আমরা দেখছি, গত কয়েক বছর ধরে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে দেশে পেঁয়াজের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে এবং তা গড়ায় ডিসেম্বর-জানুয়ারি পর্যন্ত। কখনও আমদানি জটিলতা, কখনও ফলন কম, কখনও রপ্তানিকারক দেশে দাম বৃদ্ধি ইত্যাদি অজুহাত দাঁড় করিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি, গত কয়েক বছর দেশে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা নিরসনে স্থল-নৌ এমনকি আকাশপথেও এই নিত্যপণ্যটি আনতে হয়েছে। আমাদের পেঁয়াজ আমদানির অন্যতম বড় উৎস ভারত। গত বছর ভারত হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় বিকল্প কয়েকটি উৎস থেকে চাহিদা মেটাতে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। কিন্তু এবার সে রকম পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি। রোববার সমকালে যথার্থই বলা হয়েছে, 'পেঁয়াজে কারসাজির ঝাঁজ'।

নতুন করে নানা অজুহাতে পেঁয়াজের বাজার যেভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আমরা জানি, চলতি বছরের অক্টোবরের শুরুর দিকে হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায় অস্বাভাবিকভাবে। তখন সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রেখে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার আমদানি শুল্ক্ক প্রত্যাহার করে নেয়। বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাবও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কিন্তু সে ধারা অব্যাহত থাকেনি। খানিক বিরতিতেই আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে পেঁয়াজের দাম। সমকালের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, গত কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিতে ২০ থেকে ২৫ টাকা। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল সূত্রে প্রকাশ, পেঁয়াজ আমদানিতে কোনো সমস্যা নেই। প্রতিদিনই পেঁয়াজ আসছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বছরে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৫ লাখ টন। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে সাড়ে ২৯ লাখ টনেরও বেশি। আমরা জানি, পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য। এ কারণে কিছু পেঁয়াজ নষ্ট হয়েই থাকে। দেখা গেছে, পেঁয়াজের চাহিদার নিরিখে ঘাটতি থাকে সাত লাখ টনেরও কম। কিন্তু আমদানি হয়ে থাকে এর থেকে অনেক বেশি। তাই কোনো রসায়নেই পেঁয়াজের দামে এই উল্লম্ম্ফনের যৌক্তিকতা নেই।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি যথার্থ বলেছেন, এ পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে মূল কারণ মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের কারসাজি। আমরা এর সঙ্গে সহমত পোষণ করি। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বাজারে যে অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, এর প্রতিকারে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্নিস্ট দায়িত্বশীল সব মহলের তরফে কঠোর হুঁশিয়ারি বারবার শোনা গেলেও দৃষ্টান্তযোগ্য কোনো প্রতিবিধান নিশ্চিত হয়নি। এই ব্যর্থতার মাশুল গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৩৮ শতাংশ ও আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ২৯ শতাংশ। নেই মজুদ ঘাটতি কিংবা পরিবহন সমস্যাও। এ ছাড়া অব্যাহত আছে টিসিবির ট্র্রাক সেলও। তারপরও পেঁয়াজ নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড চলছেই। আমরা মনে করি, আমদানি সুবিধা বজায় থাকা ও ঘাটতিজনিত সমস্যা না থাকার পরও এভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়ার বিষয়টি স্বাভাবিক তো নয়ই, উপরন্তু নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের স্বেচ্ছাচারিতার দায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না। তবে এও আমলে রাখতে হবে, সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের কারণে পেঁয়াজের মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ জন্য পেঁয়াজ মজুদে বিশেষ উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন।

আমরা দেখতে চাইব, এমন পরিস্থিতিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ নেয়। আমরা মনি করি, প্রতি বছর পেঁয়াজের নিয়মিত যে সংকট হচ্ছে, তা কাটাতে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকেই নজর বাড়ানো দরকার। কিছু পদক্ষেপ নিলে তা অর্জন করা কঠিন হবে না বলে আমরা মনে করি। তবে যাদের স্বেচ্ছাচারিতায় ফিরে ফিরে ভোক্তার নাভিশ্বাস ওঠে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। বাজার নজরদারি ও তদারকির ওপরে অবশ্যই জোর দিতে হবে। ব্যবসার নামে নৈরাজ্য ঠেকাতে সরকারকে নির্মোহ ও কঠোর অবস্থানের বিকল্প নেই। মজুদদার, অসাধু আমদানিকারক কিংবা ব্যবসায়ী কেউই যেন কোনো অনুকম্পা না পায়, তা নিশ্চিত করার দায় সরকারেরই।