রাজনীতির বিষয়টি ছাত্র-শিক্ষক সুসম্পর্ক গড়ে তোলার পথে বাধা বলে মনে করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্ষেত্রে ওই হতাশার চিত্র আমার ধারণা সব শিক্ষকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আজও দক্ষ, যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মে নিয়োজিত। তবে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে ওই হতাশার জায়গা নিয়ে কখনও কথা হলে তারাও অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে থাকেন। শিক্ষক সমাজ যখন দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তখন শিক্ষার্থীদের কাছে তারা বিভাজিত বা খণ্ডিত হয়ে পড়েন। আবার শিক্ষার্থীরা আদর্শিক কারণে নানা রাজনৈতিক দলের অনুসারী হয়ে উঠতে পারে। যার ফলে একজন প্রতিভাবান শিক্ষক সব শিক্ষার্থীর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে নাও উঠতে পারেন। তা ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অবনতির কারণ হতে পারে। নিজেদের মধ্যে বিভাজনের কারণে শিক্ষকদের সম্মিলিত ঐক্যের শক্তি বিনষ্ট হয়। অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতার কারণে শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধ আদর্শের শক্তি দুর্বল হয়। ফলে তা তাদের সামাজিক মর্যাদাসহ সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ নিজেদের অখণ্ড সত্তাকে সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়ে সম্মানিত শিক্ষকদের কর্ম অতীতের তুলনায় কিছুটা নিষ্প্রভ ও নিষ্ম্ফল হয়ে পড়ে। ওবায়দুল কাদের ও তোফায়েল আহমেদের কথায় সে কথারই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। উভয় জননেতার মতামতেই যেন সমস্যার শিকড়ের সন্ধান পাওয়া যায়। আবার দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তাদের ভাবনার ঐক্যমত পরিলক্ষিত।

শিক্ষক সভ্যতার অভিভাবক। হতাশাজনক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার পরিবেশে কোনো বিষয়ে মূল্যায়ন ও গুরুত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে শিক্ষক শিক্ষার্থীকে সদা নিরপেক্ষ হতে শেখাবেন। একজন শিক্ষকের কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত নয় এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি কোনো কর্মকর্তার সামনে তোষামোদ বা তোষণের কাজটি অবশ্যই করবেন না। যে শিক্ষকদের স্বাধীন চিন্তা ও মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে পারে, সমাজকে অবশ্যই তেমন শিক্ষকের সুরক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। দার্শনিক রাসেলের চিন্তায় শিক্ষকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে এবং তাদের স্বাধীন চিন্তা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা বিধানে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে। তবে শিক্ষকের কাজ শুধু জ্ঞান বিতরণ নয়। জ্ঞান সৃষ্টিও তার অন্যতম প্রধান কাজ। শিক্ষকরা যাতে সে কাজে যত্নবান হতে পারেন সে জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, 'পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা ছাত্রনেতাদের কথায় ওঠেন বসেন- এমন না হলেও তাদের কথা মানতে হয়। এটা বাস্তবতা। ওবায়দুল কাদের যেভাবে বলেছেন, দেখা যাচ্ছে এটা ব্যাপকভাবে হচ্ছে। এ জন্য যারা উপাচার্য হওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগেন, তাদের বাদ দিয়ে দলীয় আনুগত্য যাতে প্রধান চিন্তা না হয় সেটি বিবেচনায় নিয়ে মেধা, ব্যক্তিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা- সবকিছু দেখে উপাচার্য নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম হলে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে এ জন্য তা ঘটছে এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো তদবির বা চাপ যাতে না আসে তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দেখতে হবে, ব্যবস্থা নিতে হবে।' শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের যে প্রক্রিয়ার কথা উঠে এসেছে, তার প্রভাব শিক্ষক নিয়োগের ওপর পড়তেই পারে। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রের আরও অনেক জায়গাতে তেমনটা ঘটার ও ওবায়দুল কাদেরের অভিযোগের বিষয়ে জনশ্রুতি শোনা যায় বা পত্রিকান্তরে জানা যায়। শুধু অভিযোগ থাকলেই তো চলে না, তা একটি প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়। আবার অনুকূল পরিবেশের অভাবে সে বিষয়ে অনেক সময় সত্য উদ্ঘাটিত হয় না, সে ক্ষেত্রে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদতেও পারে। সম্প্রতি কুয়েটে অধ্যাপক সেলিমের মৃত্যু, দু'বছর আগে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যাসহ সুদূর অতীতে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ছাত্র-শিক্ষক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বিষয়টিকে তাদের প্রচলিত দলীয় রাজনীতির প্রতি অনুরাগের কুফল বিবেচনা করা যায়। সেখানে হত্যাকাণ্ড ছাড়াও শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে পঙ্গু করার মতো বা সুস্থভাবে মানসিক বিকাশের পরিপন্থি অনেক ঘটনা আড়ালে-আবডালেও থেকে যেতে পারে।

