আমাদের দেশে বিজ্ঞান গবেষণা অনেক পেছনে পড়ে রয়েছে। পরাধীন ব্রিটিশ আমল আর পাকিস্তানি যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানে আমরা এগিয়ে যাই- এটি অতি যত্নে পরিহার করার নীতিই অনুসরণ করতেন ওই দুই কালের শাসকরা। বিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করার তেমন কোনো সুযোগই এ দেশে গড়ে তোলা হয়নি। ফলে এ দেশে স্থাপিত সীমিত সংখ্যক শিল্পকারখানার প্রায় সব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো বিদেশে উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিকে অবলম্বন করে। এসব উদ্ভাবনের সঙ্গে এ দেশের বিজ্ঞানী-গবেষকরা কখনও জড়িত ছিলেন না। এভাবেই বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছিল পরাধীন এ দেশে। এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও শিল্প স্থাপনে একই ধারা অনুসরণ করা হয়েছে। এ দেশের গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহারের খুব একটা বেশি উদাহরণ নেই। এটাই হলো ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া মেলবন্ধন সৃষ্টি না হওয়ার মূল কারণ।
কোনো না কোনো প্রডাক্ট তৈরির লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠে এক একটি ইন্ডাস্ট্রি। এর জন্য শিল্প উদ্যোক্তাদের বড় রকম বিনিয়োগ করতে হয়। সে বিনিয়োগের একটা বড় অংশ যায় ইন্ডাস্ট্রি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়ে। ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন, ইন্ডাস্ট্রি পরিচালনার জন্য দক্ষ ও অদক্ষ জনসম্পদ এবং প্রডাক্ট তৈরির জন্য অবিরত কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করার পেছনে। এরপর আসে প্রডাক্ট বাজারজাতকরণের বিষয়। এর কোনো ধাপই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাছাড়া শিল্পে বিনিয়োগের একটা ঝুঁকি তো থাকেই। ফলে শিল্প উদ্যোক্তারা শিল্পে বিনিয়োগ করে মোটামুটিভাবে মুনাফা নিশ্চিত হবে সে কথা ভেবেই বিনিয়োগে আগ্রহী হন। ফলে ঝুঁকি যত হ্রাস করা সম্ভব হয়, সেটি তারা নিশ্চিত করতে চান। সে কারণেই বিদেশ থেকে পরীক্ষিত এবং গ্যারান্টি-ওয়ারেন্টিসহ যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ক্রয়কেই তারা নিরাপদ মনে করেন। তাছাড়া আমাদের দেশে যেহেতু শিল্পবিপ্লবের কোনো ঢেউ এসে লাগেনি কখনও, ফলে শিল্পের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে চলেনি কখনোই দেশের গবেষণাও। আমাদের গবেষণা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল বরাবর। এসবের লক্ষ্য ছিল যত না প্রযুক্তি উদ্ভাবন সহায়ক বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন ও তা পরিচালনানির্ভর পড়াশোনা। ফলে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আমাদের বিজ্ঞান-শিক্ষিত বিজ্ঞদের সম্পর্ক সে রকম হয়নি। সম্পর্কটা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বটে তবে তা গবেষণা ও উদ্ভাবনের নয়। এই সম্পর্কটা মূলত চাকরির সম্পর্ক; গবেষণা ও উন্নয়নের পারস্পরিক লেনদেনের সম্পর্ক নয়। তাছাড়া আমাদের একাডেমিয়া তথা গবেষকদের সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির মেলবন্ধন কখনও গড়ে ওঠেনি পারস্পরিক এগিয়ে আসার সুদীর্ঘ প্রবণতাহীনতা থেকেই। এ রকম সম্পর্ক একদিনে গড়ে ওঠে না, দীর্ঘদিনের চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক পারস্পরিক নির্ভরতার বিষয় এটি।
বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা আমাদের দেশে পিছিয়ে থেকেছে সৃষ্টিশীল ও উদ্ভাবনে আগ্রহী জনসম্পদ গড়ে তোলার কোনো সঠিক নীতিমালা এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাগিদ না থাকায়। এর জন্য যে বড় রকম রূপকল্প থাকা প্রয়োজন ছিল, তা আমরা বাস্তবে পাইনি। ফলে বিজ্ঞান শিক্ষা বড় বেশি তাত্ত্বিক আবর্তে ঘুরপাক খেয়েছে। তাত্ত্বিকতার খোলস ভেঙে তা প্রয়োগমুখী হয়ে ওঠেনি। স্কুল-কলেজগুলোতে আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষা এখনও বেশ অবহেলিতই। এই অবহেলা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও কম নয়। ফলে বিজ্ঞান চর্চার সে রকম কোনো তাগিদই গড়ে ওঠেনি দেশে। গড়ে ওঠেনি বিজ্ঞানমনস্কতাও। গবেষণার জন্য দরকার গবেষণা উপযোগী পরিবেশ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও নানা রকম উপকরণ এবং এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক অর্থায়ন। তার চেয়ে বড় কথা, প্রয়োজন গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গবেষক ও বিজ্ঞানী। প্রয়োজন গবেষকদের জন্য প্রণোদনা প্রদান এবং লক্ষ্যভিত্তিক ধারাবাহিক গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য কর্মপরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন। তাতে দিনে দিনে গবেষকদের দক্ষতা বাড়ে এবং প্রয়োগমুখী গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়।


কোনো প্রযুক্তি বা উদ্ভাবন উদ্ভাবিত হলেই তা কিন্তু ব্যবহার উপযোগী হয়ে যায় না। কেউ একটি ভালো ডিজাইন বা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলে তাকে সেটা বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর উপযোগী করে তুলতে নানা রকম যন্ত্রের মডেল তৈরি করতে হয়। এর জন্য অর্থের প্রয়োজন হয় এবং কারিগরি দক্ষতাও থাকতে হয়। কোনো উদ্ভাবনকে বাস্তবে কাজে লাগানোর জন্য স্টার্টআপ মানি প্রায়ই পান না উদ্ভাবকরা। ফলে গবেষণার ফল অনেক ক্ষেত্রে আঁতুড়ঘরেই মুখ থুবড়ে পড়ে। কেউ যদি সে রকম অনুকূল পরিবেশ পান, তবে উদ্ভাবনটি একটি ব্যবহার উপযোগী রূপ গ্রহণ করে। এরপর আসে তৈরি করা যন্ত্র বা যন্ত্রাংশটির বাজারজাতকরণের বিষয়টি। এ রকম ক্ষেত্রে যন্ত্রটি কাজে লাগলে এবং এর চাহিদা থাকলে এগিয়ে আসার কথা শিল্প উদ্যোক্তাদের। গবেষণার ফলস্বরূপ সেরকম আবিস্কার দেশে কতখানি হয়েছে তা বের করার একটি সহজ পদ্ধতি রয়েছে। কোন গবেষক বা কোন বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবনের জন্য কত মেধাস্বত্ব পেয়েছে সেটি জানলেই প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটিত হয়। এটি হলো উদ্ভাবিত বস্তু বা যন্ত্রটি নতুন আবিস্কার কিনা তা জানারও একটি উপায়। প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য কতটি পেটেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা কোন গবেষক পেয়েছেন, সেটা হলো গবেষণার সফলতার একটি নির্দেশক। পেটেন্ট ছাড়াও আরও নানা রকম মেধাস্বত্ব রয়েছে গবেষণালব্ধ প্রযুক্তির আইনগত মালিকানা বা স্বত্ব অর্জনের। সেটি হতে পারে পেটেন্ট, হতে পারে ইউটিলিটি মডেল বা অন্য কোনো মেধাস্বত্ব।
