রাজধানীর একটি সড়কে বেপরোয়া প্রাইভেটকারের চাপায় পা হারিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন সার্জেন্ট মহুয়া হাজংয়ের বাবা মনোরঞ্জন হাজং (অবসরপ্রাপ্ত বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাবিলদার, বয়স ৬২)। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে ইতোমধ্যে ডান পা কেটে ফেলতে হয়েছে; বাম পায়ের অবস্থাও ভালো নয়। এখন তিনি বারডেম হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
মনোরঞ্জন হাজং ২০০৪ সালে বিজিবি থেকে অবসর নেওয়ার পর কয়েক বছর ধরে বনানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত। ঘটনার দিন অফিস শেষে তিনি বাসায় ফিরছিলেন। ২ ডিসেম্বর রাত সোয়া ২টার সময় মনোরঞ্জন হাজং নিজস্ব মোটরসাইকেলে ঢাকার বনানী থানাধীন নিউ এয়ারপোর্ট রোডের চেয়ারম্যান বাড়ির ইউলুপে পৌঁছালে পেছনে এক প্রাইভেটকার (বিএমডব্লিউ, ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৫-৪৯০৬) বেপরোয়া ও দ্রুতগতিতে এসে মোটরসাইকেলের পেছনে ধাক্কা দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ইতোমধ্যে এ দুর্ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, চেয়ারম্যানবাড়ি ইউলুপের পাশে মোটরসাইকেল নিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন মনোরঞ্জন। স্বাভাবিক নিয়মে চলাচল করছিল যানবাহন। হঠাৎ একটি প্রাইভেটকার অপর পাশ থেকে এসে তাকে চাপা দেয়। গাড়িচাপায় কোমরের নিচের অংশ থেঁতলে যায় মনোরঞ্জনের। চূর্ণ হয়ে যায় তার মোটরসাইকেলটি। ঘটনার পর বনানী থানা-পুলিশ পথচারীদের সহায়তায় আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে এবং প্রাইভেটকারে থাকা তিনজনকে আটক করে। পরে কোনো কারণে বা কারও প্রভাবেই হোক অভিযুক্ত গাড়ি ও আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
সংবাদমাধ্যমে প্রথমে গাড়িচালকের 'প্রভাবশালী পিতার' নাম প্রকাশিত না হলেও পরবর্তী সময়ে ঠিকই সামাজিকমাধ্যমে নামটি চলে আসে। সংবাদমাধ্যম ও টিভি চ্যানেলের ভিডিও ফুটেজেও গাড়িচালকের নাম ও ছবি দেখানো হয়েছে। চালকের নাম সাইফ হাসান। এ সময় গাড়িতে তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী অন্তরা ও বন্ধু রোয়াদ হাসান। তারা সবাই ঢাকার গুলশানে অভিজাতপাড়ার বাসিন্দা।
দুর্ঘটনার পর থেকেই গুরুতর আহত বাবাকে নিয়ে চিকিৎসার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মেয়ে ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট মহুয়া হাজং। এর পর যখন তিনি লিখিত অভিযোগ নিয়ে বনানী থানায় যান; থানা কর্তৃপক্ষ তার অভিযোগটি গ্রহণ করেনি। উল্টো মামলা করা থেকে তাকে বিরত থাকার 'পরামর্শ' দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
বনানী থানা ভুক্তভোগীর মেয়ে সার্জেন্ট মহুয়া হাজংয়ের অভিযোগ গ্রহণে এভাবে গড়িমসি শুরু করলে এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নানা সমালোচনা তৈরি হয়। 'পুলিশের মামলাই নিচ্ছে না পুলিশ' বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়।# এ নিয়ে জনসাধারণ এবং পুলিশের লোকদেরও বিভিন্ন সমালোচনার শিকার হতে হয় পুলিশ প্রশাসনকে। অবশেষে, সড়ক দুর্ঘটনার ১৪ দিন পর অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর মামলা ঠিকই নেয় বনানী থানা। তবে গাড়িচালক সাইফ হাসানের নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে এ মামলা (নং ২৫) নথিভুক্ত করে। সংবাদমাধ্যমে এ খবরটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও প্রশ্ন ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। আসামিদের নাম জানা সত্ত্বেও কেন বনানী থানা অজ্ঞাত নামে মামলা নিল! গাড়িচালকের বাবা প্রভাবশালী বলেই কি বনানী থানার এ কৌশল? 


জনগণের বন্ধু পুলিশ প্রশাসন যদি এভাবে প্রভাবশালীদের রক্ষায় কৌশল অবলম্বন বা চালাকির আশ্রয় নেয়; সত্যকে আড়াল করতে চায়; তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে তাদের কাছে সুবিচার প্রত্যাশা করবে! মহুয়া হাজংয়ের প্রথম অভিযোগপত্রে যখন অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ ছিল তখন বনানী থানা কেন মামলা নিতে গড়িমসি করেছিল? অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল কেন? তাতেও রাজি না হলে মামলাটি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল এবং পরিশেষে বাদীকে অজ্ঞাত নামে অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল কেন?
আরও অবাক হওয়ার পালা; যখন শোনা গেল, ১৪ ডিসেম্বর অর্থাৎ গণমাধ্যমের চাপে মহুয়া হাজংয়ের মামলা নথিভুক্ত করার দু'দিন আগেই সেই বিএমডব্লিউ গাড়ির চালক বনানী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। যদিও সংবাদমাধ্যমে সেটা এসেছে চার দিন পর ১৮ ডিসেম্বর। সেখানে মনোরঞ্জন হাজংয়ের বিরুদ্ধেই দুর্ঘটনার পুরো দোষ চাপিয়ে দিয়ে জিডি করেছেন ওই চালক।
পুলিশের বরং খতিয়ে দেখা উচিত ছিল- সে সময় তার গাড়ির গতি বেপরোয়া বা ওভারস্পিড ছিল কিনা। মনোরঞ্জন হাজং মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় যখন একটার পর একটা গাড়ি স্বাভাবিক গতিতে চলে গেল, সেখানে ঘাতক গাড়িটি কেন তাকে অকস্মাৎ ধাক্কা দিতে গেল! এ ছাড়া, চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল কিনা। তিনি কোথা থেকে গাড়ি ড্রাইভ করে আসছিলেন; সে সময় কোনো নেশা জাতীয় দ্রব্য খেয়ে ড্রাইভ করছিলেন?
বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।' সংবিধানের কোথাও লেখা নেই, রাষ্ট্রক্ষমতার ওপরভাগের লোকজন বা কোনো প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের জন্য আইনের প্রয়োগ ভিন্ন হবে। তাদের কারও দ্বারা সংঘটিত কোনো দুর্ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা নিতে গড়িমসি করা হবে কিংবা তারা অপরাধ করে সহজে পার পেয়ে যাবেন!
মহুয়া হাজং ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলা থেকে উঠে আসা হাজং জাতিসত্তার প্রথম নারী সার্জেন্ট। পেশায় নবীন হলেও ইতোমধ্যে ট্রাফিক পুলিশ সেবায় তিনি তার দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তার বাবাও দেশের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু আজ তারা সুবিচার পাওয়া নিয়ে বড় আশঙ্কায় রয়েছেন। একটি প্রান্তিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর একই পরিবারের দুইজন রাষ্ট্রীয় সেবায় নিয়োজিত থাকার পরও কেন এ আশঙ্কায় থাকতে হয়!
সোহেল হাজং :বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য