জানতাম যে, মনির কথায় আমার প্রত্যয় হয়নি। তবে একটা ভয়ংকর অস্বস্তি ও দুর্ভাবনা নিয়ে সেদিন ঘরে ফিরেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে। এখনই যদি... মতো প্রভাবশালী মানুষ নিজের দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন নেতা এবং সরকারের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে এমন রটনা করতে পারে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ কী, সে কথা ভেবে নিদারুণ শঙ্কায় চিন্তাচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল।' (পৃ-৫৮-৫৯)
আনিসুজ্জামান লিখেছেন- 'তাজউদ্দীন আমাকে খোলাখুলিই বলেছিলেন যে, তার প্রধানমন্ত্রিত্বের ব্যাপারে দলের মধ্যে বড় রকম বিরোধিতা আছে।' (পৃ-৮৭)
তাজউদ্দীন-বিরোধী চক্র স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। যখন বঙ্গবন্ধুর হৃদয় এবং তাজউদ্দীনের মস্তিস্ক বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে অগ্রগতির পথে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তারা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে তাজউদ্দীন আহমদকে বিযুক্ত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা জানত বঙ্গবন্ধুর পশ্চাতে তাজউদ্দীন আহমদ ঢাল হয়ে থাকলে তাদের স্বার্থ ও অভিসন্ধি কিছুতেই সিদ্ধ হবে না। বঙ্গবন্ধু এক সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুর্দিনের সঙ্গী চির বিশ্বস্ত বন্ধুকে ছাড়তে বাধ্য হন। তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিপরিষদ থেকে অব্যাহতি নেওয়ার মাত্র দু'দিন পর আমারই এক সুহৃদ তৎকালীন সাংসদ কী অশোভন ভাষা ও ভঙ্গিতে বলেছিলেন, 'ভাই তাইজুদ্দিরে তো দিলাম শেষ কইরা'। তিনি তখনও টের পাননি, তারা শুধু তাজউদ্দীনকে নয়- বাংলাদেশকেই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে দিলেন। অবশ্য এর কাফফারা তাকে দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাকে তিন বৎসরাধিকাল জেলে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে।


৮ অক্টোবর প্রকাশিত নূরে আলম সিদ্দিকীর মর্মস্পর্শী লেখা 'এ প্রশ্ন তোলার অধিকার শেখ হাসিনার আছে' অনেককে অশ্রুসিক্ত করবে। জনাব সিদ্দিকী ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ জনপ্রিয় ছাত্রনেতা। অসাধারণ বক্তা। সুচয়িত শব্দাবলিতে তার সারগর্ভ বক্তব্য শ্রোতাদের মোহাবিষ্ট করে রাখত, অনুপ্রাণিত করত। তার সঙ্গে এক সময় আমার সামান্য পরিচয় ছিল। স্বল্প সময়ে এই নিরহংকার নিস্কলুষ সজ্জনের সান্নিধ্যে বুঝেছিলাম তিনি যতটা সরল, নৈতিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, ততটাই কঠোর এবং আপসহীন। তার লেখাটিতে ক্ষোভ-ক্রোধ-অভিমান- সর্বোপরি পারিপার্শ্বিক কারণে অসহায়তা এবং উর্দি পরিহিত পথভ্রষ্টদের হাতে বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের জন্য তার হৃদয়ের শোণিত-ক্ষরণকে গোপন করেননি। এটি সুস্পষ্ট যে একটি ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী নূরে আলম সিদ্দিকীকে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং তাকে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকেও সরিয়ে দেয়- যেমনটি ঘটেছিল তাজউদ্দীন আহমদের ক্ষেত্রে।
