দেহ অসুস্থ হলে যেমন চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সুস্থ করে তুলতে হয়, তেমনি আত্মা রোগাক্রান্ত হলে তাকে সুস্থ বা পরিশুদ্ধ করে তুলতে হয়। কারণ, অন্তর যদি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হয়, তাহলে মানবদেহের বাহ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচ্ছন্ন, নির্মল ও কল্যাণকর হয়। যদি অন্তর অপবিত্র ও কলুষিত থাকে, তাহলে মানুষের বাহ্যিক আচার-আচরণসহ তার কাজ-কর্মেও অকল্যাণের কালো ছায়া নেমে আসে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, নিশ্চয় মানবদেহে এমন একটি গোশতের টুকরা আছে, যা পরিশুদ্ধ হলে সারা শরীর সুস্থ হয়ে যায়। যখন তা ময়লা হয়ে যায়, তখন সারা শরীর দূষিত হয়ে যায়। জেনে রাখ, সেটা হচ্ছে কলব।
মহান আল্লাহতায়ালা কলবকে নির্মল করে সৃষ্টি করেছেন। আর সেই কলবকে সব ধরনের মলিনতা থেকে হেফাজত রাখতে আদেশ করেছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন : 'সে-ই সফলকাম হয়েছে, যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে এবং যে তার আত্মাকে কলুষিত করেছে সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।' আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য রাসুল (সা.) নিয়মিত দোয়া করতেন, 'হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে পরিশুদ্ধ অন্তর কামনা করছি।' (মুসনাদে আহমদ)। রাসুল (সা.) আরও দোয়া করতেন, 'হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার আনুগত্যে দৃঢ় করে দিন।' (মুসনাদে আহমদ)
আল্লাহর জিকির দ্বারা অন্তর নরম ও প্রশান্ত হয়। এতে আত্মার পরিশুদ্ধি লাভ হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা রা'দের ২৮নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে- 'জেনে রেখ! আল্লাহর জিকিরেই অন্তর প্রশান্ত হয়।' আত্মার পরিশুদ্ধি ছাড়া কেয়ামতের দিন কোনো কিছুই উপকারে আসবে না। সুতরাং পরকালের ভয় অন্তরে জাগ্রত রাখতে হবে। আল্লাহতায়ালা সুরা শুআ'রার ৮৮ ও ৮৯নং আয়াতে এরশাদ করেন- আজ সম্পদ ও সন্তান কোনো উপকার করতে পারবে না, কেবল যে পরিশুদ্ধ আত্মা নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে, সে ছাড়া।' পরিশুদ্ধ আত্মা হচ্ছে শিরক ও বিদাতসহ অন্যান্য ব্যাধি ও অপছন্দনীয় বস্তু থেকে পবিত্র আত্মা। ফলে মানুষের মধ্যে আল্লাহর মহব্বত ও ভয় ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
অসহায় মানুষের কাছাকাছি থাকলে অন্তর নরম হয়। সুযোগ হলে সাধ্যমতো তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা, খাবার খাওয়ানো, খোঁজ-খবর নেওয়া। এতে অন্তরের পরিশুদ্ধি অর্জিত হয়। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে তার অন্তরের কঠোরতা সম্পর্কে অভিযোগ করল। রাসুল (সা.) তাকে বললেন, 'যখন তুমি তোমার অন্তর নরম করার ইচ্ছা করবে, তখন এতিমের মাথায় হাত বোলাবে এবং মিসকিনকে খাবার খাওয়াবে।' পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা একাধিক স্থানে কঠোর হৃদয়ের নিন্দা করেছেন। এরশাদ হচ্ছে- 'দুর্ভোগ কঠোর হৃদয়ের ব্যক্তিদের জন্য, যারা আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ। তারা স্পষ্টত বিভ্রান্তিতে রয়েছে।'
আল্লাহতায়ালা সুরা আন-নূরের ৩০নং আয়াতে এরশাদ করেন- 'হে হাবিব! আপনি মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটি তাদের পরিশুদ্ধতার জন্য অধিক কার্যকরী।' গিবত করা, মিথ্যা বলা, অপবাদ দেওয়া, উপহাস করা, সুদ খাওয়া, ঘুষ খাওয়া, ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া প্রভৃতি জঘন্য কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা আত্মশুদ্ধি অর্জনের অন্যতম পন্থা। কবর জিয়ারত ও মৃত্যুকে স্মরণের মাধ্যমে মানুষের অন্তর আল্লাহমুখী হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'আগে আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা তা জিয়ারত করো। কেননা, নিশ্চয় তা আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং অন্তরের উন্নতি সাধিত করে।'
মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের আত্মশুদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি লাভের তওফিক দান করুন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি