দেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার নিয়ে জাতীয় সংসদে এ পর্যন্ত অনেকবার আলোচনা হয়েছে। সরকার যদি এ ব্যাপারে কঠোর কিংবা অনমনীয় অবস্থান নেয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সব বিভাগেরই যদি সমতৎপরতা থাকে, তাহলে অর্থ পাচার ঠেকানো কঠিন কিছু কি? এ পর্যন্ত অর্থ পাচার রোধে যত কথা হয়েছে, সে অনুপাতে কি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এ নিয়ে থেমে থেমে কথা হয়, আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে; আবার সব মিইয়ে যায়। সম্প্রতি এ নিয়ে ফের আলোচনার সূত্রপাত। ৪৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দুদকের তৈরি করা তালিকার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী আলোচিত পানামা পেপারস ও প্যারাডাইস পেপারসের প্রতিবেদন থেকে দেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে দুদক তালিকা তৈরি করে হাইকোর্টে উপস্থাপন করে। আদালত সরকারের কাছে জানতে চেয়েছেন- এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

অর্থ পাচারকারীদের শুধু তালিকা করে কোনোই সুফল মিলবে না যদি আইনের আওতায় এনে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা না যায়। অর্থ পাচার করে কারা? এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই যে, কালো টাকার মালিকরাই এমনটি করে থাকে। তাদের শনাক্তে ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সর্বাগ্রে দরকার সরকারের সদিচ্ছা। সমাজে একটি কথা বহুল প্রচলিত- খবরের আড়ালেও খবর থাকে। এ ক্ষেত্রেও বলা যায়, এ পর্যন্ত যাদের নাম অর্থ পাচারকারী হিসেবে জানা গেছে, এর বাইরেও হয়তো অজানা রয়ে গেছে আরও অনেকের নাম। অর্থ পাচার রোধে দেশে প্রয়োজনীয় আইন রয়েছে। আইনে পাচারকারীর দ্বিগুণ জরিমানাসহ চার থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিধানও আছে। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ কতটা এ পর্যন্ত দৃষ্টিগ্রাহ্য? এ ক্ষেত্রে আমাদের সামনে কোনো দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার চিত্র নেই। এ কারণেই রোধ করা যাচ্ছে না অর্থ পাচার।

আইন আছে অথচ এর প্রয়োগ নেই! কথা হয় কিন্তু প্রতিকার হয় না! সরকারের দায়িত্বশীলরা অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন, প্রতিশ্রুতি দেন- অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু তাদের এসব কথা যে শুধু কথার কথা হয়েই আছে- বিদ্যমান পরিস্থিতি এরই সাক্ষ্যবহ। এ যেন এক অদ্ভুত বাস্তবতা। যে কোনো অন্যায়-অপরাধের কঠোর বার্তা যদি সামনে না থাকে, তাহলে দুস্কর্মের পথ কি রুদ্ধ করা সম্ভব? দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের চিত্র অনুজ্জ্বল। অন্যদিকে, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। কী কারণে অর্থ পাচার বাড়ছে, এর কারণগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। দেশে কি তাহলে বিনিয়োগের পরিবেশ নেই? কিংবা পাচারকারীরা প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় টিকে থাকতে না পারার কারণেই কি এমনটি হচ্ছে? দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কি তারা হতাশ?

অর্থ পাচারের যেসব খবর মেলে তাতে এও প্রতীয়মান- দুর্নীতি বেড়েছে। দুর্নীতির মূলোৎপাটনে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থ পাচার রোধ সহজ হবে না। একই সঙ্গে জরুরি নির্বিঘ্ন রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, রাজনৈতিক বৈষম্য দূর করে স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নানা অপরাধের ক্ষেত্র তৈরি করে। এই অভিযোগ অমূলক নয়- যারা অর্থ পাচার করেছে কিংবা করছে, তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর পক্ষেও তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করা সহজ নয়। যখন এ নিয়ে কথাবার্তা চলে, তখন সরকারের তরফে শুরু হয় কিছু তৎপরতা এবং অনেকেরই ধারণা, যাদের নাম আসে কিংবা তালিকায় প্রকাশ পায়, তুলনামূলক তারা কম ক্ষমতাবান। রুই-কাতলারা নিরাপদেই থাকে। পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও আইনকানুন কোনো কিছুরই ঘাটতি না থাকলেও কেন এ ব্যাপারে জোরদার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না? হয়তো অনেকেরই স্মরণে আছে, ২০০৭-০৮ সালে পাচার করা অর্থ সিঙ্গাপুর থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। তখন পারলে এখন কেন পারা যাবে না?