নূরে আলম সিদ্দিকী ছাত্রলীগের ঐতিহ্য ও গৌরবময় ভূমিকা শ্নাঘার সঙ্গে স্মরণ করে এবং যুবলীগের প্রাপ্য প্রশংসাও করেছেন। যে ছাত্রলীগ ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিসংগ্রাম পর্যন্ত সব আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, তাদের গৌরবগাথা জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তখন এই সংগঠনটি কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করেনি, পরিচালিত হয়নি কোনো নেতার অঙ্গুলি হেলনে। বরং কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি দেশ বা গণস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকে পড়লে ছাত্ররাই তাদের সঠিক পথ নির্দেশে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। সেই ছাত্রলীগ আজ পথভ্রষ্ট স্বার্থান্ধ- দুর্বৃত্তায়নের অপর নাম। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, তদবিরের নামে চাপ সৃষ্টি, অর্থ পাচার- এহেন অপকর্ম নেই, যা তারা করে না। সাধারণ মানুষের স্নেহ-ভালোবাসা তাদের প্রতি আর নেই। ছাত্রনেতা হিসেবেও নয়, সমীহের পাত্র। ছাত্রলীগের জেলা পর্যায়ের জনৈক নেতা দুই হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে সম্প্রতি অভিযুক্ত। তাদের মদদদাতাদের তালিকায় দলীয় মন্ত্রী কিংবা সাবেক মন্ত্রীও রয়েছেন। অতি সম্প্রতি পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন স্থানে মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের মতো অনভিপ্রেত ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের মূল ভিত্তিতেই আঘাত করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় অভিযুক্ত সৈকত মণ্ডলকে ছাত্রলীগ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। কিছুদিন আগে সৈকত শিবির থেকে ছাত্রলীগে 'হিজরত' করে।
আর যুবলীগ? ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিসহ বহু অপকর্মের হোতা এই প্রৌঢ়-বৃদ্ধ যুব নেতারা। শিবির-জামায়াত-বিএনপি থেকে হিজরতকারীদের অনেকেই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। তাদের মধ্যে হত্যা, ধর্ষণসহ বহু মামলার আসামিও রয়েছেন। ফলে তৃণমূল আওয়ামী লীগপন্থিদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব রয়েছে। দলের প্রতি অনুগত বিদ্রোহী প্রার্থীদের আধিক্য এ কারণেই। পত্রিকাসূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দলে নবাগত এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের মনোনয়নের পেছনে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের কথা শোনা যাচ্ছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের আজহার, জাতীয় পার্টির সৈয়দ কায়সার, জামায়াত-বিএনপি-জাতীয় পার্টির হয়ে সর্বশেষ আওয়ামী লীগে আশ্রিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোবারকের মামলা আপিল বিভাগে বছরাধিককাল আটকে আছে।
একজন মাননীয় প্রাক্তন বিচারপতি ও বার কাউন্সিলের সভাপতি এবং একাধিক প্রবীণ আইনজীবী বলেছেন যে, সরকার ইচ্ছে করলে কিংবা চাইলে গুরুত্ব বিবেচনা করে পেছনের মামলাও সামনে নিয়ে আসতে পারে। তাহলে এদের ক্ষেত্রে সরকারের ঢিলেঢালা, গা-ছাড়া ভাব কেন? এর পেছনেও কি দলের কোনো প্রভাবশালী মহল! যেমন নারায়ণগঞ্জের ত্বকী হত্যার মূল আসামি শনাক্ত হলেও 'দলীয় প্রভাবে' অবাধে বিচরণ করছে।
আমাদের আশঙ্কা, বর্তমান সরকারের বহু সাফল্য কিছু ভুলের জন্য ব্যর্থ না হয়। সময়ের এক ঘা-ই যথেষ্ট। দেশের মানুষ তথা দেশকে বাঁচানোর সুযোগ বারবার আসে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরকার কঠোরতম অবস্থান গ্রহণ না করলে সব অর্জনই বিফলে যাবে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এখন থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করতে হবে এবং এর সূচনা হবে নিজ দল ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন থেকে। শর্ষের ভূত তাড়াতে পারলে ওঝার কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।
নূরুর রহমান খান :প্রাক্তন অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়