গবেষণার সঙ্গে প্রযুক্তির যেমন সম্পর্ক রয়েছে, প্রযুক্তির সঙ্গে তেমনি ইন্ডাস্ট্রিরও সম্পর্ক রয়েছে। নতুন প্রযুক্তি বাণিজ্যিকীকরণের জন্য আমাদের দেশের অনেক শিল্প উদ্যোক্তার ঝুঁকি নেওয়ার মতো মানসিকতারও অভাব রয়েছে। আবার ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজনে আমাদের গবেষণা পরিচালনার পরিপ্রেক্ষিতে খুব বেশি প্রযুক্তিও আমাদের উদ্ভাবিত হয়নি। ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক রচনার ভিতটি আমরা সেভাবে এখনও গড়ে তুলতে পারিনি। তবে এখন গবেষণা ও প্রযুক্তি নিয়ে যেমন নানা কথা ও ভাবনা চলছে, তেমনি একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি সহযোগিতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও সরকারের তরফ থেকে নানা রকম উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। সরকারি কোনো কোনো সংস্থা এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ভাবনাকে ধারণ করে আমাদের গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জনসহ এ-বিষয়ক গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করছে। তাতে আগামী দিনে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া অর্থাৎ, গবেষকদের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরির উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির জন্য এগিয়ে আসতে হবে দু'পক্ষকেই।
প্রকৃত অর্থে পৃথিবীর দেশে দেশে বিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়েছে। বিজ্ঞানের সব শাখাই উৎকর্ষ অর্জন করেছে। আমাদের বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশ পিএইচডি এবং পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করার সুবাদে এর খানিক ঝলক দেখে নেওয়ার সুযোগ পান মাত্র। এটি দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জন্য ঘটে যাওয়া বিকাশমান কার্যক্রমের একটি দিক মাত্র। সরাসরি এ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে বড় কিছু করার অবস্থায় আমরা নেই। এটি কেবল ব্যক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি নয়, এটি সামগ্রিক বিচারে বিজ্ঞান চর্চা ও ধারাবাহিক গবেষণা করার প্রয়োজনীয় নীতিমালা এবং টার্গেটভিত্তিক কোন জায়গাটাতে আমাদের প্রকৃত অর্থেই জোর দেওয়া উচিত, তা জানা না থাকার ফল। কাউকে এর জন্য দোষ দেওয়ার চেয়ে সম্মিলিত গবেষণায় আমাদের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে একক ব্যক্তির স্বাধীন গবেষণার মাধ্যমে বড় কিছু প্রযুক্তি উদ্ভাবন অসম্ভব না হলেও প্রায়ই তাতে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে। সে জন্য প্রয়োজন অনেকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিজ্ঞান ভাবনা ও লব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে বড় কিছু সৃষ্টির প্রয়াস নেওয়া। এ রকম উদ্যোগ যেমন দেশের ভেতরে নেওয়া যায়, তেমনি নেওয়া যায় দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক গবেষণা ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে। আর প্রযুক্তি সৃষ্টি করতে না পারলে শিল্প খাতের সঙ্গে মেলবন্ধনের প্রশ্নই আসে না। লাগসই প্রযুক্তিভিত্তিক সম্পর্কই হলো শিল্প আর গবেষকের মেলবন্ধন সৃষ্টির প্রাথমিক ভিত্তি। এ ধারা সৃষ্টি হলে গবেষকদের জন্য আরও গবেষণা চালানোর বাজেট শিল্প থেকেই আসবে। ব্যাপারটা অনেকটাই পারস্পরিক লাভালাভের সঙ্গে জড়িত। সে সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি নতুন আঙ্গিকে, নতুন ভাবনায়। এর জন্য আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষাটা যেমন, তেমনি গবেষণাও সাজাতে হবে। সে পথে যাওয়ার তাগিদ এখন সব মহলেই বেশ খানিকটা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেটাই হলো সবচেয়ে আশার কথা।
ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া : উপাচার্য, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়