চট্টগ্রামে উন্মুক্ত খালে পড়ে সোমবার শিশু কামাল উদ্দিনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি যেমন হৃদয়বিদারক, তেমনি হতাশাজনক। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে খাল ও নালায় পড়ে একের পর এক হতাহতের ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের যেন বিকার নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ ব্যাপারে আমরা বারবার উদ্বেগ জানিয়ে এলেও নাগরিকের সুরক্ষায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। মঙ্গলবার সমকালের সচিত্র প্রতিবেদনে আমরা নিখোঁজ শিশুটির বাবার আহাজারি দেখেছি। কলিজার ছেঁড়া ধন হারিয়ে পাগলপারা বাবা ছবি হাতে নিয়ে ছেলেকে খুঁজে চলেছেন। সোমবার প্রথম দিন বাবা একাই খালে নেমেছেন; সন্তানের খোঁজে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। তবু কর্তৃপক্ষের ঘুম যেন ভাঙছে না।
চট্টগ্রামে খাল-নালায় পড়ে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ। গত পাঁচ মাসে এক চশমা খালেই মৃত্যু হয়েছে দু'জনের। তা ছাড়া সোমবার থেকে সেখানে শিশু কামাল নিখোঁজ রয়েছে, আগস্টের শেষ সপ্তাহে একই খালে নিখোঁজ হওয়া ব্যবসায়ী সালেহ আহমেদের অবস্থা তথৈবচ। এ ঘটনার আগে নগরের আগ্রাবাদের মাজারগেট এলাকায় সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে নালায় পড়ে নিখোঁজ হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী শেহেরীন মাহমুদ সাদিয়ার মৃত্যুতে ব্যাপক সমালোচনার পরও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। একের পর এক মৃত্যুর পরও খালের পাড়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী কিংবা নালায় স্ল্যাব বসানো নিয়ে কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ তো নেইই, বরং সংবাদমাধ্যমে এসেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বা চসিক ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা সিডিএর মধ্যকার দ্বন্দ্ব। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সমকালের প্রতিবেদনে এসেছে, চট্টগ্রামে ৫৭টি খালের মোট দৈর্ঘ্য ১৬৫ কিলোমিটার। নালা রয়েছে ৯৭২ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে এর অর্ধেক অংশেই স্ল্যাব বা নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। চট্টগ্রামে পথে পথে যে মরণফাঁদ তৈরি হয়ে আছে, সেখানে কামালের মতো খেলাধুলা করতে করতে শিশুদের পড়ার ঘটনা যেমন ঘটছে; ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকও একটু অসতর্ক হলেই দুর্ঘটনায় পড়ছেন।
কর্তৃপক্ষ বলছে, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতায় মেগা প্রকল্পের কাজ চলার কারণে নালা কিংবা খালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেওয়া যায়নি। আমরা মনে করি, এ বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, যেসব জায়গা প্রকল্পের আওতায় নেই, সেখানের নালা কিংবা খালেও স্ল্যাব কিংবা নিরাপত্তা বেষ্টনী বসানো হয়নি। এমনকি মেগা প্রকল্পের আগে থেকেই সেখানকার খালা ও নালাগুলো উন্মুক্ত ছিল। আগস্টে ব্যবসায়ী সালেহ আহমেদের নিখোঁজের পর চট্টগ্রামে খালের পাড়ে নিরাপত্তা বেড়া এবং নালার ওপর স্ল্যাব বসানোর ঘোষণা দেওয়ার পরও কেন তা বাস্তবায়ন হয়নি? এরপর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ সংশ্নিষ্ট ফুটপাতে একটি নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে দায় সারে। আমরা মনে করি, শিশু কামালের মৃত্যুর দায় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। চট্টগ্রামে কাজের ক্ষেত্রে চসিক ও সিডিএর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। এর আগে দুর্ঘটনায় সিটি মেয়র যেমন প্রকল্প পরিচালনায় সিডিএর ব্যর্থতার কারণ উল্লেখ করেছেন; তেমনি সিডিএ চেয়ারম্যানও নালা-নর্দমা পরিস্কার করা ও তার ওপর স্ল্যাব না দেওয়ায় সিটি করপোরেশনকে দুষছেন। আমরা তখন সতর্ক করে এ সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বলেছিলাম, এভাবে দোষারোপ করে দিন দিন সমস্যাটি জিইয়ে রাখলে মানুষের দুর্ভোগ ও হতাহতের ঘটনা- উভয়ই বাড়বে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাস্তবে সেটাই ঘটেছে।
আমরা চাই, অনতিবিলম্বে চট্টগ্রামের সব নালা ও খালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। যেখানে প্রকল্পের কাজ চলছে, সেখানেও যেন সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড দেওয়া হয়। চট্টগ্রামের খাল ও নালা যেভাবে ময়লা-আবর্জনায় ভরে আছে, তা নিয়মিত পরিস্কারের উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি। আমরা জানি, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে কয়েকটি প্রকল্প কাজ করছে। সেখানে জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান যেমন করতে হবে, তেমনি উন্মুক্ত নালা ও খালের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমরা দেখতে চাইব, চসিক ও সিডিএ উভয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত নিরাপত্তার কাজটি সম্পন্ন করুক। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এভাবে যেন কোনো মা-বাবার বুক খালি না হয়।