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ছাত্র-শিক্ষকদের প্রচলিত দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সংশ্নিষ্টতার বিষয়ে শিক্ষাবিদ, সমাজের সচেতন প্রাজ্ঞজন, রাজনীতিবিদ, সরকারের নীতিনির্ধারকসহ সহৃদয় চিন্তকজনের মনোযোগের দাবি রাখে বলে মনে করি এবং এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করার জন্য সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ড. জাফর ইকবালসহ ওই গুণীজনকে আহ্বান জানাই। আবার দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে।

দার্শনিক রাসেলের চিন্তা, প্রাজ্ঞজনের অনুভূতি, জননেতাদ্বয়ের উপলব্ধি একই সূত্রে গাঁথা বলে মনে করি। সচেতন সাধারণ মানুষেরও তেমন ভাবনা। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, আর শিক্ষকরা যদি মানুষ গড়ার কারিগর হন, সে জায়গা পুনরুদ্ধারে বা রক্ষা করতে জাতীয় ঐকমত্য গড়ার কোনো বিকল্প নেই। সে জন্য সর্বশেষে দেশের ওই বরেণ্য প্রাজ্ঞজন সমীপে আবারও অনুরোধ, তারা শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসক নিয়োগ এবং শিক্ষকদের প্রজ্ঞা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও মর্যাদা অর্জনের উপায় উদ্ভাবন বিষয়ে জনমত গড়ার লক্ষ্যে আরও সুস্পষ্টভাবে আলোচনা শুরু করতে পারেন। করণীয় নির্ধারণে বিদগ্ধজন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে আসন্ন নির্বাচনের আগে বিষয়টি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সংযুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন। সর্বোপরি শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে সচেতন জনগণের ভাবনার জায়গায় কাজ শুরু করা যেতে পারে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলেই তা এক দিন আলোর মুখ দেখতে পারে। সে ক্ষেত্রে সময়টা আরও দুই-এক যুগ প্রলম্বিত হলেও আমরা আলোচনার সূত্রপাত করে ওই মহৎকর্মের বীজ বপন করতে পারি। ওই কর্মপ্রচেষ্টায় ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন করা প্রয়োজন হলে তা নিয়েও আলোচনার সূচনা করা যায়। আলোচনার সূত্রপাত দ্রুত করার তাগিদ অনুভব করি। কারণ আগামী এক দশক পরে হয়তো এ বিষয়ে উদ্যোগী বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে। এ নিয়ে কথা বলা মানুষের অভাব ঘটতে পারে। তাই শুরু যখন করেছেন তখন অসীম ধৈর্য সহকারে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করুন এবং সফল সমাপ্তির পথে অগ্রসর হোন। অর্থাৎ যে বীজ বপন করেছেন, তার চূড়ান্ত ফসল ঘরে তুলুন।

ড. মো. মোস্তাফিজার রহমান: প্রাক্তন অধ্যক্ষ, নওগাঁ সরকারি কলেজ