শুধু তো অর্থ পাচারই নয়, মালয়েশিয়াসহ আরও কোনো কোনো দেশে ক্ষমতাবানদের কেউ কেউ 'সেকেন্ড হোম' গড়েছে। সংবাদমাধ্যমেই প্রকাশ পেয়েছিল, বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের মধ্যে সন্দেহের তীর আছে অসাধু সরকারি কর্মকর্তাদের দিকেও। এমন কথাও শোনা গেছে, আমদানির নামে কোনো কোনো ব্যবসায়ী এলসি খুলে বিল পরিশোধ করেছে, কিন্তু এর বিপরীতে দেশে কোনো পণ্যই আসেনি। আরও অভিযোগ আছে, একটি চক্র বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দেয়। অর্থাৎ দুস্কর্মের হোতা অনেক। আর দেশে অবৈধভাবে কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে এর দায় শোধ করে তারা। আমরা বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে যাচ্ছি। ৫০ বছর আগে বাঙালি যে ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছিল, সেই বাংলাদেশ হয়ে উঠবে এত অনিয়মের উৎস- তা ভাবতেও কষ্ট হয়।

বাংলাদেশ অর্থ পাচারের নিরাপদ চারণভূমিতে পরিণত হওয়ার জন্য সরকারের ব্যর্থতাই মুখ্য। বিষয়টি যে শুধু দু-চার বছর ধরে ঘটছে, তা তো নয়। দেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার আগেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে, বরং এখন তা কয়েক গুণ বেড়েছে। অর্থমন্ত্রী বিরোধী দলের কাছে অর্থ পাচারকারীদের তালিকা চেয়েছেন। অন্যদিকে দুদক চেয়ারম্যান বলেছেন, অর্থ পাচারের বিষয়টি তাদের দেখভালের আওতায় পড়ে না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীলদের মন্তব্য যদি হয় এমন, তাহলে দুস্কর্মকারীরা বসে থাকবে কেন? এখন তো অর্থ পাচারকারীদের একটি তালিকা দুদক পেল। এমতাবস্থায় তাদের নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থেই অর্থ পাচারকারী দুর্নীতিবাজদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থ পাচারের ব্যাপারে সরকার চাইলে আন্তর্জাতিকভাবেও তদন্তের ব্যবস্থা নিতে পারে।

প্রশ্ন রাখতে চাই- দেশের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধী সংস্থাগুলো কী কাজ করে? তাদের কেন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা নিয়ে কাজ করতে হবে? কেন তারা তাদের আইনি কাঠামো ও শক্তিবলে প্রয়োজনীয় কাজ করতে অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে? এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের দায়ও কি কম? দেশের যে কোনো গুরুতর সমস্যা-সংকটের সমাধান করতে হলে অবশ্যই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ঐকমত্য অত্যন্ত জরুরি। বিদেশে অর্থ পাচার কখনও কখনও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের অবস্থান ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ব্যাপকতা বাড়ে-কমে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নও আমাদের আরেকটি বড় সমস্যা। সংবাদমাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের যেসব তথ্য পেয়ে থাকি, তা আমাদের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বলা যায়, এ যেন জাতীয় দুর্যোগ। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, একদিকে বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের পাচার করা জমাকৃত অর্থের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে এক শ্রেণির বলবান-দুর্নীতিবাজ ব্যাংকগুলো খালি করে ফেলছে!

অতীতে দেখা গেছে, নির্বাচনের বছর দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়েছে। যখনই কিংবা যেভাবেই অর্থ পাচার হয়ে থাকুক, তা আমাদের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এ পরিস্থিতির নিরসন করতে না পারলে আমাদের জন্য বড় সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আরও প্রবল হবে। এ জন্য সংশ্নিষ্ট সব বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টিও জরুরি। বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন করে সবকিছু ঢেলে সাজানোও সমভাবে জরুরি। তবে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, জবাবদিহি নিশ্চিত হলে অনিয়ম-অনাচারের পথ স্বাভাবিকভাবেই হবে সংকুচিত। আমাদের সমাজে একটি বিষয় লক্ষণীয়, অনেকেই নীতি-নৈতিকতার কথা বললেও তাদের জীবনাচারে দেখা যায় এর বিপরীত চিত্র। এর কারণও সচেতন মানুষমাত্রেই জানা।

এম হাফিজ উদ্দিন খান :সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা