মানুষ তার কর্মগুণেই সমাজে নিজের স্থান নির্ধারণ করে থাকে। একজন সৃষ্টিশীল ব্যক্তি শুধু সৃষ্টিই করেন না; নিজেকে অনুসন্ধান করে মানুষের কল্যাণেও নিবেদিত করেন। অধ্যাপক মোহীত উল আলম তেমনই একজন। তার পরিচয় নানামাত্রিক। কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, কবি, অনুবাদক, গল্পকার- সব মিলিয়ে তিনি একজন আলোকিত মানুষ। ইংরেজি সাহিত্যের নিমগ্ন সাধক মোহীত উল আলম কাজের পরিসর বিস্তৃত করেছেন বিষয়ভিত্তিক কিংবা একাডেমিক গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে। তিনি তার সৃষ্টির পাশাপাশি মানুষের জন্যও দিয়ে চলেছেন দায়িত্বশীলতার পরিচয়। আজ তার ৬৯তম জন্মদিন। অক্লান্ত মোহীত উল আলমের নিরন্তর প্রয়াস সৃজনশীলতা ঘিরে।

তার জন্ম চট্টগ্রামে, ১৩ ডিসেম্বর ১৯৫২ সালে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে সেখানেই প্রভাষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু ১৯৭৮ সালে। অধ্যাপক হওয়ার পর তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে কর্মের ব্যাপ্তি আরও বাড়ান। ১৯৮৩ সালে ইংরেজিতে দ্বিতীয় এমএ করেন কানাডার লেইকহেড ইউনিভার্সিটি থেকে। ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পালন করেন পূর্ণ মেয়াদে উপাচার্যের দায়িত্ব। তিনি চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বর্তমানে ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনার পাশাপাশি কলা ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে উল্লিখিত ওই অধ্যায় ছাড়াও আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন তিনি।

তার সৃষ্টির ভাণ্ডার যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি এসবের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশ-বিদেশে অর্জিত পুরস্কার ও সম্মাননা লাভে অর্জনের ঝুলিও ভারি। তিনি বিজ্ঞাপনচিত্রেও মডেল হয়েছেন। সংস্কৃতি অনুরাগী মোহীত উল আলমের উপন্যাস, গল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং ইংরেজি ভাষা শিক্ষণের ওপর রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা চল্লিশের ওপর। কালো বিড়াল, চুড়ি ভাণ্ডার শুরু, নোঙরের শেষ নেই, এক জীবনে আরেক জীবন তার আলোচিত উপন্যাস। মৌসুমের দূরে কাছে, এ পাড়ে অপার টান, ঝুলবারান্দায় মেঘ, মানুষেরা ফিরে যায় দীর্ঘশ্বাসে ইত্যাদি তার পাঠকনন্দিত কাব্যগ্রন্থ। সোনা আর ঘামের বনিবনা, বলয় ছুঁয়ে ভালোবাসা বহুল বিক্রীত তার গল্পগ্রন্থ। তার ইংরেজি গল্পগ্রন্থ দ্য টেন্টালাইজ হার্টল্যান্ড। ইংরেজি ভাষা শিক্ষণের ওপরেও রয়েছে তার কয়েকটি গ্রন্থ। অনুবাদ গ্রন্থও রয়েছে কয়েকটি। এর মধ্যে অন্যতম আন্তন চেখভের সাইবেরিয়া থেকে। তার অনুবাদ এত সাবলীল যে, পাঠক খুব সহজেই তা আত্মস্থ করতে পারেন। শেকসপিয়রের কয়েকটি নাটক অনুবাদের পাশাপাশি তাকে নিয়ে রয়েছে আরও অনেক কাজ। তিনি শেকসপিয়রের ওপর পিএইচডি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

মোহীত উল আলম একজন ক্রীড়াপ্রেমী, তবে সেখানেই শেষ নয়। ক্রিকেট নিয়েও রয়েছে তার কয়েকটি গ্রন্থ। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা ও সম্পাদনা গ্রন্থ। ইতালি, থাইল্যান্ড, স্পেন, নেপাল, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি আন্তর্জাতিক সেমিনারেও অংশ নিয়েছেন। উপস্থাপনা করেছেন প্রবন্ধ। তিনি শিক্ষা-সৃষ্টিশীলতা-সৃজনশীলতায় ঋদ্ধ বটে, কিন্তু এর কোনোকিছু নিয়েই মাতামাতিতে নেই। নিজেকে আড়ালে রাখতেই পছন্দ করেন এবং লেখালেখিসহ জীবনাচারের সবকিছু চালিয়ে যাচ্ছেন নীরবে। প্রচারবিমুখ মোহীত উল আলম এখানেই ভিন্নমাত্রার একজন। বিশ্বসাহিত্যের প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের ধারায় তার এখনও নিয়মিত-নিরলস পদচারণা। ভালো লাগার বিষয়গুলো অনুবাদ করছেন সানন্দে। প্রতিবাদী মোহীত উল আলম যে কোনো অনিয়ম, কদাচারের বিরুদ্ধেও উচ্চকণ্ঠ। পত্রিকায় কলাম লিখে তিনি নেতিবাচকতার প্রতিবাদ করেন বলিষ্ঠভাবে। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ চর্চা ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনেও তিনি সোচ্চার। তার মানসচেতনা মানবিক ও সংস্কৃতিময়। গানের চর্চায় তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে তার কোনো কার্পণ্য কিংবা আলস্য নেই। মোহীত উল আলম আমাদের মধ্যে কর্মময় থাকুন

আরও অনেক দিন- তার জন্মদিনে এই শুভকামনা। সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিক্ষার নিমগ্ন সাধক মোহীত উল আলমকে শুভেচ্ছা।

দেবব্রত চক্রবর্তী :লেখক ও সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com