১১ অক্টোবর ২০২১ তারিখে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ, বাংলাদেশের দ্রুততম মানব মো. ইসমাইলকে এক বছরের জন্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া থেকে নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন। ইসমাইলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন মিডিয়াতে বক্তব্য দিয়ে ফেডারেশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন। আরও জানা যায়, নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তেমন সায় ছিল না সভাপতি এ. এস. এম. আলী কবির এবং তদন্ত কমিটির সদস্যদের। এমনকি ইসমাইলের শাস্তি নির্বাহী কমিটি কর্তৃক অনুমোদিতও ছিল না। তাহলে কোন ক্ষমতাবলে, কার স্বার্থে ফেডারেশন ইসমাইলকে এমন কঠিন শাস্তি দিল? ইসমাইল জাপান অলিম্পিক গেমস ২০২১-এ অংশগ্রহণের সুযোগ না পেয়ে বিভিন্ন মিডিয়া, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কাছে তার অভিযোগ জানিয়েছেন। এ অভিযোগ করে ইসমাইল কি কোনো অপরাধ করেছেন? কেউ তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে প্রতিবাদ জানাতেই পারেন এবং এটা তার অধিকার; অপরাধ নয়। ইসমাইল তা-ই করেছেন।

জাপান অলিম্পিক গেমস ২০২১-এ অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন প্রাথমিকভাবে তিনজনকে মনোনীত করে। তারা হলেন- মো. ইসমাইল, জহির রায়হান ও শিরিন আক্তার। জাপান অলিম্পিক গেমসের আগে সর্বশেষ জাতীয় অ্যাথলেটিকস মিটে (বাংলাদেশ গেমস) মো. ইসমাইল ১০০ মিটার স্প্রিন্টে ১০.২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে বাংলাদেশের দ্রুততম মানবের সম্মান অর্জন করেন। এটি ছিল তার চতুর্থবার দ্রুততম মানব হওয়ার কৃতিত্ব। শিরিন আক্তার ১০০ মিটার স্প্রিন্টে দ্রুততম মানবী হওয়ার সম্মান অর্জনসহ ২০০ মিটার স্প্রিন্টে নতুন জাতীয় রেকর্ডের মাধ্যমে প্রথম স্থান অর্জন করেন। অন্যদিকে জহির রায়হান শারীরিক অসুস্থতার কারণে জাতীয় মিটে (বাংলাদেশ গেমস) অংশগ্রহণ করেননি এবং জাপান অলিম্পিক গেমসে যাওয়ার আগে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। সে ক্ষেত্রে জহির রায়হান কোনোভাবেই মনোনীত হওয়ার কথা নয়। এমনকি জহির রায়হানকে টাইম ট্রায়াল কিংবা ওপেন ট্রায়ালের মাধ্যমে যাচাই করা হয়নি। সে ক্ষেত্রে ইসমাইল অথবা শিরিন যে কোনো একজনেরই মনোনীত হওয়ার যোগ্যতা ছিল। এখানে অবশ্যই ফেডারেশন একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ফেডারেশনের একটি সিলেকশন কমিটি আছে। সিলেকশন কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে বা সিলেকশন করে- কে কোন আন্তর্জাতিক মিটে অংশগ্রহণ করবেন। সিলেকশন কমিটি এবং নির্বাহী কমিটিকে উপেক্ষা করে কীভাবে জহির রায়হানকে মনোনীত করা হয়েছিল? বিষয়টি অত্যন্ত গর্হিত কাজ হয়েছিল বলে সিলেকশন কমিটির আহ্বায়ক প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। নেপাল সাফ গেমস-২০১৯-এ জহির রায়হান অসুস্থতার ভান করে তার মূল ইভেন্ট সমাপ্ত করেননি এবং পরের দিন সুস্থ থাকা সত্ত্বেও অন্য ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেননি- এ অভিযোগ আছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এ ছাড়া তিনি নেপাল সাফ গেমস ক্যাম্পে নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন- অভিযোগ আছে এও। তার বিরুদ্ধে ক্যাম্প কমান্ডার এবং টিম ম্যানেজার অসদাচরণের অভিযোগ ফেডারেশনে জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু ফেডারেশন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। সংগত কারণেই মো. ইসমাইল বিক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ করেছেন এবং আগেই বলেছি, এমনটি তার গণতান্ত্রিক অধিকার। অন্যায়ের প্রতিবাদ কেন অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে?
ফেডারেশনের কাজ হলো অ্যাথলেটদের লালন করে উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ক্রীড়ার মান উন্নয়ন তথা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা। একজন অ্যাথলেট বছরের পর বছর অনেক সাধনা করে একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখেন আন্তর্জাতিক মিটে অংশগ্রহণ করার। অথচ ফেডারেশনের কতিপয় কর্মকর্তার ব্যক্তিস্বার্থের কারণে অ্যাথলেটদের ক্ষতি হচ্ছে, ফেডারেশনের ক্ষতি হচ্ছে, দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। ফেডারেশনের যে কারও ব্যক্তিস্বার্থ এবং ভুল সিদ্ধান্তের দায় গোটা ফেডারেশন নিতে পারে না। ভুল সিদ্ধান্তদাতাকেই এর দায় নিতে হবে। বিগত কয়েক বছর ধরে অ্যাথলেটিকসের পারফরম্যান্স তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। অ্যাথলেটদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের সুবিধার ব্যবস্থা না করে উল্টো উদীয়মান এবং সম্ভাবনাময় অ্যাথলেটদের কঠিন শাস্তি দিয়ে তাদের ক্যারিয়ারের সর্বনাশ ঘটানো হচ্ছে এবং এরই দুঃখজনক উদাহরণ মো. ইসমাইল।

সময় অনেক গড়িয়েছে, কিন্তু এসব ব্যাপারে আর উদাসীন থাকা কোনোভাবেই উচিত নয়। অ্যাথলেটিকসকে বাঁচাতে হবে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এবং অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সভাপতির কাছে বিনীত অনুরোধ- কিছু একটা করুন। তা না হলে অ্যাথলেটিকসের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। এমনটি শুভ বোধসম্পন্ন এবং ক্রীড়ানুরাগী কারোরই কাম্য হতে পারে না।

মো. মিজানুর রহমান :যুগ্ম সম্পাদক ও সদস্য-সিলেকশন কমিটি, বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন